পণ্ডিতের কথা শেষ না হতেই নর্তকী মেয়েগুলো এভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলো, যেনো বাতাসে ওরা হারিয়ে গেছে। এরপর বাদ্যযন্ত্রের বাজনা বদলে যায়। এবারের বাজনার ধ্বনি এমনই আকর্ষণীয় যে পণ্ডিত নিজেও হতচকিত হয়ে উঠলো। ঠিক এমন সময় তাঁবুর এক কোণা থেকে সামুরাতি এভাবে দৃশ্যপটে এলো যেনো একটি জলপরী পানি থেকে ভেসে ওঠেছে। সামুরাতি বিস্ময়কর এক নৃত্যের তালে তালে পণ্ডিতের একেবারে কাছে চলে আসে। তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি খেলা করছে। নৃত্যের ছন্দে এগিয়ে এসে পণ্ডিতের সামনে বাঁকিয়ে প্রণাম করে। রঙিন ফানুসের বাহারী আলোয় নর্তকী সামুরাতির নৃত্যে পণ্ডিত বিমোহিত হয়ে গেছে। সামুরাতির শরীর যখন নাচের নানা মুদ্রায় কখনো ফুটন্ত ফুলের মতো মেলে ধরলো এবং বাজনার উচ্চাঙ্গ তালে নিজেকে পাখির মতো বাতাসে ভাসিয়ে রাখলো, তখন পণ্ডিত রাজা আনন্দ পালকে জিজ্ঞেস করলো, “এ হিন্দু না মুসলমান?”
“মুসলমান।” জবাব দিলো রাজা আনন্দ পাল। “মুসলমান তরুণীদেরকেই এ পেশায় আমরা ব্যবহার করি। এই মেয়েটিকে যদি আমরা মন্দিরের নর্তকী হিসেবে রেখে দেই, তাতে আপনি রাজি হবেন তো?”
“এর পরিবর্তে আপনি চাইলে আমি একশ’ নর্তকী দিয়ে দিতে পারি। এই মেয়েটি আমার খুবই প্রিয়।”
“হ্যাঁ, আমি আপনার কাছে এমন কথাই শুনতে চাচ্ছিলাম। আপনার বোঝা উচিত, এ মেয়েকে আমি নিজের সেবার জন্য নিতে চাচ্ছি না। আমি নর্তকী রাখবো কেন? আমি তো নারী স্পর্শও করি না। ওকে আমি কৃষ্ণ ভাগবানের চরণে বলীদান করবো।”
“বলি দেবেন!” চোখ কপালে তুলে জানতে চাইলো রাজা।
“হ্যাঁ, রাজা আনন্দ পাল। এটা আমার ব্যক্তিগত কোনো ইচ্ছা নয়। দেব-দেবীদের চাহিদা এটা। এই নর্তকীকে দেবতারা ভোগ করতে চায়।”
“আমরা তো ইতিমধ্যে লাহোরে দুটি তরুণী বলী দিয়েছি।”
“তবুও আপনি দু’বারই পরাজিত হয়েছেন, তাই না। এর কারণ হলো, যেসব পণ্ডিতের হাতে আপনি কুমারীদের বলী দিয়েছেন, এসব পণ্ডিত আপনার দেয়া কুমারীদের সতীত্বহারা করে পাপ করেছে। আমাকে দেবী কৃষ্ণ স্বপ্ন দেখিয়েছেন, এমন কোনো মুসলিম তরুণীকে বলী দিতে হবে যে রূপে-গুণে অনন্যা। আর সে না হবে বয়স্কা, আর না হবে কিশোরী। নাচ-গানে সে হবে অনন্যা। সে যার কাছে থাকবে, তাকে সে প্রাণের চেয়েও ভালোবাসবে। কোনো মূল্যেই এই মেয়েকে সে হারাতে সম্মত হবে না। বহুদিন থেকে আমি এমন একটি নর্তকী খুঁজছিলাম। আজ আপনার কাছে তা পাওয়া গেলো। আমি হিন্দু ধর্মের বিজয় দেখতে চাই, আমি দেব-দেবীদের অভিশাপ থেকে আপনাদের রক্ষা করতে চাই।”
রাজা আনন্দ পালের পক্ষে নগরকোট মন্দিরের বড় পণ্ডিতের কথা অমান্য করা সম্ভব ছিলো না। কিছুদিন আগে অন্যান্য রাজা-মহারাজাদের ডেকে পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ যেসব কতা বলছিলো, রাজা আনন্দ পালকেও হিন্দু ধর্মের জয় এবং সুলতান মাহমূদকে পরাজিত করার দিক-নির্দেশনামূলক কথা শোনালো। রাজা আনন্দ পালকেও পণ্ডিত পরামর্শ দিলো, সুলতান মাহমুদকে পেশোয়ারের পার্শ্ববর্তী ময়দানে যুদ্ধের নামে আটকে রাখতে হবে আর অপরদিকে গজনী আক্রমণ করে দখল নিতে হবে। এছাড়া গজনীর মুসলমানদের অভিযান ঠেকানো সম্ভব নয়।
“আমি যদি লাহোরেই ব্যস্ত থাকি, তাহলে বেরা এবং মুলতানের কি হবে?” প্রশ্ন করলো আনন্দ পাল।
“দেখবেন, এই দুই শহরের সকল মুসলিম সৈন্য আমাদের হাতে বন্দীরূপে গ্রেফতার হবে।” বললো পণ্ডিত। “আপনি এখন রাজধানীতে ফিরে যান। নাচ-গান বাদ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিন। সকল রাজ্য থেকেই আপনার কাছে সৈন্য আসছে। সে ব্যবস্থা আমি সেরে ফেলেছি।”
পরদিন সকাল বেলা রাজা আনন্দ পাল পাহাড়ের উপর অবস্থিত মন্দিরে গিয়ে পূজাপার্বন শেষ করে ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। এদিকে সেই রাতেই বড় পণ্ডিত সামুরাতিকে সাথে নিয়ে যায়। আনন্দ পালের পক্ষে বিদায়লগ্নেও আর সামুরাতির সঙ্গে দু’চার কথা বলার সুযোগ হলো না।
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ পাহাড়ের উপর অবস্থিত বড় মন্দিরের মূল আস্তানায় সামুরাতিকে নিয়ে যায়। সামুরাতি ঘুণাক্ষরেও জানতো না তাকে বলী দিয়ে তার দেহের রক্তে হিন্দুদের কৃষ্ণদেবীর চরণ ধোয়া হবে। সামুরাতিকে পণ্ডিত যখন মন্দিরের পাতাল কক্ষে নিয়ে গেলো, তখন সামুরাতি জানতে চাইলো, তাকে এখানে কেন আনা হয়েছে।
“আমার সাথে আসা কি তোমার কাছে ভালো লাগেনি?” সামুরাতির দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো পণ্ডিত। পণ্ডিত বিছানা দেখিয়ে বললো, “আগে বসো, তারপর কথা বলো।”
সামুরাতি বিছানায় বসতে বসতে পণ্ডিতের দু’হাত তার দুহাতে তুলে নেয় এবং পণ্ডিতকে নিজের দিকে টান দেয়। সামুরাতির টানে পণ্ডিত তার পাশে বসে পড়লো। সামুরাতি পণ্ডিতের চোখে চোখ রেখে একটা ভুবন মোহিনী হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে দেয়। এই হাসির ঝিলিকে পণ্ডিতের শরীর কেঁপে ওঠে। সামুরাতি বললো, “মহারাজা! আমার নাচের সম্মান করতে পারেনি। আপনি আমার নাচ দেখেছেন কিন্তু কণ্ঠের গান শুনেনি। তবুও আপনার দৃষ্টিতে আমার দেহবন্ধুরী আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।”
“হ্যাঁ। আরে তুমি তো ভুল বুঝেছো তরুণী।” গম্ভীর স্বরে বললো পণ্ডিত। “তোমার রূপ-সৌন্দর্য আমার ভালো লেগেছে বটে কিন্তু তুমি বুঝতে ভুল করছে। আমি জীবনে কোনোদিন নারী স্পর্শ করিনি আর জীবনে কোনদিন তা করবোও না।”
