“রাজা-মহারাজা আর সম্রাটদের হৃদয়েও রাজত্ব করো তুমি। আমার মতো একজন সামান্য মানুষকে তোমার এতো ভয় কেনো?”
“আমি জানি না… আমি বলতে পারবো না কেনো তোমাকে আমার এতোটা ভয় করছে। কেননা অনতিক্রম্য মনে হচ্ছে তোমাকে। তুমি এখন আমার আশ্রয়ে, বলতে গেলে আমার অধিকারে।”
“কিন্তু না, আমি বলতে পারবো না।”
“হ্যাঁ, তুমি আর আমি অভিন্ন জাত। এই রক্ত দেখিয়ে তুমি আমার প্রকৃত পরিচয় জানিয়ে দিয়েছে। আমি এখন নিজের পরিচয় জেনে গেছি। তোমার পা ঠিক না হওয়া পর্যন্ত কেউ এ ঘরে ঢুকবে না।”
* * *
পিছু ধাওয়াকারীরা ওয়াইব আরমুগনীকে ধরতে না পেরে হতাশ হয়ে ওর বাড়িতে ফিরে গেশো। শুয়াইব আরগানীব বাড়িতে গিয়ে দরজার কড়া নাড়াতেই যারকা দরজা খুলে দিলো। যারকার বাবা জিজ্ঞেস করলো, “ও বেরিয়ে গেলো কি করে?”
“ও জেগেই ছিলো, তোমরা বারবার বিড়ালের মতো ডাকছিলে। আমি তোমাদের থামাতে এলে সে টের পেয়ে যায়। লোকটি খুবই চালাক। সে আমাকে কিছু না বলে দৌড়ে গিয়ে ঘরের ছাদে উঠে। এ সময় আমি তোমাদের একজনের চিৎকার শুনে বুঝতে পারি ও পালিয়েছে। তোমরা বড় ভুল করেছে। তোমাদের ভুলের কারণে সে পালাতে পারলো । মিছেমিছি এতোদিন শুধু আমাকে ওর বউ বানিয়ে রাখলে। লাভটা কি হলো?”
শহর ও আশপাশের এলাকাজুড়ে শুয়াইব আরমুগানীর খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। চার-পাঁচ দিন পর্যন্ত চললো তল্লাশি অভিযান। তল্লাশির সময় প্রতিটি মুসলমানের বাড়ির আস্তাবলের খড়কুটো পর্যন্ত ওলোট-পালট করা হলো। কিন্তু কোথাও আরমুগানীর চিহ্ন পর্যন্ত পাওয়া গেলো না।
এদিকে নগরকোটের বড় পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ খবর পায়, রাজা আনন্দ পাল রাজধানীতে ফিরে এসেছে। রাজার ফিরে আসার খবর পেয়ে পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ তাকে নগরকোট মন্দিরে ডেকে পাঠায়। পণ্ডিতের খবর পেয়ে সাথে সাথেই রাজা আনন্দ পাল তার একান্ত প্রহরীদের রওনার প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। হিন্দুস্তানের অন্যান্য রাজা-মহারাজার মতো রাজা আনন্দ পালও নগরকোট মন্দিরকে পুৰ সম্মান করতো এবং সেখানকার প্রধান পণ্ডিতের নির্দেশকে অবশ্য পালনীয় ভাবতো। এবার সে শুধু পণ্ডিতের নির্দেশ পালনের জন্যই পণ্ডিতের খবর পাওয়া মাত্র রওনার নির্দেশ দিলো না। তার উদ্দেশ্য ছিলো, পণ্ডিতের মাধ্যমে সে অন্যান্য রাজা-মহারাজার সহযোগিতা লাতে সমর্থ হবে। যেনো সে সুলতান মাহমূদের সাথে একটা চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার সামর্থ অর্জন করতে পারে। সে একজন যথার্থ মহারাজার মতো পূর্ণ শান-শওকতের সাথে রাজা আনন্দ পালের নগরকোট মন্দিরে পদার্পণ করে। তার সাথে রীতিমতো এক বিরাট কাফেলা। কাফেলায় তার একান্ত দেহরক্ষী বাহিনী ছাড়াও রয়েছে তার প্রিয় গায়িকা ৩ নর্তকী সামুরাতি। এ ছাড়াও রয়েছে কয়েকজন সেবিকা ও পরিচারিকা। সামুরাতি তার বৃদ্ধা পরিচারিকাকে ঘরে রেখে এসেছে এবং তাকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে এসেছে, সে যেনো আরমুপানীকে গুপ্তধনের মতোই লোকচক্ষুর আড়ালে হেফাজতে রাখে। বিপুল লোক বহর নিয়ে রাজা আনন্দ পাল নগরকোট মন্দিরের কাছে পাহাড়ের পাদদেশে এক সবুজ প্রান্তরে তবু তুলে। টানা চার-পাঁচ দিন ভ্রমণের পর রাজা আনন্দ পাল নগরকোট পৌঁছে। সফরের ক্লান্তির কারণে নগরকোট পৌঁছেই রাজার মন্দিরে প্রবেশ করা সম্ভব হলো না।
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের কাছে যখন রাজা আনন্দ পালের আগমন সংবাদ পৌঁছালো, তখন পণ্ডিত খবর পাঠালো, বিকেলে পণ্ডিত রাজাকে অভ্যর্থনার জন্য নিচে আসবে। পড়ন্ত বিকেলে পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ রাজাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য যখন নিচে নেমে এলো, তখন রাজা আনন্দ পাল তাঁবু থেকে বেরিয়ে পণ্ডিতের পা স্পর্শ করে তাতে চুমু দেয় এবং তাকে ভক্তি জানায়। রাজার তাঁবু দেখে পণ্ডিত তো হতবাক। তাঁবু তো নয়, যেনো কোনো এক রাজপ্রাসাদ। রাজার বিশাল তাবুতে রঙ-বেরঙের শামিয়ানা, সুদৃশ্য ঝালর আর চতুর্দিকে বাহারী ঝাড়বাতি। রাজার তাঁবুতে গালিচা বিছানো। পণ্ডিত রাজার কক্ষে বসার একটু পরই তাকে উদ্দেশ্য করে চার নর্তকী নাচ শুরু করে দেয়। নৃত্যগীতের মধ্যে পণ্ডিত রাজা আনন্দ পালের উদ্দেশ্যে বলে, “মনে হয় আপনি সেই আনন্দপাল নন, যে আনন্দ পাল নিজে আর তার পিতা একাধারে কয়েকবার সুলতান মাহমুদের কাছে পরাজিত হয়েছেন। আপনার কি মনে নেই, পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে আপনার বাবা আত্মাহুতি দিয়েছিলেন আর সম্মুখ সমরে শোচনীয়ভাবে পরাজয়বরণ করে আপনি দেশত্যাগ করেছিলেন? যদি আপনি সেই আনন্দ পালই হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার পরাজয়ের প্রধান কারণ এই বিলাসিতা। যে বিলাসিতা আপনি আমাকে খুশি করার জন্য প্রদর্শন করছেন। কারণ, আমি শুনেছি, আমাদের মহারাজারা নাকি যুদ্ধক্ষেত্রেও নাচ-গান ও আমোদ-ফুর্তির সকল আয়োজন সঙ্গে রাখেন।”
“পণ্ডিত মহারাজ! মৃত্যুর আগে আমরা মনের চাহিদা পূর্ণ করার জন্যে বিনোদনের উপকরণসমূহ সঙ্গে রাখি আর কি?”
“তা ঠিক। কিন্তু আপনি তো এখানে মরতে আসেননি। এখনও বেঁচে আছেন। আপনার এই বেঁচে থাকার লক্ষ্য কি বাকি জীবন বিলাসিতায় মেতে থাকা? আমি এ জন্যই আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছি যে, আপনার পরাজয়ের ও কারণগুলো আর কেউ বলার সাহস না পেলেও আমি বলে দেবো। রূপসীদের সৌন্দর্য আর শরীর নিয়ে যারা উল্লাসে মেতে থাকে, তাদের করুণ পরিণতি ছাড়া আর কি হতে পারে!”
