সামুরাতি নিজ হাতে আরমুগানীর ক্ষতস্থানের রক্ত পরিষ্কার করলো। শরাব দিয়ে সব ক্ষতস্থান ধুয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলো। পায়ের আঘাত ছিলো খুবই মারাত্মক।
আরমুগানী সামুরাতির হাতের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে তাতে পট্টি বেঁধে দেয়। এর ফাঁকে আরমুগানী সামুরাতিকে যারকার ইতিবৃত্ত সবিস্তারে শোনায় । সামুরাতির কাছে আরগানী কোনো কথাই আর আড়াল করলো না এবং কোনো মিথ্যাও বললো না। সে সামুরাতিকে এ কথাও জানালো যে, সে সুলতান মাহমূদের হয়ে এখানে গোয়েন্দা কাজে জড়িত। সে দীর্ঘক্ষণ ইসলামের মর্যাদা ও হিন্দুদের ইসলাম বিদ্বেষের ব্যাপারে কথা বললো।
আরমুগানী বললো, “যারকাকে তার বাবা বিলাস-ব্যসনে অভ্যস্ত করে শাহজাদীতে পরিণত করেছিলো। আমাকে প্রতারিত করার ব্যাপারেও সে ছিলো সফল এবং নিপুণ দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছে। কিন্তু আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও প্রেম তার মধ্যে মরে যাওয়া ইসলামী চেতনা পুনরুজ্জীবিত করেছে। যার ফলে শেষ মুহূর্তে সে এমন কাজ করেছে যাতে আল্লাহ নিশ্চয়ই তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।”
“হয়েছে হয়েছে, আর বলতে হবে না। এখন আমার কথা শোনো। আজ রাতে কালারের রাজা এসেছে। এ জন্য রাজপ্রাসাদে আমার ডাক পড়েছিলো। রাজা আনন্দ পাল কালাজারের রাজাকে বলেছে, এই মেয়েটি মুসলমান এবং সে আমার খুব প্রিয়পাত্র ও নর্তকী। তাতে কালাজারের রাজা বললো, আমি কোনো মুসলিম সুন্দরী তরুণী দেখলে ওকে অপহরণ করে নর্তকী বানাই, নয়তো বেশ্যাবৃত্তিতে লাগাই। মুসলিম বংশ নিপাত করতে এবং ওদের চরিত্র ধ্বংস করার এই একটিই যুৎসই পথ। আপনিও যদি এই পদ্ধতি অবলম্বন করেন, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দেখতে পাবেন আপনার দেশে যেসব মুসলমান বসবাস করছে, এরা হয় নর্তকী নয়তো সব বেশ্যাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েছে।”
সামুরাতি যখন আরমুগনীকে রাজা কালাঞ্জারের কথা শোনায়, তখন আরমুগনীর চেহারা দুঃখে-অনুশোচনায় লাল হয়ে যায়। আরমুগানী সামুরাতির ভেতরকার মৃতপ্রায় জাতীয় চেতনায় নাড়া দেয়। সামুরাতি যখন তাকে রাজা আনন্দ পালের রাজপ্রাসাদের কথা বলে, তখন সে সামুরাতিকে আরো উজ্জীবনীমূলক কাহিনী শোনায়। সামুরাতির জ্বলন্ত প্রদীপে এসব কথা ছিলো তেল ঢালার মতো।
আরমুগানী বললো, “দেখো সামুরাতি! আজ আমি মুসলমান তরুণীদের সম্ভ্রম বিক্রির কারণে মৃত্যুর মুখোমুখি। অথচ গজনীর যেসব যোদ্ধা এখানে এসে যুদ্ধ করে শাতাদাতবরণ করেছেন, তারা মুসলমান নারীদের সম্ভ্রম রক্ষার্থে নিজেদের জীবন বিলীন করে দিয়েছেন। শোনো সামুরাতি! তোমরা হলে হিন্দুদের খেলনার পুতুল। তোমরা পুরনো হয়ে যাচ্ছে। খেলনা পুরনো হয়ে গেলে সেগুলো আর খেলার উপযুক্ত থাকে না, তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তোমরাও চিরাচরিত নিয়মে একসময় আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। তাই যারকা হয়ে যাও, সামুরাতি! নিজ বিশ্বাসের সাথে আর বেঈমানী করো না।”
সামুরাতি এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনো হয়নি। কঠিন-কঠোর রূঢ় কথা শুনতে সে অভ্যস্ত নয়। সে সাধারণত তার রূপ-সৌন্দর্য আর নিপুণ নাচ ও মনোহরী কণ্ঠের প্রশংসাই মানুষের নিকট থেকে শুনে থাকে। নিজেকে যে কেউ স্পর্শ না করতে পারা দেবী ভাবে সামুরাতি। যাকে সবাই ছুঁতে চায়, একান্তে পেতে প্রত্যাশী, আজ ঘরে ঢুকেই বৃদ্ধা পরিচারিকার মুখে শুনতে পেলো তার এই রূপ-রস, খ্যাতি ও জৌলুসে ভাটা শুরু হয়েছে, অচিরেই তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। এরপর আরমুগানী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যৌবনের রূপ-জৌলুস বেশি দিন থাকে না। ফুল সৌরভ হারিয়ে শুকিয়ে গেলে মানুষ যেমন তা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়, কোনো ভ্রমর আর সেই ফুলে বসে না। তেমনি যৌবনের দীপ্তি নিতে গেলে কোনো পুরুষ আর তার প্রতি তাকিয়েও দেখবে না।
সামুরাতিকে আরমুগানী বললো, “তুমি নিজেই একটা ধোঁকা, আর যারা তোমার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে তারাও মারাত্মক ধোঁকাবাজ।”
“যারকাকে হয়তো আমি দেখেছি। যে মেয়েটির কথা বলছি সেই যদি যারকা হয়ে থাকে, তবে সে যে খুবই রূপসী তাতে সন্দেহ নেই। আচ্ছা আরমুগানী! তুমি তাকে খুব ভালোবাসো! একান্তে পেতে চাও!”
“আমার প্রাণ ওর জন্য ব্যাকুল সামুরাতি। এটা এমন এক টান, এমন এক আকর্ষণ, যে আকর্ষণের স্বাদ তুমি কখনো অনুভব করোনি।”
“আমি যদি তোমাকে আশ্রয় দেই তবে আমাকে কি সেই ভালোবাসা দেবে। বুঝতে পারছি না আমার হৃদয়ের মধ্যে যে কি তুফান শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীটা দুলছে।”
“তুমি আমাকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করতে পারো। হৃদয়কে যদি তৃপ্ত করতে চাও, তাহলে তোমার হৃদয়ে এক বোনের মমতার ঢেউ তোলো, দেখবে আমার সান্নিধ্য তোমাকে স্নেহ-মমতার পরশে ভরে দেবে।”
“ঠিক আছে, তুমি আমার এখানেই থাকো।” কিন্তু কথা জড়িয়ে এলো সামুরাতির। আর কিছু বলতে পারলো না।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আরমুগানীর দু’গাল দু’হাতে ধরে ওর চোখের দিকে তাকাতেই সামুরাতির দু’চোখ বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। ধরাগলায় অস্পষ্ট ভাষায় বলে, “আর কখনো আমার সামনে তুমি যারকার নাম নেবে না। তুমি বলেছো, সে তোমার বোন নয় কিন্তু আমি এতেও প্রতারিত হওয়ার আশংকা করছি।” আরমুগানীর চেহারা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে চোখের পানি মুছে সামুরাতি।
