“কে তুমি?” আক্রান্তকে জিজ্ঞেস করে সামুরাতি। “চুরিটুরি করতে এসেছিলে নাকি?”
“দেখো, চোর কিংবা ডাকাত হলে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম না। আমার নাম শুয়াইব আরমুগানী।”
“আরে, তুমি কি অস্তিাবলের প্রশিক্ষক না?”
“হ্যাঁ, সামুরাতিজী। তুমি ঠিকই বলেছে।”
“তো এখানে তুমি কি নিতে এসেছিলে? ঘরে চলো। তুমি তো জানো, যদি পালাতে চাও, তাহলে তোমার অবস্থা কত কঠিন হবে”।
ঘরের আলোয় গেলে আরমুগানী বুঝতে পারে, কুকুর কামড়ে তার শরীরের সব কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলেছে। তার উভয় বাহু ও পা থেকে রক্ত ঝরছে। কুকুর তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। তার এক পা থেকে অনেকটা গোশত খাবলে নিয়েছে।
“এ কথা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারি না, তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে এখান থেকে কিছু নিতে এসেছিলো।” বললো সামুরাতি। “আমার মনে হয়, যারা আমাকে একান্তে পেতে চায় তুমিও সেই দলের একজন। লোভই তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। তুমি হয়তো বুঝেছো, আমি একাকী এখানে থাকি। জানো, আমার কুকুর আমার হাভেলীর চার দেয়ালের ভেতরে কোন বাঘকেও একদণ্ড দাঁড়াতে দেয় না।”
সামুরাতি তার বৃদ্ধা পরিচারিকাকে বললো, “ওর সারা শরীর কুকুর ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে। ওর ক্ষতস্থান ধোয়ার জন্য পানি গরম করো এবং পরিষ্কার কাপড় নিয়ে এসো, সেই সাথে শরাবও এনো। শরাব এবং কাপড় ভস্ম ক্ষতস্থান তাড়াতাড়ি শুকাতে সাহায্য করে।”
পরিচারিকা চলে গেলে আরমুগানী সামুরাতিকে বলে, “তোমার বাগানে তোমার কুকুর আমাকে হামলা করেছে, তাই তুমি আমাকে চোর বলতেই পারো। সেই সাথে আমাকে চরিত্রহীনও বলতে পারে যে তুমি একা থাকো জেনে অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এসেছি। শোনো সামুরাতি! যে রূপ-সৌন্দর্যের প্রতি তোমার এতোটা গর্ব আর অহংকার, যদি তুমি তোমার এই রূপ-জৌলুস আমার চোখে দেখো, তাহলে নিজের প্রতিই তোমার ঘৃণা আসবে।”
“ও, তাহলে কি তুমি আমাকে ঘৃণা করতে রাতের আঁধারে চোরের মতো আমার বাড়িতে এসেছো?”
“শোনো, যে তোমাকে ভালোবাসে আর আমি যাকে ভালোবাসি তাকে যদি তুমি একবার দেখো, তাহলে আয়নায় নিজের চেহারা দেখাই তুমি ছেড়ে দেবে। আমি রাতের আঁধারে তোমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তোমার রূপ-সৌন্দর্য ভোগ করতে এসেছি এই অহংকার অন্তর থেকে বের করে দাও। তুমি তো আর রাজা আনন্দ পালের রাজকুমারীদের চেয়ে বেশি রূপসী নও। আমি তাদেরও প্রত্যাখ্যান করেছি।”
“হু, তাহলে এখানে কেন মরতে এসেছিলে?”
সামুরাতির এক হাতেও কুকুর কামড়ে দিয়েছিলো। সামুরাতির ক্ষতস্থান থেকে বিছানার উপর দু’তিন ফোঁটা রক্ত টপ টপ পড়লো। আরমুগানী সামুরাতির সামনে দাঁড়ানো। তার ক্ষতস্থান থেকে অনবরত রক্ত ঝরছিলো। আরমুগানী দেখলো, সামুরাতির রক্ত আরমুগনীর রক্তের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
“দেখো, তোমার রক্ত আর আমার রক্ত একসাথে মিশে কেমন উজ্জ্বল রঙ ধারণ করেছে। অথচ তোমার রক্ত কিন্তু এতোটা উজ্জ্বল ছিলো না। তুমি অব্যাহত অপরাধ আর গুনাহ করতে করতে নিজের রক্তকেও দূষিত করে ফেলেছে। তোমার রক্ত যখন দূষণমুক্ত রক্তের সাথে মিশেছে, তখন সে তার আসল বর্ণ ফিরে পেয়েছে। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কি দেখছো নর্তকী। তোমাকে আমার সামুরাতি নামে ডাকতে ইচ্ছে করছে না। তোমার প্রকৃত নাম আমি জানি না বটে, কিন্তু একজন মুসলিম যুবতাঁকে হিন্দু নামে ডেকে মুসলমানের অবমাননা করতে আমার বিবেক সায় দেয় না। যাক, আমি যে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। দেখো, তোমার আর আমার রক্ত একই ধারার। সেই সব পিতার রক্ত আমরা শরীরে বহন করছি, যারা অভিন্ন বিশ্বাস ও আকাক্ষা পোষণ করতেন। এমনও হতে পারে, আমি এবং তুমি একই বংশজাত সন্তান।”
“আরে, তোমাকে তো পাগল মনে হচ্ছে। পাগলের মতো কি সব আবোল-তাবোল বকছো!”
“তুমি কি আমাকে চেনো, আমি কে? আমি তোমাকে তোমার রক্তের আসল পরিচয় বলে দিচ্ছি। নাচ-গান তোমার পেশা হতে পারে না। তোমার ধর্মে নাচ-গান বৈধ নয়। তোমার এই রূপ-জৌলুস, তোমার কণ্ঠ তোমার নিয়ন্ত্রিত জিনিস নয়। ভবিষ্যতে এ সবই তোমার কাছ থেকে বিদায় নেবে। আজ তুমি আমাকে বলছো, চোরের মতো আমি তোমার ঘরে হানা দিয়েছি। একদিন এমন আসবে, যখন তুমি আমার মতো কোনো চোর তোমার ঘরে হানা দিক এমন কামনায় অধীর হয়ে থাকবে। তখন রাতের বেলায় তোমার কুকুরকে বেঁধে রাখবে, যাতে কেউ তোমার ঘরে হানা দিতে পারে কিন্তু তোমার কুকুর ছাড়া আর কাউকে তুমি তোমার ঘরে দেখতে পাবে না। যাক, তুমি অন্তত একটা ভালো কাজ করো, আমাকে তোমার ঘরে আশ্রয় দাও।”
“কেন আশ্রয় চাচ্ছ তুমি? কি অপরাধ করে তুমি পালিয়েছে?”
“আমি তোমাকে একটি তরুণীর গল্প শোনাবো। সে বয়সে তরুণী, আর তোমার চেয়েও সুন্দরী। অটুট তার শরীর। পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে উজ্জ্বল তার অবয়ব। সে এক দৃষ্টিতে তোমার চেয়েও বেশি গুনাহগার, কিন্তু একটি কাজের দ্বারাই সে জান্নাতের বাসিন্দা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তুমিও অন্তত একটা পুণ্য কাজ করো। আমাকে আশ্রয় দাও…।”
“তোমার পরিচারিকাকে এখানে আসতে দিও না। আমার ক্ষত আমি নিজেই পরিষ্কার করে নেবো। তাকে বলে দাও, আমি যে এখানে আছি, তা যেন কাউকে না জানায়।”
রাজপ্রাসাদ থেকে ঘরে ফিরে কাপড় বদলানোর সময়ও সামুরাতিকে তার বৃদ্ধা পরিচারিকাও এমন কিছু বাস্তব কথাই বলেছিলো। সেসব কথা তখনো তার মানসপটে উচ্চারিত হচ্ছিলো। এমতাবস্থায় এক সৌম্য কান্তি যুবক আহত অবস্থায় যে তার ঘরেই আশ্রয়প্রার্থী সেও তাকে বলছে, তার রূপ-সৌন্দর্যে এখন ভাটা পড়ে গেছে। এতে সামুরাতির মনের বোঝা আরো ভারী হয়ে যায়। সে পরিচারিকাকে এই বলে তার কক্ষ থেকে যেতে বলে, “আমার ঘরে যে অচেনা লোক প্রবেশ করেছে তা তুমি কাউকে বলবে না।”
