এক পর্যায়ে শহরের অলিগলি পেরিয়ে সে অনেকটা ফাঁকা জায়গায় চলে এসেছে। এখানটায় বাড়িঘর কম। এখানে একটি হাভেলী দেখতে পায় যার চারপাশটা দেয়াল ঘেরা এবং দেয়ালের পাশে ঝোঁপ-ঝাড়ের মতো বাগান। সে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ একটা ঝোঁপের কাছে এসে বসে পড়ে এবং উঁকিঝুঁকি করতে থাকে। আরমুগানী হামাগুড়ি দিয়ে দেয়ালের ফটক পর্যন্ত এসে ত্বরিৎ ফটকের ফাঁক দিয়ে দেয়ালের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ফটকের বিপরীত দিকে চলে যায়। সে তখনও দাঁড়ায়নি। হামাগুড়ি দিয়েই এগুচ্ছিলো।
পেছনে দৌড়াতে থাকা ঘাতকরা ফটকের কাছে এসে আরমুগনীকে খুঁজতে থাকলে ফটকের প্রহরী তাদের বললো, “এখানে কাউকে খুঁজছো? এখানে কেউ আসেনি।” রাজার লোকেরা যখন জোর দিয়ে বললো, “আমরা তো দেখলাম একটা চোর এদিকেই এসেছে।” প্রহরী তাদের কড়া ভাষায় বলে দেয়, “না, এখানে কোনো লোক আসেনি। এটা একজন সম্মানি লোকের বসতবাড়ি। এখানে চোর প্রবেশ করবে কিভাবে?”
রাজার লোকেরা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়।
কিছুক্ষণ পর আরমুগানী দাঁড়িয়ে দেখে, হাভেলীর একটি কক্ষে প্রদীপ জ্বলছে। সে বুঝতে পারে, এখানে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। কিন্তু পাশাপাশি এটাও ভাবলো, তার পিছু নেয়া ঘাতকরা এখনও হাভেলীর আশপাশে তাকে খুঁজতে পারে। এ ভাবনায় সে ঠায় বসে থাকে।
আরমুগানী এই হাভেলী সম্পর্কে জানতে কিন্তু কখনো এখানে আসার সুযোগ হয়নি। এটা ছিলো রাজা আনন্দ পালের একান্ত নর্তকী ও গায়িকার হাভেলী। প্রকৃতপক্ষে এই গায়িকা ছিলো মুসলমান। কিন্তু নিজেকে সে বাদিনী বলে পরিচয় দিতে। পেশাগত যোগ্যতা ও দৈহিক সৌন্দর্যে সে ছিলো অনন্যা। সামুরাতি নামেই পরিচয় দিতো নর্তকী। সামুরাতি নিজের যোগ্যতা ও মান সম্পর্কে ছিলো পূর্ণ সচেতন। সে রাজা আনন্দ পালের কাছ থেকে এ দাবী আদায় করে নিয়েছিলো যে, সে রাজ প্রাসাদের ভেতরে বসবাস করবে না। সামুরাতির আবেদনে রাজার টাকায় নির্মিত এই হাভেলীটি ছিলো যথার্থ অর্থেই রাজকীয়। হাভেলীর চারপাশে ছিলো সাজানো মনোরম বাগান। অসংখ্য বাহারী গাছ-গাছালি আর ফুল-ফলের সমাহার। প্রতি রাতের মামুলী নাচের অনুষ্ঠানে নাচ-গান করতো না সামুরাতি। রাজপ্রাসাদে যদি বিশেষ কোন অতিথি আসতো তখন নাচ-গান পরিবেশনের জন্য ডাক পড়তো সামুরাতির। সামুরাতি সাধারণ কোনো নর্তকী নয়, সে একটা উড়ন্ত প্রজাপতি। কারো পক্ষে সামুরাতিকে স্পর্শ করাও অসম্ভব।
সে রাতে যখন আরমুগানী তার হাভেলীতে প্রবেশ করে, এর কিছুক্ষণ আগেই রাজমহল থেকে ফিরেছিলো সামুরাতি। কারণ, এ রাতে অন্য কোনো রাজ্যের রাজার আগমনে রাজপ্রাসাদে বিশেষ নাচ-গানের অনুষ্ঠান ছিলো। সে রাজপ্রাসাদ থেকে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাজ-পোশাক খুলছিলো। সামুরাতির যথেষ্ট বয়স হয়েছে। যৌবন তাকে বিদায় জানাতে চাচ্ছে। সে তার বৃদ্ধা সেবিকার উদ্দেশে বলে, “আজ খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি খালাম্মা।”
“নর্তকীরা যখন ক্লান্তি অনুভব করে, তখন তার উচিত বিয়ে করে ফেলা।” সামুরাতির উদ্দেশে বলে বৃদ্ধা সেবিকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নর্তকী ও গায়িকারা মনে করে তাদের কণ্ঠ আর রূপ-জৌলুস আজীবন অম্লান থাকবে আর তাদের উপর মানুষ সবসময় ফুলচন্দন ছিটাবে।”
“আরে আমি তো এখনও যুবতী।” মুচকি হেসে সেবিকার উদ্দেশে বলে সামুরাতি।
“আমিও তোমার মতোই ভাবতাম। তুমি তো জানো, আমিও তোমার মতোই রাজমহলের নর্তকী ছিলাম। এখন তুমি যেমন সুখ্যাতি পেয়েছে, আমার সময়ে আমিও ছিলাম এমন বিখ্যাত। তুমি যেমন কাউকে পাত্তা দাও না, আমিও তখন বড় বড় মহারাজকেও পাত্তা দিতাম না। তখন আমার পেশায় যেসব প্রবীণ মহিলা ছিলো, তারা আমাকে বিয়ে করার কথা বলতো। আমিও তখন তোমার মতোই বলতাম, আরে এখনই বিয়ে কিসের? আমি তো এখনও যুবতী মাত্র। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, আজ আমি তোমার সেবিকা। প্রবীণদের কথা না মেনে আমি যখন অনেক বয়সে বিয়ে করার জন্য প্রস্তুতি নিলাম, তখন আমার শরীর ভেঙ্গে গেছে। যৌবনে আমার ঘরের আঙ্গিনায় আমার সাথে ভাব জমানোর জন্য যারা সারাক্ষণ ঘুর ঘুর করতো, তারা আমার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কোনো বুড়োও আমাকে বিয়ে রাজি হলো না।”
সেবিকার কথায় ছিলো রূঢ় বাস্তবতা। সামুরাতিও অনুভব করে, তার শরীর অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে। সেবিকা তার চোখে আঙ্গুল দিয়ে বাস্তবতাকে এভাবে দেখিয়ে দিলো যে, সামুরাতির আত্মমগ্নতা উবে গিয়ে তার মনের মধ্যে উঁকি দেয় উদ্বিগ্নতা।
এমন সময় হাভেলীর বাইরে কুকুর ডাকার শব্দ শোনা গেলো। সেই সাথে এমন শব্দ শোনা যায়, যাতে মনে হয় কুকুর কারো উপর হামলে পড়েছে এবং ক্ষতবিক্ষত করছে। সামুরাতি হাভেলী পাহারার জন্য কুকুর পালতো। রাতের বেলায় যে কোনো অনাকাক্ষিত আগন্তকের প্রবেশ থেকে হাভেলীকে রক্ষার জন্য কুকুর হাভেলীর বাগানে ছেড়ে দিতো। কুকুরটি ছিলো খুবই ভয়ংকর আর শক্তিশালী। কুকুরের আগ্রাসী ডাক শুনেই সামুরাতি বুঝতে পারে, নিশ্চয়ই সে কারো উপর হামলা চালিয়েছে। তাই সে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়। সে দেখতে পায়, কুকুর একজনকে কামড়ে ধরে হেচড়াচ্ছে। সে দৌড়ে গিয়ে কুকুরটাকে ধরলে কুকুর রাগে সামুরাতির হাতেও কামড় দেয়।
