“তাহলে তুমি দরজা খুলে দিচ্ছে না কেন?” এক লাফে একথা বলে বিছানা থেকে ওঠে দাঁড়ালো আরমুগানী। তার কক্ষে রাখা বর্শা হাতে নিয়ে বলে, “দূর হো বদকার, বেশ্যা কোথাকার! তোর ঘাতক তিনজনকে নিয়ে আয়, নয়তো আমিই দরজা খুলে দিচ্ছি। দেখবি, কিভাবে তিনজনকে বধ করে তোর শিকার বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়।”
আরমুগনীকে জড়িয়ে ধরে যারকা। বলে, “আরমুগানী! তোমার পায়ে পড়ি, আমার কথা একটু শোনো। আল্লাহর দোহাই লাগে তুমি বাইরে যেও না।”
এদিকে তিন ঘাতক বাইরে দাঁড়িয়ে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে। একজন বললো, “এতোক্ষণে তো দরজা খুলে দেয়ার কথা।”
“কি জানি, ছুড়কি না আবার আমাদের ধোকা দেয়। ও ভেতর থেকে দরজা আটকিয়ে গেলো কেন?” বললো অপর একজন।
“হু, মনে হয় তোমার মেয়ে ওর দাসীতে পরিণত হয়েছে। যারকার বাবার উদ্দেশ্যে উন্মা প্রকাশ করলো অপর এক ঘাতক। “তুমি তো খুব চালাক। কিন্তু অনেক সময় অতি চালাক লোকও বেকুব হয়ে যায়।”
“আরে বক বক করো না তো! আরেকটু সময় অপেক্ষা করেই দেখো না কি হয়।” কিছুটা ধমকের স্বরে বললো যারকার বাবা।
***
যারকা শুয়াইব আরমুগনীকে আরো বলে, “তোমার প্রকৃত পরিচয় উদ্ধার করে দেয়ার দায়িত্ব আমি কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। সেই দায়িত্ব আমি ষোল আনা আদায় করেছি। আমি বাবাকে তোমার প্রকৃত পরিচয় বলে দিয়েছি। আমি ধোকা ও প্রতারণার যে পুতুল সেজে তোমার ঘরে প্রবেশ করেছিলাম, কিন্তু তোমার আকর্ষণীয় পৌরুষ, তোমার ব্যক্তিত্ব আর ইসলামী সালতানাতের প্রতি তোমার শুভ কামনা এবং তোমার উন্নত নৈতিকতার জিঞ্জিরে আমি আটকা পড়ে গেছি। তোমার প্রতারণামূলক কাজের প্রয়োজনে তোমার কাছে আমাকে বিয়ে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু তোমার অকৃত্রিম স্নেহ-ভালোবাসা আমাকে সারা জীবন তোমার দাসী হয়ে থাকার জন্যে বিবেকে তাড়না সৃষ্টি হয়েছে। আমি কোনো দ্র ঘরের মেয়ে নই। এ পর্যন্ত যারাই আমার সঙ্গ দিয়েছে, সবাই আমার শরীর নিয়ে উল্লাস করেছে। একমাত্র তুমি আমাকে হৃদয়ের সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে সিক্ত করেছে। আমাকে হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছো বলেই আমার নিকট তোমার প্রকৃত পরিচয় জানাতে দ্বিধা করোনি। তুমি নিজের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আমার প্রতি তোমার অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছে। এর ফলে আমার হৃদয়ে মরে যাওয়া ইসলামী চেতনা পুনরুজ্জীবন লাভ করেছে।
বাবার নির্দেশ আমি এ জন্যে মানতে বাধ্য হয়েছিলাম যে, ছোট বেলায় আমার মা মারা গেছে। বাবা আমাকে মায়ের আদর দিয়ে বড় করেছে। সে কোনো দিন আমাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি। বাবার ধন-রত্নের কোনো অভাব ছিলো না। সে আমাকে শাহজাদীর মতো আরাম-আয়েশে বড় করেছে। আমি বড় হলে তার ন্যায়-অন্যায় প্রতিটি নির্দেশ অতি-আনুগত্যের সাথে পালন করেছি। বাবা আমাকে ব্যবহার করে হিন্দু ক্ষমতাশীলদের হাত করেছে এবং তাদের মাধ্যমে রাজার বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে। সে তার ঈমান বিক্রি করে প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জন করেছে। সে মুসলমান হয়েও হিন্দুদের হাতে মুসলমানদের অপমা ও লাঞ্ছিত করেছে। এ সবকেই আমি ‘জীবন ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি আমার সামনে যে নতুন জগতের দরজা খুলে দিয়েছে, সে জগত সম্পর্কে আমি মোটেও পরিচিত ছিলাম না। আমি জানতাম না, স্বামীর ভালোবাসাই যে নারীর জাগতিক জান্নাত।
আমি বাবার হক আদায় করেছি। দরজা খুলে ওদের আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত আমার ইচ্ছা ছিলো তোমাকে ধরিয়ে দেবো। কিন্তু যখন ওদের দিকে তাকালাম, ওদের চেহারা দেখে মনে হলো ওরা যেনো আমাকে চিড়ে আমারই কলজেটা বের করে নিতে এসেছে। আমার হৃদয়ে একটা কাঁপুনী অনুভব করলাম। আমার বাবার চেয়ে তখন তোমাকেই বেশি আপন মনে হতে লাগলো। বাবার কাছে আমি একটা পণ্য মাত্র। কিন্তু তোমার হৃদয়ে আমি এক নিঃসীম সুখের আধার। এ জন্য আমি তাদের কাছে মিথ্যা বলেছি। বলেছি, ও এখনো ঘুমোয়নি। একটু অপেক্ষা করো, ঘুমিয়ে পড়লেই তোমাদের ডাকবো। ওরা বাইরে তোমাকে গ্রেফতার করার জন্য অপেক্ষা করছে। আরমুগনী! তোমার ভালোবাসা, ধর্মের প্রতি তোমার নিষ্ঠা এবং তোমার কর্তব্যপরায়ণতার কসম! তুমি পালিয়ে যাও। দেয়াল টপকে পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে যাও। হয়তো তোমার সাথে আবারও দেখা হবে। যদি জীবিত থাকি তবে দেখা হবেই। তুমি যেখানেই থাকো না কেনো আমি তোমাকে খুঁজে বের করবোই।”
ওদিকে অপেক্ষমান তিন ঘাতক দরজা খুলতে বিলম্ব হওয়ায় অস্থির হয়ে পড়ে। তাদের একজন বলে, “আমি ঘরের পেছনের দিকে যাচ্ছি। আমার মনে হয় ওরা পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে গেছে।”
রাজার গোয়েন্দা দলের একজন যখন ঘরের ছাদের উপর ওঠে, তখন আরমুগানী ছাদ থেকে দেয়াল টপকে নীচে নেমে গেছে। কারো উপরে ওঠার শব্দ শুনে সে দেয়াল ঘেঁষে একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। লোকটি ছাদের উপর থেকে আরমুগানীর উদ্দেশে হুমকি দিলে আরমুগানী এক লাফে বাউন্ডারির দেয়াল টপকে দৌড় দেয়। তাকে দৌড়াতে দেখে রাজার লোকেরা হৈচৈ শুরু করে দেয় কিন্তু ততোক্ষণে আরমুগানী কয়েকটি গলি পেরিয়ে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। এরপরও তিন ঘাতক তার পিছু ছুটতে থাকে। আরমুগানী পেছনে তাদের আসতে দেখে দৌড়ের গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। রাতের অন্ধকার তার পথ চলা এবং নিজেকে আড়াল করার জন্য সহায়ক হয়।
