যারকা যখন আরমুগানীর দু’একজন সহকর্মীর নাম-ঠিকানা জানার জন্য কয়েকবার বিগলিত আবেদন জানালো, তখন এক পর্যায়ে রাগে-ক্ষোভে চোখ লাল করে আরমুগানী বললো, “যারকা! এ কথা তোমার মুখে যেননা আর কোনদিন উচ্চারিত না হয়। মনে রাখবে, এ ব্যাপারে আমি তোমার ভালোবাসাকেও ত্যাগ করতে পারবো।”
***
আরো কিছুদিন এভাবেই কেটে যায়। যারকা আরমুগানীর ঘরণী হয়ে দৃশ্যত চরম সুখানুভব প্রকাশ করলেও ভেতরে ভেতরে কঠিন হয়ে ওঠে। ততদিনে আরমুগনী যারকার কাছে নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে দিয়েছে। আরমুগানীর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পর যারা তার প্রতি প্রকাশ্যে আরো বেশি পতিগতপ্রাণ স্ত্রীর মতো আচরণ করতে শুরু করে। এক রাতে দীর্ঘ সময় আরমুগানী ও যারা নিজেদের মধ্যে প্রেম-ভালবাসা ও আদর-সোহাগে কাটিয়ে দেয়। আরমুগানী দিনের বেলায় আস্তাবলে নতুন কিছুসংখ্যক আনীত ঘোড়াকে সামলানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটানোর ফলে দিনে ঘরে সময় দিতে পারেনি বলে মধ্যরাত পর্যন্ত যারকার সাথে খোশালাপ করে। এক পর্যায়ে সে ক্লান্তশ্ৰান্ত দেহে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে! কিন্তু যারকার চোখ নিধুম।
ঘুমন্ত স্বামীকে কিছুক্ষণ জেগে জেগে নিরীক্ষণ করে যারকা। যারকা যখন দেখলো, আরমুগানী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তখন আস্তে করে বিছানা থেকে ওঠে সে সতর্ক পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে পা টিপে টিপে দেউড়ির কাছে চলে আসে। দেউড়িতে এসে বাড়ির গেটে কান লাগিয়ে আবার উঠানে দাঁড়িয়ে কি যেন আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। এরপর ঘরের ভেতরে গিয়ে আরমুগনীকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। আরমুগানী তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে নাক ডাকছে। আবার ঘর থেকে উঠানে এসে পা টিপে টিপে অস্থিরভাবে পায়চারী করছে যারকা। এমন সময় বিড়ালের ডাক শুনতে পায় যারকা। কিন্তু বিড়ালের ডাক কি ঘরের ছাদ থেকে এলো না সদর দরজার বাইরে থেকে এলো, ঠিক ঠাহর করতে পারলো না। সে পা টিপে টিপে সদর দরজার কাছে যায়। সদর দরজার খিল খুলে সে দরজা একটু ফাঁক করে বাইরে তাকালে দেখে তিনজন লোক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এদের একজন এগিয়ে এসে কানে কানে বলে, “ঘুমিয়ে পড়েছে।”
যারকা তাৎক্ষণিক কোন জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ নীরব দাঁড়িয়ে থেকে অতি ক্ষীণকণ্ঠে বললো, “একটু আগেও সজাগ ছিলো, এখন হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি তোমাদের জন্যে গেটের পাশেই অপেক্ষা করছিলাম। তোমরা এখানেই দাঁড়াও। যদি ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে আমি তোমাদের ডাকবো।”
গেটের বিল বন্ধ করে দিয়ে দ্রুত পায়ে ঘরে প্রবেশ করে যারকা। হঠাৎ সে আরমুগনীকে মাথা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে দেয়। গভীর ঘুম থেকে ধড়ফড় করে জেগে উঠে আরমুগানী। চোখ মেলে প্রদীপের আলোয় যারকার চেহারা দেখে ভড়কে যায়। “কি ব্যাপার, তোমার কি হয়েছে যারকা?”
আরমুগানীর মুখে আঙ্গুল দিয়ে যারকা ফিস ফিস করে বলে, “বেশি কথা বলার সময় নেই আরমুগানী।” দ্রুত কথা বলতে শুরু করলো যারকা। “আরমুগানী! এ মুহূর্তে তুমি এখান থেকে পালিয়ে যাও। আমি তোমাকে ধোকা দিয়েছি। আমার বাবা তোমাকে ফাঁসানোর জন্য আমাকে প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করেছে। আমার বাবা আসলে কোন ব্যবসায়ী নন, তিনি আনন্দ পালের পোষা এক গোয়েন্দা। আমরা পেশোয়ার নয়, বাটান্ডা থেকে এসেছি। তোমার ব্যাপারে রাজপ্রাসাদের একজন সংশয় প্রকাশ করেছিলো যে, তুমি গজনী সুলতানের পক্ষে গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত। কিন্তু এই দাবীর পক্ষে এ পর্যন্ত কেউ কোন প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। এই দায়িত্ব অবশেষে আমার বাবার কাঁধে অর্পণ করা হয়- তুমি গোয়েন্দা কিনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে এবং তুমি গোয়েন্দী হয়ে থাকলে তোমার সাথে আর কে কে রয়েছে তা জানতে। দায়িত্ব নিয়ে বাটান্ডা থেকে সে প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাকে এখানে নিয়ে আসে এবং নিজেকে একজন সুলতান ভক্ত ব্যবসায়ী হিসেবে তোমার কাছে পরিচয় দেয়। সে নিজে তোমার প্রকৃত পরিচয় জানার বহু চেষ্টা করেছে কিন্তু তোমার প্রকৃত পরিচয় জানা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে তার কর্তব্য পালনের হাতিয়ার হিসেবে সে আমাকে তোমার কাছে বিয়ে দেয়। অবশ্য আমার রূপ-সৌন্দর্যে তুমি অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছিলে বটে, কিন্তু তোমার প্রকৃত পরিচয় উদ্ধার করা ছিলো আমার দায়িত্ব। কোনো পুরুষই নারীর প্রতি দুর্বলতাকে অস্বীকার করতে পারে না। তদুপরি তোমার কাছ থেকে প্রেম-ভালোবাসা ও চরম অনুগত স্ত্রীর অভিনয় করে তথ্য উদ্ধার করার সফলতা ছিলো আমার একান্ত কাম্য। আমার কাজে আমি শতভাগ সাফল্য পেয়েছি।”
যারকার কথা শুনে আরমুগানীর পিলে চমকে যায়। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো যারকার কথা শুনতে থাকে। যারকা দ্রুত বলে চললল, “তুমি কাজে চলে যাওয়ার ফাঁকে এক মহিলা আমার কাছে আসতো, আমি তোমার কাছ থেকে কতটুকু রহস্য উদ্ধার করতে পেরেছি, প্রতিদিন সে এ রিপোর্ট নিয়ে যেতো। একদিন আমি সেই মহিলাকে বললাম, লোকটি গজনী বাহিনীর একজন ভয়ংকর গোয়েন্দা। সে লাহোর বাটান্ডায় নিয়োজিত গোয়েন্দাদের কমান্ডার। এ কথা শুনে আমাকে তোমার সহকর্মীদের পরিচয় জানার নির্দেশ দেয়। কিন্তু তুমি আমার একান্ত চেষ্টার পরও সহকর্মীদের পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানালে। আমি আমার বাবাকে খবর পাঠালাম, এ লোকের কাছ থেকে তার সহকর্মীদের পরিচয় জানা সম্ভব নয়। এ কথা শুনে আমাকে খবর পাঠালো, আজ রাতে যেন আমি জেগে থাকি। বাইরে বিড়াল ডাকার মিউ মিউ শব্দ শুনতে পেলে আমি যেন দরজা খুলে দিই। তিনজন সশস্ত্র লোক আসবে। এদের মধ্যে আমার বাবাও থাকবে। তারা তোমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। তারপর এরা তোমার কাছ থেকে বাকি তথ্য উদ্ধার করার জন্য তোমাকে অবর্ণনীয় শাস্তি দেবে। আরমুগনী! আমার একটি অনুরোধ তুমি রাখো। এর বেশি আর তুমি আমার কাছ থেকে জানতে চেয়ো না। ওরা এসে গেছে। বাইরে অপেক্ষা করছে।”
