আরমুগনীকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে, “প্রিয়তম! তুমি আমার খ্র আত্মার এই আকুতিটুকু মেরে ফেলে। যাতে আমি শুধু একটা সুন্দরী পুতুলে প্র পরিণত হয়ে যাই। নয়তো আমার কাছে মনে হয় শহীদদের অসমাপ্ত মিশন যদি আমরা পূর্ণ করতে না পারি, তাহলে আমরা মুসলমান হিসেবে নিজেকে পরিচয় C দেয়ার অধিকার রাখি কি? এমন হলে ধর্মই ত্যাগ করা উচিত।”
এমনিতেই যারকার আত্মনিবেদন, কথার জাদুমালা আর রূপ-সৌন্দর্যে আরমুগানীর মধ্যে জন্ম নেয় ভাবালুতা। আবেগে তার মনের গোপন বাঁধ ছিঁড়ে যাওয়ার দশা। এর মধ্যে যারকার এই কাব্যিক কথামালা আর হৃদয় গলানো নিবেদন তাকে আরো বেশি উদ্বেলিত করে তোলে। যারকার ভালোবাসা আরমুগানীর বোধজ্ঞান কর্তব্য ও অঙ্গীকারকে পরাভূত করে ফেলে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অন্তরের গোপন কুঠরীতে পুষে রাখা রহস্যের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলে আরমুগানী। সে বলে, “যারকা! আমি মসজিদে বসে হাতে কুরআন শরীফ নিয়ে শপথ করে বলেছিলাম, জীবন দোবো কিন্তু আমার বন্ধুদের কথা কারো কাছে প্রকাশ করবো না। কিন্তু আজ আমি নির্দিধায় শপথ ভেঙ্গে দিচ্ছি এ কারণে যে, এখন আমার বিশ্বাস হয়েছে তুমি শুধু আমার বিবাহিতা স্ত্রীই নও, তুমি আমার সেইসব বন্ধু ও সহকর্মীদের মতোই বিশ্বস্ত, যারা পেশোয়ার থেকে এখানে আসার আগে কুরআন শরীফ নিয়ে নিজেদের আত্মপরিচয় গোপন রাখার শপথ নিয়েছিলো। যারকা, শোন! তোমাকে আমার গোপন ভেদ বলে দিচ্ছি। আমি গজনী সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। যৌবনেই আমি গজনী সেনাবাহিনীতে গোয়েন্দা বিভাগে প্রশিক্ষণ নিয়েছি এবং প্রশিক্ষণের পর কর্তা ব্যক্তিরা আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। আমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, যতো বেয়াড়া ঘোড়াই হোক না কেন আমার হাতে তাকে বশ মানতেই হবে। তাছাড়া আরো কিছু বৈশিষ্ট্য আমার রয়েছে। এখানে আসার পর আমার এই গুণের কথা জানতে পেরে রাজা আমাকে আস্তাবলের প্রধান নিয়োগ করেন।… সেই দায়িত্ব পালনে আমার ত্যাগের কথা চিন্তা করলে তুমি পেরেশান হয়ে যাবে যারকা। যৌবনের সব আকাক্ষাগুলোকে কর্তব্য পালনের প্রয়োজনে গলাটিপে মেরে ফেলেছি। এখনো পর্যন্ত বিয়ে করিনি। বছরের পর বছর আমি সম্পূর্ণ একাকী কাটিয়েছি। তোমার মতো বহু সুন্দরী রূপসী আমাকে প্রেম নিবেদন করেছে। এমনকি রাজ কুমারীরাও আমাকে একান্তে পাওয়ার জন্য বহু লোভ দেখিয়েছে। প্রেমের আবেদন প্রত্যাখ্যান করায় আমাকে হত্যা করানোর ভয়ও দেখিয়েছি। তবুও নারীর ব্যাপারে আমি পাথর ছিলাম। লাহোর ও বাটান্ডায় গজনীর যতো গোয়েন্দা, সব আমার কমান্ডের অধীনে। যতোবার হিন্দুরা আমাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালনা করেছে, আমার সহকর্মীরা আগেভাগেই এ খবর সুলতানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। যার ফলে সুলতান পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে হিন্দু সেনাদের ফাঁদে ফেলে কচুগাছের মতো কেটেছে।
যারকা! আমরা হলাম সেই চোখ, যে চোখ দিয়ে সুলতান গজনীতে বসেও এখানকার প্রকৃত পরিস্থিতি দেখতে পান। আমরা হলাম সেই কান, যে কানের দ্বারা সুলতান গজনীতে থেকেও লাহোর থেকে কয়টি ঘোড়া তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে তাদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পান। আমার সহকর্মীরা লাহোরে হিন্দু বাহিনীর রসদপত্র জ্বালিয়ে দেয়ার মতো দুঃসাহসী কাজও সাফল্যের সাথে সম্পাদন করেছে। এখন রাজা আনন্দ পাল পুনর্বার সুলতানের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা আবারও তাদের রসদপত্রে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালাবো, যাতে সুলতান যুদ্ধের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ পান।
যারকা! আমার পক্ষে একথা বলা সম্ভব নয়, আর কতদিন আমি তোমায় সঙ্গ দিতে পারবো। তুমি এমন একজন মানুষের সাথে নিজেকে জড়িয়েছে, যার মাথা জল্লাদের তরবারীর নীচে অঁকানো। তোমার বাবাকে আমার এই গোপন পরিচয়ের কথা বলা সম্ভব ছিলো না। কারণ, তার পরিচয় আমার অজ্ঞাত।”
যারকা আরমুগনীকে বুকে জড়িয়ে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে বললো, “আপনি আমার হৃদয়কে আনন্দে ভরে দিয়েছেন। আপনার এই কর্তব্য পালনের কথা শুনে আমার দারুণ সুখ লাগছে। আমি ভীষণ গর্ব অনুভব করছি। আমি আপনার সাথে এ মর্মে অঙ্গীকার করছি, আমাকে আপনি যে কোন কঠিন কাজেই ব্যবহার করুন না কেন। আমি ঠিকই সাফল্যের সাথে সেই কাজ সম্পাদন করতে পারবো। আমাকে যদি আপনি কোনো জায়গায় আগুন লাগাতে বলেন কিংবা আগুনে ঝাঁপ দিতে বলেন, তাতেও আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবো না।”
“আমি নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু তোমাকে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে দেবো না। আমি যদি গ্রেফতার হওয়ার আশংকা বোধ করি কিংবা আমার জীবনহানীর আশংকা সৃষ্টি হয়, তবে বহু আগেই আমি তোমাকে বলে দেবো, আমার অবর্তমানে তোমাকে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে।”
“আপনার দু’একজন সহকর্মীর নাম-ঠিকানা আমাকে বলুন। আপনার ঘরে ফিরতে দেরি হলে বা কয়েক দিন বাড়ি ফেরার সুযোগ না পেলে আমি যাতে আপনার খোঁজ-খবর তাদের কাছ থেকে নিতে পারি।”
“না যারকা! আমরা নিজের মায়ের কাছেও বন্ধুদের পরিচয় প্রকাশ করি না। আমার অবর্তমানে যদি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে আমার সহকর্মীরাই এসে তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবে। তাদের সাথে এমন কোনো চিহ্ন থাকবে, যা দেখে তুমি নিশ্চিত হতে পারবে যে, তোমার সাথে তারা কোনো ধরনের ধোকাবাজি করছে না।”
