‘এ কথাও কি তিনি বলেছেন, তার গোয়েন্দা কাজে সহযোগিতার জন্য তুমি যাতে আমাকে সম্মত করাও?”
“যা, আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনার সাথে এখন আর আমার কিছু লুকানোর নেই। তিনি আমাকে বলে গেছেন, আমি যাতে বলে-কয়ে আপনাকে তার সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করি। কারণ, রাজা আপনাকে এমন দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন, যেখান থেকে আপনি খুব মূল্যবান তথ্য সগ্রহ করতে পারেন।”
“এ জন্যই কি তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। আমার তো মনে হয়, এ কাজের পুরস্কার হিসেবে আমার হাতে তোমাকে তুলে দেয়া হয়েছে।”
“না না, তা নয়। পুরস্কার মনে করতে পারেন। তবে তা আল্লাহ আপনাকে দান করেছেন। কোনো ব্যক্তি দেননি। আপনি এখন শুধু আমার জীবন সঙ্গী নন, আপনি আমার মনের শান্তি, হৃদয়ের অধিপতি। আমি গতকালই আপনাকে প্রথম দেখেছি। অথচ আমার মনে হচ্ছে, কতকাল ধরে আপনি আমার একান্ত পরিচিত। এখন থেকে আপনিই আমার সুখ, আপনিই স্বপ্ন, আপনিই বাস্তব। এখন আপনিই আমার হৃদয় রাজ্যের অধিকারী। আপনার কোনো সংশয়-সন্দেহ পোষণের কারণ নেই। বাবা আপনাকে ইসলামের জন্যে আত্ম-উৎসর্গকৃত পতঙ্গ মনে করতে পারেন। তিনি এতোটাই উগ্রীব যে, পারলে একাই সারা হিন্দুস্তান ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসবেন। আমি দেখেছি, তিনি যতো মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, সবাইকে এ কথাই বুঝাতে চেয়েছেন, সুলতান মাহমুদের বিজয় অভিযানে প্রত্যেক মুসলমানের করণীয় রয়েছে। মসজিদে গিয়ে তিনি দীর্ঘ সময় সুলতানের বিজয় ও হিন্দুদের পরাজয়ের জন্য দুআ করেন। তিনি নিজে আমাকে তরবারী চালনা, অশ্বারোহণ ও তীরন্দাজী শিখিয়েছেন। একবার তো তিনি আবেগে আমার উদ্দেশে বলেই ফেললেন, বেটি হতে পারে আমি তোমার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারবো না, এর আগেই ইসলামের জন্য তোমার কুরবান হয়ে যেতে হবে।”
যারকার কথায়ও আরমুগানী বুঝতে বাধ্য হলো, এ মেয়েটিও তার বাবার মতোই আবেগপ্রবণ।
“এ কথা তোমাদের কে বলেছে যে, আমি গজনীর গোয়েন্দা?”
যারা এ সময় এক হাত আরমুগানীর কাঁধে তুলে নিজেকে এতোটাই কাছে নিয়ে এলো যে, তার ললাট আরমুগানীর ললাট স্পর্শ করছে। বাবাকে এ ব্যাপারে কে কি বলেছে তা আমি জানি না। তিনি আমাকে শুধু বলেছেন, আমরা যার কাছে যাচ্ছি তিনি খুবই কাজের লোক। আপনি যদি সত্যিই বলে থাকেন যে, আপনি সুলতান মাহমুদের গোপন দলের লোক নন, তাহলে সেটা হবে আমার জন্য হতাশার কারণ।”
“তাহলে কি মনে-প্রাণে তুমি আমাকে ভালোবাসা দিতে পারবে না?”
“এ কথা বলছেন কেন? ভালবাসা ভিন্ন জিনিস। একবার মনের মণিকোঠায় যার ঠাই হয়ে যায়, দুনিয়ার কোনো স্বার্থের কারণে তা নষ্ট হতে পারে না। আমার হৃদয় রাজ্যে আপনার আসন পাকাঁপোক্ত হয়ে গেছে। আমি আপনাকে বোঝাতে চাচ্ছি, আমি এমন একটা কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই, যাতে গোটা হিন্দুস্তান না হোক অন্তত অর্ধেক হিন্দুস্তান ইসলামী পতাকার ছায়ায় স্থান পায়। যাতে এখানকার অনাগত প্রতিটি শিশু মুসলমান হিসেবে পৃথিবীর আলো-বাতাসে বেড়ে উঠতে পারে।
“তোমাকে এ কথা কে বলেছে যে, শুধু গোয়েন্দাগিরির দ্বারাই সুলতান মাহমূদকে সহযোগিতা করা যাবে। গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ছাড়াও তাকে আরো সহযোগিতা করার বহু পদ্ধতি রয়েছে।”
“বাবা শুধু গোয়েন্দাগিরির কথাই আমার কাছে বলেছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, নারীরা নাকি গোয়েন্দা কাজে বেশি সহযোগিতা করতে পারে। বাবা বলেছেন, আপনি নাকি এ কাজে আমাকে ব্যবহার না করার জন্য তাকে কুরআন শরীফ হাতে তুলে দিয়ে শপথ করিয়েছেন। আমিও এমন কোনো কাজ করতে পারবে না যে ক্ষেত্রে আমার ইজ্জতের উপর আঘাত আসতে পারে। তবে এ কথাও ঠিক, শুধু আপনার বিবি হয়ে ঘরে বসে থাকাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার হয়ে আপনি সে কাজ করুন যা বাবা আপনাকে বলে গেছেন। তাতেই আমার আত্মা শান্তি পাবে।”
শুয়াইব আরমুগানী যারকার এ আবেদনের কোনো সান্ত্বনাদায়ক জবাব দিতে পারেনি।
* * *
সেদিন থেকেই ঘরের প্রতি আরমুগানীর আকর্ষণ বেড়ে যায়। সে এখন কাজের মধ্যে সময় বের করে ঘরের পথ ধরে। ঘরে কিছুক্ষণ যারকার সাথে কাটিয়ে আবার কাজে যায়। যারা এখন আরমুগানীর স্ত্রী। কিন্তু আরমুগনী তাকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েও স্বস্তি পাচ্ছে না। বারবার সে যারকার দিকে এমনভাবে তাকায়, যেনো যারকাকে কেউ কোনো সময় তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার আশংকা আছে। আরমুগানীর সীমাহীন ভালোবাসার বিপরীত যারকাও তার প্রতি আত্মোৎসর্গকৃত মনোভাব পোষণ করে, তার প্রেমে যারকা যে চরম সুখী তা অকপটে প্রকাশ করে। আর প্রতি রাতেই সে আরমুগনীকে প্ররোচনা দেয় ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণে আরমুগানী যেনো অবশ্যই তার বাবার কাজে সহযোগিতা করে। সুলতান মাহমূদের বিজয়ের জন্য অবশ্যই আরমুগানী যেনো কিছু একটা ভূমিকা রাখে। সেই সাথে যারকা আরমুগানীর প্রতি সীমাহীন বিশ্বস্ততার প্রকাশ ঘটাতে থাকে। সুলতান মাহমুদের সাফল্যের চিন্তায় সে বারবার আবেগে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। যেনো সুলতান মাহমূদের অমঙ্গল হলে সে মরেই যাবে।
* * *
বিয়ে পরবর্তী উষ্ণতা, আবেগ ও পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসার মুগ্ধতার মধ্যে কিভাবে কেটে গেলো দশ-বারো দিন তা আরমুগানী টেরই পায়নি। দশ-বারো দিন পর এক রাতের প্রায় দ্বিপ্রহর। স্বামী-স্ত্রী পরস্পর ভালোবাসার উষ্ণতায় পরিতৃপ্ত। যেনো উভয়ের শরীর বেয়ে প্রেম গলে গলে পড়ছে। রাত বাড়ছে। দিনভর ক্লান্তিকর শ্রমের কারণে আরমুগনীর দু’চোখ বুজে আসছে। যারকা আরমুগানীর গলায় নিজেকে জড়িয়ে বলে, “আপনার শরীরের উষ্ণতা, আপনার ভালোবাসা, আপনার সৌন্দর্য আমাকে যেনো বেহেশতে পৌঁছে দিয়েছে। সত্যিই আমার মনে হয় জান্নাত এর চেয়ে মোটেও বেশি সুখের নয়। কিন্তু এতো ভালোভাসা, এতো প্রেম, এতো সুখের মধ্যেও আমার চোখে যখন দীনের জন্যে শাহাদাতবরণকারী যোদ্ধাদের ছবি ভেসে ওঠে, তখন আমার মনটা বিষিয়ে ওঠে। মনে হয় শহীদদের আত্মাগুলো আমার এই সুখানন্দে অভিশাপ দিচ্ছে। আমার কানে যেনো ধ্বনিত হয় শহীদদের কণ্ঠ, তুমি প্রেম ভালোবাসায় ডুবে আছে! আমাদের আত্মার শান্তি আর আত্মত্যাগকে সফল করার পরিবর্তে অলস সময় কাটাচ্ছে!”
