মেহমান কালবিলম্ব না করে কুরআন শরীফ স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো, “মেয়ের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে আপনি আমার উপর জুলুম করেছেন। আপনি জানেন না আমি কী ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছি। যদি আমি ধরা পড়ে যাই তাহলে আমার মেয়েকে করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে। আপনি কি এ মুহূর্তে আমার মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারবেন? কিছুক্ষণ তাকে আপনার এখানে রাখতে পারবেন। এ অবসরে আমাকে ব্যবসায়িক কাজে একটু বাইরে কাটাতে হবে।”
“কোনো তরুণী মেয়েকে অনাত্মীয়ের ঘরে রাখা অশংকাজনক কাজ। কিন্তু আমি আপনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারছি না, আবার গ্রহণ করতেও ভয় পাচ্ছি।”
মেহমান বণিক বসা থেকে ওঠে ঘরের মেঝেতে মাথা নীচু করে পায়চারী করতে থাকে। কিছুক্ষণ ভেবে বললো, “আমি যদি আপনার কাছে আমার মেয়েকে পেশ করি, তাহলে আপনি তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হবেন? আমি চাচ্ছি, নিজেই ওর বিয়ে পড়িয়ে দেবো।”
“আপনি আমার মধ্যে এমন কি গুণ দেখতে পেলেন যে এমন সুন্দরী মেয়েকে আমার মতো একটা সাধারণ লোকের সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছেন? আমি নিজেকে আপনার মেয়ের জন্য উপযুক্ত মনে করি না।”
“তোমার সবচেয়ে বড় গুণ তুমি গোয়েন্দা নও। এ জন্যই আমি তোমাকে যাচাই করতে চাচ্ছিলাম, তুমি গোয়েন্দাগিরি করো কিনা। তুমি একজন বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী। এদিক থেকে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপদ। কারণ, গোয়েন্দাদের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। তারা তাদের স্ত্রী-সন্তানদের সাথে রাখতে পারে না। আমার মেয়ের জন্যে বহু বিত্তশালী পাত্র আছে। পেশোয়ারে অবস্থানকারী এক ডেপুটি সিপাহসালার আমার মেয়েকে বিয়ে করতে আগ্রহী। কিন্তু আমি সম্মতি দেইনি। আমি কোনো বিত্তশালীর কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে চাই না। কারণ, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এক বিবিতে সন্তুষ্ট থাকে না।”
মেহমানের বিয়ের প্রস্তাবের কথা নিজের কানে শুনেও শুয়াইব আরমুগানীর যেনো বিশ্বাস হচ্ছিলো না। কারণ, এই তরুণীকে প্রথম দর্শনে সে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেছে। মেয়ের বাবা নিজ থেকে বিয়ের প্রস্তাব করায় তার পক্ষে এ ব্যাপার নিয়ে আর ভাবনা-চিন্তা করা অপ্রীতিকর মনে হচ্ছে। তারপরও আরমুগানীর মাথায় বিক্ষিপ্ত ভাবনারা ভীড় করছে।
“আমি আজ সন্ধ্যায় আবার আসবো।” এই বলে আরমুগানীর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মেহমান। এখন আরমুগানী আর তরুণী ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই।
সকাল বেলা। নাস্তার আয়োজন করে আরমুগানী তরুণীর সামনে রেখে বললো, “তোমার নাম কি?”
মেয়েটির সলজ্জ উত্তর, “যারকা।”
“আমার সাথে তোমার বিয়ে হচ্ছে। তোমার বাবা কি তোমাকে একথা বলেছেন?”
আরমূগানীর কথা শুনে তরুণী লজ্জায় মাথা এতোটাই নীচু করে ফেললো যে, সে যেনো লজ্জায় মারা যাচ্ছে।
“আরে এতো লজ্জা কিসের? আমার কথার জবাব দাও যারকা?” আরমুগানী তরুণীর চিবুক ধরে মাথা উপরে তুলে বললো। “আমাকে ভালো করে দেখে নাও। আমাকে যদি তোমার পছন্দ না হয় তাহলে পরিষ্কার বলে দাও। তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সারা জীবনের জন্যে আমি তোমাকে শিকলে বাঁধতে চাই না। তুমি অসম্মত হলে আমি তোমার বাবাকে খোলাখুলি নিষেধ করে দেবো। বলবো, এ বিয়ে হবে না।”
তরুণী মুখে কিছুই বললো না। আরমুগানীর ডান হাতটি টেনে নিয়ে চুমু দিলো এবং চোখে চোখ রাখলো তরুণী।
প্রায় যৌবনের শুরু থেকেই অশ্বারোহণ ও অশ্ব প্রশিক্ষণে কেটেছে আরমুগানীর জীবন। অশ্বলোমের স্পর্শে ঘোড়ার গায়ে হাত বুলাতে অভ্যস্ত সে। সে কখনো অনুভব করেনি কোনো যুবতী তরুণী সুন্দরীর এমন মায়াবী স্পর্শ, শরীর জুড়ে শিহরণ। এমন ভুবন মোহিনী চাহনী, এমন নজরকাড়া দৃষ্টি, এমন রেশম কোমল স্পর্শের সাথে আরমুগানী অপরিচিত। হঠাৎ রূপসীর এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও আত্মনিবেদনে আবেগে আত্মহারা হয়ে গেলো আরমুগানী।
সন্ধ্যায় যারকার বাবা যখন ফিরে এলো, তখন তার সাথে এলো আরও দু’জন। তারা এসে শুয়াইব আরমুগানীর সাথে যারকার বিয়ে পড়িয়ে দিলো। যারকার পিতা যারকাকে বিয়ে উপলক্ষে দামি দামি কাপড়, গহনাপত্র এবং প্রচুর নগদ অর্থ উপঢৌকন দিলো।
বিয়ে পর্ব সেরে রাতেই যারকার বাবা আরমুগানীর ঘর থেকে বিদায় নেয়। তার যাওয়ার ভঙ্গিটা এমন ছিলো, সে যেনো যারকার বিয়ে দিতেই এখানে এসেছিলো। সেই রাতে ওয়াইব আরমুগানীর সংশয় হচ্ছিলো, কোনো স্বপ্ন দেখছে না তো?
যারকার বাবা চলে যাওয়ার একটু পরে যারকা আরমুগানীর সাথে এমন অন্তরঙ্গ মনোভাব পোষণ করছিলো যেনো আরমুগানী তার অনেক দিনের পরিচিত। মনে হচ্ছিলো, দীর্ঘদিন থেকে সে আরমুগনীকেই মনের একান্ত পুরুষ হিসেবে পাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিলো। যারকার আত্মনিবেদনে আরমুগানী এতোটাই আত্মহারা যে, মনে হচ্ছিল ঝর্নার তীরে এসেও সে তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছে।
“তোমার বাবা সুলতান মাহমুদের ব্যাপারে বেশি আবেগপ্রবণ।” যারকার উদ্দেশ্যে বললো আরমুগানী। “আচ্ছা তুমি কি বলতে পারো তার এসব বলার উদ্দেশ্য কি?”
“আমি যদি বলি, বাবা যে ইচ্ছা পোষণ করেন, আমিও তাই পোষণ করি। তাহলে আপনি আমার এ ইচ্ছাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? বাবা আপনার সাথে যেসব কথা বলেছেন, তিনি সবই আমাকে বলে গেছেন।”
