“তা ঠিক। কিন্তু শুধু সেনাদের যুদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়। সকল মুসলমানেরই উচিত কিছু না কিছু করা। দেখুন, আমরা দুজন মুসলমান এখানে আছি। আমরা মুসলিম বাহিনীর জন্য কি করেছি। অথচ তারা জীবনবাজি রেখে কাফেরদের দেশে ইসলামের পতাকা তুলে ধরেছে। আর আমি এখানে ব্যবসা করছি, আপনি বেঈমানদের নৌকরী করছেন।” মেহমান বললো।
“এখন করছি বটে। প্রয়োজনে আমি চাকরি ছেড়ে দেবো।”
“না ভাই। চাকরি ছাড়ার প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে দেখতে চেয়েছিলাম, আপনি কোন্ পর্যায়ের মুসলমান। এখন বুঝতে পারছি, আপনি ইসলামের জন্যে মরণ স্বীকার করতে প্রস্তুত। এখন আমি আপনার সাথে মন খুলে কথা বলতে পারবো। আপনি চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথা বলছেন। এটা ঠিক হবে না। চাকরিটাকে আপনি সুলতান মাহমূদের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারেন। আপনি আস্তাবলের প্রধান এবং প্রশিক্ষক। অশ্বারোহণ প্রশিক্ষক হওয়ার সুবাদে হিন্দু সেনা কর্মকর্তাদের ছেলে-মেয়েরা আপনাকে খুবই পছন্দ করে বলে আমাকে জানিয়েছে সেই লোক- যে লোকটি আমাকে আপনার বাড়ির পথ দেখিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, শাহজাদীরা ও উজির-মন্ত্রীদের তরুণী মেয়েরাও আপনাকে ভালোবাসে। আপনার আর কিছু করার দরকার নেই, শুধু এতোটুকু জানতে চেষ্টা করবেন, রাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? এখানকার প্রস্তুতি ও তৎপরতা দেখে-শুনে সুলতান মাহমূদের কাছে সুযোগ মতো খবর পাঠিয়ে দেবেন।”
“আপনি এ ধরনের কাজ করেন নাকি?”
একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে মেহমান বললো, “আসলে আমি যথার্থই একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু ব্যবসায়িক কাজে আমার লাহোর আসার কোন প্রয়োজন ছিলো না। আমি উট বোঝাই করে মালপত্র নিয়ে এ জন্যে লাহোর এসেছি যাতে এখানকার পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারি। রাজা আনন্দ পাল কি করেছে, তার রণপ্রস্তুতি কোন্ পর্যায়ে এবং কবে নাগাদ সে মুসলমানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা করেছে- এসব জানাই হলো আমার মূল উদ্দেশ্য। ওদিকে সুলতানের কিছুটা সময় দরকার। কাশগরীদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে তার বিপুল সৈন্য হারাতে হয়েছে। সেনাবাহিনীকে পুনরায় তৈরি করার জন্যে তার কিছুটা সময় একান্তই দরকার।”
“আপনাকে কেউ পাঠিয়েছে। না আবেগের টানেই আপনি এ কাজ করছেন?”
“আমি কোনো মাধ্যম হয়ে কাজ করি না। সরাসরি আমার সম্পর্ক সুলতান মাহমূদের সাথে এবং তার প্রধান সেনাপতি আবু আবদুল্লাহ আল-তায়ীর সাথে। এখানে আমার এমন একজন লোকের দরকার যে রাজ-দরবার ও রাজমহলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর রাখে, আর সেই লোকটি আপনি। যে লোকটি আমাকে বাড়ির পথ দেখিয়ে দিয়েছে সে আমার বিশ্বস্ত। সে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে বুঝে-শুনেই আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে।”
“সে কো”।
“সে কথা আমি আপনাকে বলতে পারবো না। তাতে আপনি এমনটা মনে করবেন না আমি আপনাকে বিশ্বাস করছি না। আমি সবই আপনাকে জানাবো কিন্তু আপনাকে এ প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে, আপনি আমার কাজে সহযোগিতা করবেন? যদি আপনি আমাকে ধোকা দেন তাহলে পস্তাতে হবে।”
মেহমানের এসব কথা শুনে আরমুগনীর মাথা নীচু হয়ে গেলো। সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেলো।
“আপনি একটু ভেবে দেখুন। সুলতান মাহমূদের প্রয়োজনে আমি আমার তরুণী মেয়েকে পর্যন্ত ব্যবহার করার জন্যে তৈরি হয়ে গেছি।” প্রচণ্ড আবেগে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো মেহমান। “এমন রূপসী তরুণী যে প্রয়োজনে পাথর ভেঙ্গে ভেতরের তথ্য বের করে আনতে পারবে। এমনও হতে পারে যে, এখানে আমাদের কোনো নাশকতামূলক তৎপরতা চালাতে হবে।”
“আমার দুটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন।” বললো আরমুগানী।
“মেয়েদেরকে কখনো এ কাজে ব্যবহার করবেন না। মুসলমান মেয়েরা প্রয়োজনে লড়াই করে, অতীতে বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা ময়দানে লড়াই করেছে। কিন্তু গোয়েন্দা কাজের জন্য তাদেরকে কাফেরদের মনোরঞ্জনের জন্য ছেড়ে দেবেন না। এটা সম্পূর্ণ হারাম। এ ঘৃণ্য কাজ বেঈমানরা করে। মুসলমানরা নারীর ইজ্জত রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে- ইজ্জত বিকিয়ে দেয়ার জন্য নয়। দ্বিতীয় কথা হলো, আমি আপনার কোনো সহযোগিতা করতে পারবো না। আমি রাজার খাই, রাজার সেবা করি। রাজা আমাকে এতো পারিশ্রমিক দিচ্ছেন যে তা আমার শ্রমের তুলনায় বহুগুণ বেশি।”
“হু, একদিকে আপনি ইসলামী চেতনা ও মর্যাদার কথা বলেন, আর অপরদিকে বেঈমানদের নিমক হালালী করেন। অথচ আমি শুনেছিলাম আপনি খুবই সাহসী ও নির্ভেজাল ঈমানদার মানুষ।”
“এই উভয়টাই আমার মধ্যে আছে। সাহসও আমার আছে, ঈমানেও কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু তাই বলে মুসলমান নিমকহারাম হয় তা আমি বলতে পারবো না।”
“তাহলে তো তাড়াতাড়ি আমার লাহোর ছাড়া দরকার। কারণ, আপনি আমাকে ও আমার মেয়েকে ধরিয়ে দিতে পারেন। এখানকার বিশ্বস্ত লোকেরা আমাকে বলেছে, সন্দেহ হলেই মুসলমানদেরকে রাজার সৈন্যরা পাকড়াও করছে।”
চকিতে বসা থেকে ওঠে তাক থেকে কুরআন শরীফ নামিয়ে মেহমানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, পবিত্র কিতাবের শপথ করে বলছি, আমি আপনাকে ও আপনার মেয়েকে কখনো ধরিয়ে দেবো না। আপনার সাথে কোনো ধরনের ধোকাবাজি করবো না। এখন আপনি শপথ করে বলুন, এ কাজে আপনি আপনার মেয়েকে কখনো ব্যবহার করবেন না। আর আপনি সুলতান মাহমূদ গজনবীকেও ধোকা দেবেন না।”
