লোকটি পেশোয়ারের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল। মুসাফিরদের জন্যে সরাইখানায় থাকার ভালো ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এমন সুন্দরী যুবতী মেয়েকে সরাইখানায় রেখে আসা ঠিক মনে করিনি। শুনেছি, হিন্দু সেনারা হঠাৎ করে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায় আর সন্দেহের নাম করে মুসলমানদের বন্দী করে। এক লোক আপনার কথা বলে দিলো। বললো, সে খুব ভালো মানুষ। একাকী থাকে। আপনি মেয়টিকে নিয়ে তার বাড়িতে চলে যান। সেই লোকটির মুখে আপনার খুব প্রশংসা শুনলাম। সে-ই আমাকে আপনার বাড়ির পথ দেখিয়ে দিয়েছে। লোকটি বললো, আপনার বাড়িও নাকি পেশোয়ারে।
কোনো মুসলমান অসহায় মুসাফিরের জন্যে তার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে পারে না। যেখানে একটি মুসলিম তরুণীর ইজ্জতের প্রশ্ন, সেখানে আমি প্রয়োজনে সারারাত পাহারা দিয়েও কাটাতে পারি। মুসলমান অপরিচিত হলেও পর হতে পারে না। আসুন, আপনার মেয়েকে ঘরের ভেতর নিয়ে আসুন। আমার ঘরে কয়েকটি কক্ষ আছে।
লোকটি তরুণী মেয়েটিকে নিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো। তরুণী বাতির আলোয় যখন তার চেহারার নিকাব ফেলে দিলো, তখন শুয়াইব আরমুগানী তার চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেলো।
মেয়েটি কোনো সাধারণ তরুণী ছিলো না। তার চেহারা ছিলো চাঁদের মতো আকর্ষণীয়। তরুণীর রূপ দেখে আরমুগানীর মুখ থেকে আচমকা উচ্চারিত হলো, আপনি সরাইখানায় না থেকে ভালো করেছেন। ঢেকে রাখার মতো জিনিসকে একটি নয়, সাত পর্দার আড়ালে রাখাই উচিত।
আগন্তুককে বসিয়ে রেখে দৌড়ে বাজারে গেলো আরমুগনী। বাজার থেকে মেহমানদের জন্যে খাবার নিলো। ততক্ষণে তরুণী বোরকা খুলে মাথার উড়নাও খুলে ফেলেছে। বে-নেকাব তরুণীর রূপ-সৌন্দর্য দেখে আরমুগানী আর তরুণীর চেহারা থেকে দৃষ্টি সরাতে পারলো না।
রাজপ্রাসাদের চাকরির সুবাদে কয়েকজন সুন্দরী তরুণী আরমুগানীকে বাহুডোরে বাঁধতে চেয়েছিলো। কিন্তু আরমুগানী কারো বাঁধনেই নিজেকে আবদ্ধ করেনি। রাজা আনন্দ পালের দু’রাজকুমারী আরমুগানীর কাছে অশ্বারোহণ শিখতে আসতো। এরা উভয়েই চেষ্টা করতো তারা নিজে নিজে ঘোড়ার পিঠে ওঠে বসবে না, আরমুগনী যাতে হাত ধরে তাদের ঘোড়ার পিঠে তুলে দেয়। তারা অশ্বারোহণ শিখে ফেলেছিলো, তবুও বারবার শেখার জন্যে আসতো আর বলতো, এখনো তারা ভালোভাবে অশ্বারোহণ করতে পারে না।
উভয় রাজকুমারী ছিলো সুন্দরী-রূপসী। তাদের পরিষ্কার ইঙ্গিতপূর্ণ আবেদনগুলোও আরমুগানী এভাবে এড়িয়ে যেতো, সে এতোটাই গেয়ো যে এসব বোঝে না। অথবা এমন ভাব করতো যে, তার বুকের মধ্যে পুরুষের আত্মাই নেই।
একবার এক রাজকুমারী ঘোড়া হাঁকিয়ে তাকে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানকার এক নিরিবিলি বনানীতে রাজকুমারী আরমুগনীকে অনুরোধ করে বলে, সে যেনো তার পেছনে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসে। কারণ, তার পড়ে যাওয়ার ভয় হচ্ছে। রাজকুমারী প্রথমে বন্ধুত্বের সুরে বললো, আরে এসো না! আমাকে ধরে রাখো। কিন্তু আরমুগানী তার সহ-সওয়ার হতে অস্বীকৃতি জানালো। কয়েকবার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে রাজকুমারী নির্দেশের সুরে তার ঘোড়ায় চড়তে বলে। এবার মুচকি হেসে আরমুগনী এড়িয়ে গেলো, তবুও একই ঘোড়ার পিঠে রাজকুমারীর সাথে বসতে রাজি হলো না। এতে রাগ করে রাজকুমারী ঘোড়া ফিরিয়ে প্রাসাদে চলে এসেছিলো।
নারীদের ব্যাপারে আরমুগানী ছিলো পাথর। কিন্তু এবার সে নিজের ঘরে আসা মেহমানের তরুণী মেয়েকে দেখে নিজের মধ্যে ঝড় অনুভব করলো। এক প্রবল আকর্ষণ তাকে তরুণীর দিকে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করতে লাগলো। সে তরুণীর সাথে কথা বলার জন্য মনের মধ্যে তাড়না বোধ করলো। সেই সাথে মনে মনে এ কথাও সে ভাবতে লাগলো, এর মধ্যে তার কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই তো! সে চাচ্ছিলো, তার মেহমান যদি বাইরে চলে যেতো, তবে এখানেই সে তরুণীর সাথে আলাপ জমাতে পারতো। তরুণী যখন শুয়াইব আরমুগনীর দিকে তাকাতো, তখন তার ঠোঁটের কোণার ঈষৎ মুচকি হাসিটা আরমুগানীর মধ্যে এক তাণ্ডব শুরু করে দিচ্ছিলো।
রাতের আহার পর্ব সেরে আরমুগানী মেহমানদের রাত যাপনের জন্য অন্য দু’টি কক্ষ দেখিয়ে দেয়। তরুণী দেখিয়ে দেয়া কক্ষে শুয়ে পড়ে। কিন্তু তরুণীর বাবা ফিরে এসে আরমুগানীর পাশে বসে।
রাতের অবসরে তারা নানা বিষয়ে কথাবার্তা বলতে থাকে। এক পর্যায়ে মেহমান বলে, আমি মুসলমান হিসেবে সুলতান মাহমূদের অব্যাহত বিজয়ে গর্ববোধ করি। মেহমানের কথাবার্তায় প্রকাশ পাচ্ছিলো, সে সুলতান মাহমূদের খুবই ভক্ত এবং তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল। সে শুধু একজন ব্যবসায়ী নয়, জ্ঞান-গরিমা ও বেশ উঁচুমানের লোক মনে হলো তার আলাপচারিতায়। সে মুহাম্মদ বিন কাসিমের প্রসঙ্গেও আলোচনা করলো। এখনও যদি সেই চেতনায় সুলতান মাহমূদ অগ্রসর হন, তাহলে সারা হিন্দুস্তান মুসলমানদের কজায় নিয়ে আসা সম্ভব। মেহমান এই আশংকাও ব্যক্ত করলো, সুলতান মাহমুদের কাছে সৈন্য বাহিনী কম। হিন্দুস্তানের সকল রাজা-মহারাজা মিলে যদি তার বিরুদ্ধে। যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে সুলতান মাহমূদের পক্ষে পেরে ওঠা অসম্ভব।
আরমুগানী মেহমানের বুদ্ধিদীপ্ত কথায় খুবই খুশি হলো এবং বললো, মুসলমানদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। সুলতানের সৈন্যরা আল্লাহর উপর অসা রেখে যুদ্ধ করে।
