আজ পর্যন্ত কিংবা স্বর্গবাসী মহারাজা জয়পালও সুলতান মাহমূদকে কোন ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকাতে পারেনি। বললো জয়পালের এক সেনাপতি। আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছার আগেই সে খবর পেয়ে যায়। যার ফলে সে তার সেনাবাহিনীকে নিজের মতো করে প্রস্তুত করে নেয়। প্রতিবারই দেখা গেছে, আমরা তার তৈরি ফাঁদে আটকা পড়েছি। এর অর্থ হলো, সে আমাদের অগ্রাভিযানের আগাম সংবাদ পেয়ে যায়। তার গোয়েন্দারা খুবই সতর্ক। এরা হয়তো আমাদের মধ্যেই বসবাস করে।
কিছুসংখ্যক মুসলমান আমাদের এখানে বসবাস করে, এদের মধ্যেই হয়তো গোয়েন্দা রয়েছে। বললো আনন্দ পাল। এ জন্য মুসলমান আবাদী ধ্বংস করে দেয়া দরকার।
এই পদক্ষেপ আমাদের তেমন কোন ফল দেবে না মহারাজ। বললো আনন্দপালের প্রধান উজীর। সেসব লোককে এখান থেকে তাড়িয়ে দিলে গোয়েন্দারাও পালিয়ে যাবে। তার চেয়ে আমাদের উচিত, এমন পদক্ষেপ নেয়া যাতে গোয়েন্দাদের ধরা যায়। এখানকার মুসলমানদের শত্রু বানানো ঠিক হবে না। আপনি তো জানেন, সব মুসলমান গোয়েন্দাগিরি করে না। মুসলমানের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি মুসলমানের দ্বারা স্বার্থকভাবে করানো সম্ভব। আমাদের এ পদক্ষেপ নেয়া দরকার, যাতে মুসলমানরাই আমাদের হয়ে মুসলমান আবাদীর ভেতরের খোঁজ-খবর রাখে। এদের মধ্যে কে কে গোয়েন্দাগিরি করে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। অন্তত একজনকে যদি ধরা যায়, তাহলে এ কাজে কারা জড়িত সে তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
তাহলে এদের ধরার কাজ আজ থেকেই শুরু করো এবং দ্রুত সেনা প্রস্তুতি শুরু করে দাও।
আনন্দ পালের উজির সন্তুষ্টির সাথে জানালো, প্রজারা খুবই সহযোগিতা করছে মহারাজ। মন্দিরে মন্দিরে পুরোহিত পণ্ডিতরা সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং পুনরায় চূড়ান্ত আঘাত হানার ব্যাপারে জনগণকে উৎসাহিত করছে। জনসাধারণকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। ফলে সেনাবাহিনীতে দলে দলে যুবক ভর্তি হচ্ছে এবং প্রজাসাধারণের পক্ষ থেকে অঢেল ধন-সম্পদ রাজকোষে জমা হচ্ছে।
* * *
রাজা আনন্দ পালের রাজপ্রাসাদে ঘোড়ার দেখাশোনা এবং বেয়াড়া ঘোড়াকে বাগে আনার কাজে নিয়োজিত ছিলো ওয়াইব আরমুগানী নামের এক মুসলমান। সে ছিলো সুঠাম ও স্বাস্থ্যবান, দীর্ঘদেহী ও অভিজ্ঞ অশ্বারোহী। সে পেশোয়ারের অধিবাসী। রাজা জয়পালের আত্মাহুতির আগে সে লাহোরে আসে। তখন সে ছিলো তরুণ। আর এখন সে পূর্ণ যুবক। সে যে কোনো বেয়াড়া ঘোড়াকে সহজে বাগ মানাতে পারে। এ জন্য রাজা জয়পাল যেমন শুয়াইব আরমুগানীকে ভালবাসতো, রাজা আনন্দ পালও তাকে অধিক পছন্দ করে। ঘোড়া বাগ মানানো ছাড়া আরও বহু গুণের অধিকারী ওয়াইব। যার ফলে রাজ প্রাসাদের সকল মানুষ এমনকি রাজকুমারী ও রাজকুমারদের কাছে শুয়াইব আরমুগানী ছিলো খুবই প্রিয়পাত্র। তার কণ্ঠ ছিলো মায়াবী এবং কথাবার্তায় ছিলো জাদুমাখা। তার ঠোঁটে সব সময় হাসি লেগে থাকতো। তার বিশ্বস্ততার প্রশ্নে কারো মনে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিলো না। রাজপ্রাসাদে সে এতোটাই বিশ্বস্ত ও প্রিয়পাত্র ছিলো যে, রাজমহলের সবাই তাকে নামে মাত্র মুসলমান ভাবতো।
রাজা আনন্দ পালের রাজমহলে আরো ক’জন মুসলমান কর্মচারী ছিলো। তারা ছোট ছোট কাজ করতো। রাজা আনন্দ পালের নির্দেশে অতি গোপনে এসব মুসলমানদের পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে দিলো উজির। হিন্দু সেনারা মুসলমানদের ছদ্মবেশে তাদের যাচাই করতে শুরু করলো। তারা সুলতান মাহমূদের পক্ষে আর হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিষোদগার করতো। সেই সাথে মুসলমান মহিলাদের সাথে খাতির জমিয়ে তাদের স্বামী-পুত্রদের মনোভাব ও কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতো। হিন্দু পুরুষরা ছদ্মবেশ ধারণ করে মুসলমান পুরুষদের সাথে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করতো এবং তাদের ভেতরের খবর জানার জন্যে বন্ধুত্বের অভিনয় করতো। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদেরকে সুলতান মাহমুদের গোয়েন্দা বলেই পরিচয় দিতো। এই প্রচেষ্টায় একজন মুসলমানকে গোয়েন্দা সন্দেহে গ্রেফতার করা হলো। সন্দেহের ভিত্তিতে আরো কয়েকজন মুসলমানকে গ্রেফতার করে কারা প্রকোষ্ঠের অন্তরালে কঠিন শাস্তির চাকায় পিষ্ট করতে শুরু করলো।
শুয়াইব আরমুগানী মুসলমান হলেও তার প্রতি কারো সন্দেহ করার অবকাশ ছিলো না। কারণ, সে ছিলো আস্তাবলের প্রধান। ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ করা এবং আস্তাবল দেখাশোনার মধ্যে তার কার্যক্রম ছিলো সীমিত। তাকে সন্দেহ করার একটিমাত্র অজুহাত ছিলো যে, সে একাকী থাকতো। পেশোয়ারে তার স্ত্রী-সন্তান থাকলেও তাদের সে কখনো লাহোর আনেনি। সে অবিবাহিত হলে অতোদিনে তার বিয়ে করার প্রয়োজন ছিলো। এদিক থেকে তাকেও সন্দেহ করা যেতো কিন্তু এসব ব্যাপারে তাকে সবাই সন্দেহের বাইরে রেখেছিলো। তার সম্পর্কে অনেকেই জানতো, সে সুলতান মাহমূদ সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে। সে সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলে। তাকে কেউ কখনো মসজিদে যেতে দেখেনি। কোন মুসলমানের সাথে মিশতেও তাকে দেখা যায়নি।
এক সন্ধ্যায় তার বসতঘরে সে একাকী বসেছিলো। এমন সময় তার দরজায় কে যেনো টোকা দেয়। সে উঠে এসে দরজা খুলে দেয়। বাইরে দাড়িওয়ালা এক পৌঢ়ের সাথে বোরকা পরিহিতা এক যুবতী দাঁড়িয়ে। পুরুষটি নিজের পরিচয় দিয়ে জানালো, সে পেশোয়ারের অধিবাসী। একজন ব্যবসায়ী। সে ব্যবসায়িক কাজে এখানে এসেছে। তার মা মরা মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে হয়েছে। কারণ, বাড়িতে কারো কাছে রেখে আসার মতো লোক তার নেই। মেয়েটির মা দু’বছর আগে মারা গেছে। মেয়েটিও বেড়ানোর জন্য আগ্রহী ছিলো। এ জন্য তাকে আর রেখে আসার চিন্তা করিনি।
