ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় পাওয়া যায়, সুলতান মাহমূদ তার বাহিনীকে বিজয়ের আনন্দে বিভোর হয়ে অবকাশ যাপনের সুযোগ দেননি। তিনি পুনরায় সৈন্যদেরকে অধিকতর কঠিন সামরিক কৌশল রপ্ত করাতে মনোযোগী ছিলেন এবং সৈন্যদেরকে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতি যত্নবান করে তোলেন। সেনাবাহিনীকে নতুন করে উচ্চতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করা এবং কমান্ড ও নিয়ম-শৃখলা মেনে চলার প্রতি অভ্যস্ত করে তোলার কাজটি করতেন সেনাবাহিনীতে নিয়োজিত ইমামগণ। তাছাড়া সুলতান মাহমূদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য ছিলো, তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (মালে গনীমত) থেকে কখনো সেনাদের বঞ্চিত করতেন না। পক্ষান্তরে বিজিত এলাকায় সেনাবাহিনীর যথেচ্ছাচার ও লুটপাটও তিনি বরদাশত করতেন না।
তিনি গোয়েন্দা বাহিনী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন রাজধানীতে বসবাসকারী স্থানীয় মুসলমানরা সুলতানের গোয়েন্দাদের সম্ভাব্য সহযোগিতা করতো। অবশ্য এসব মুসলমানদের মধ্যে ঈমান বিক্রেতাও ছিলো। এরা প্রায়ই মুসলমান গোয়েন্দাদের ধরিয়ে দিতো। তদুপরি সুলতানের গোয়েন্দা ব্যবস্থা এতোটুকু মজবুত ছিলো যা দ্বারা তিনি কোনো রাজধানীতে হিন্দু রাজা-মহারাজারা কি করছে, এসব খবর তার কাছে সময় মতোই পৌঁছে যেতো। কিছু সংখ্যক সৈন্যের অনুরোধে রাজা আনন্দ পাল কাশ্মীর থেকে তার রাজধানী লাহোরে ফিরে এলো। সে পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিলো বলে সুলতান মাহমুদের সাথে সন্ধি চুক্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এমনকি আনন্দ পাল এক দূত মারফত সুলতান মাহমূদের কাছে সন্ধি প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলো।
এ ব্যাপারে বিখ্যাত ঐতিহাসিক এবং সুলতান মাহমূদের এসব অভিযানের প্রত্যক্ষদর্শী আলবেরুনী লিখেছেন, রাজা আনন্দ পালের পক্ষ থেকে এমন সময় এক দূত সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলো, যখন সুলতান কাশগড় সীমান্তে আক্রমণকারী এক মুসলিম ক্ষমতালিম্পুর সাথে জীবনপণ যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। সেই যুদ্ধ এতোটাই কঠিন হয়ে পড়েছিল যে, সুলতানের কাছে কখনো বিজয় সুদূরপরাহত মনে হতো। এমন সংকটজনক পরিস্থিতির সংবাদ পৌঁছে গিয়েছিলো আনন্দ পালের কাছে। এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়ার পরও আনন্দ পাল সুলতানের কাছে এই বলে পয়গাম পাঠায়;
“আমি জানতে পেরেছি, তুর্কীরা আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং বিদ্রোহ খোরাসান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আপনি সম্মত হলে আমি পাঁচ হাজার অশ্বারোহী, দশ হাজার পদাতিক এবং একশ’ জঙ্গী হাতি নিয়ে আপনার সহযোগিতার জন্য আসতে প্রস্তুত। তাছাড়া আপনি সম্মতি দিলে আমার পরিবর্তে আমার ছেলেকে এর চেয়েও দিগুণ সৈন্যসহ পাঠাতে প্রস্তুত। আমার এই প্রস্তাবকে আপনি যেভাবেই মূল্যায়ন করুন না কেননা, আমি তাতে দুঃখিত নই। কারণ, আপনি আমাকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আমি চাই না আপনার উপর অন্য কেউ বিজয়ী হোক।”
এ পয়গাম ও প্রস্তাব থেকে অনুমান করা যায়, রাজা আনন্দ পাল সুলতান মাহমূদের সামরিক দক্ষতা ও রণকৌশলের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল ও ভীত ছিলো। সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে পুনর্বার যুদ্ধ করার মতো সাহস আনন্দ পাল হারিয়ে ফেলেছিলো।
অবশ্য সুলতান মাহমূদ শুধু কৌশলি সেনাপতিই ছিলেন না; মেধা ও দূরদর্শিতার ক্ষেত্রে তৎকালীন মুসলিম শাসকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি হিন্দুদের কূট-চরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। সেই সময় তার সামরিক সহযোগিতার খুবই প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু তিনি এক পরাজিত হিন্দু রাজার সহযোগিতা নিতে আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি আনন্দ পালের সামরিক সাহায্যের অন্তরালে এই আশংকাবোধ করছিলেন, আনন্দ পাল হয়তো চাচ্ছে, সুলতান মাহমূদ গযনবী গজনীর মধ্যেই স্বজাতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত থাকুক। তাছাড়া এ আশংকাও উড়িয়ে দেয়ার মতো ছিলো না যে, সাহায্যের নাম করে কঠিন কোন মুহূর্তে সুলতানের পক্ষ তাগ করে আনন্দ পাল সৈন্যবল নিয়ে প্রতিপক্ষে চলে যাবে।
আনন্দ পাল কি ইতিহাস ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একথা জানাতে চায় যে, সুলতান মাহমূদ এক হিন্দু রাজার সহযোগিতায় যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলো।
আনন্দ পালের পয়গাম ও প্রস্তাব নিজ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শুনিয়ে এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন সুলতান। এর মধ্যে যদি অন্য কোন দূরভিসন্ধি নাও থাকে, তবুও এ কথা কিভাবে মেনে নেয়া যায় যে, চরম দু’প্রতিপক্ষের মাঝে এখন মৈত্রী স্থাপিত হয়ে গেছে। যে আমার ধর্মের শুক্র, আমার জাতির শত্রু, তার কোন প্রস্তাবে আমি সম্মত হতে পারি না, তার সহযোগিতার প্রস্তাব গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তিনি আনন্দ পালের দূতকে মৌখিকভাবেই এ বলে জবাব দিলেন যে, তোমার রাজাকে গিয়ে বলবে, “আমাদের সাথে তার কোনো সন্ধি সমঝোতা সম্ভব নয়। আমাদের মধ্যে মৈত্রী স্থাপন অসম্ভব।”
এ জবাবের পরও আনন্দ পাল লাহোরে ফিরে এলো। সন্ধি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আনন্দ পালের সামনে একটাই পথ খোলা ছিলো, চূড়ান্ত যুদ্ধ করে পরিণতিতে পৌঁছা। তখনো আনন্দ পালের সৈন্য সামন্তের ঘাটতি ছিলো না। সে রাজধানীতে পৌঁছেই তার সামরিক কমান্ডার, সেনাপতি ও উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠকে বসলো। বৈঠকে সে জানালো, খুব অত্যল্প সময়ের মধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানতে চায়। সে বললো, এবার সে যেভাবেই হোক লড়াই করে সুলতানের কজা থেকে বেরা ছিনিয়ে আনতে চায়। কথোপকথনে এ কথাও উঠলো, এতো কম সৈন্য নিয়ে সুলতান মাহমূদ কিভাবে জয়লাভ করবে।
