রাজা-মহারাজাদের বৈঠকে কিছুক্ষণ সামরিক কৌশল নিয়ে কথাবার্তা হলো। সকল রাজা-মহারাজাই আনন্দ পালের শূন্যতা অনুভব করছিলো। পণ্ডিত তাদের জানালো, “জানতে পেরেছি সে কাশ্মীরে আছে। তাকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হবে। তোমরা প্রত্যেক রাজ্যে ঘোষণা করে দাও, মুসলমানদের এ দেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য বহুসংখ্যক সৈন্য, অনেক রসদপত্র, বাহন, অস্ত্র, পোশাক ও তাবুর প্রয়োজন। এ জন্যে প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। ধর্ম ও দেব-দেবীদের মর্যাদা রক্ষা তহবিলে প্রত্যেকের উচিত উদার হস্তে দান করা। আর প্রত্যেক যুবককে সোৎসাহে সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্যে আহ্বান জানাও।”
“লাহোরে আমরা দু’বার দু’টি কুমারী বলী দিয়েছি, তবুও অদৃষ্টের চাকা ঘুরলো না। দু’টি নরবলীই ব্যর্থ হয়েছে। মুসলমানরা বিজয়ী হয়েছে আর আমরা হেরেছি। মনে হয় ভগবান আমাদের প্রতি খুব অসন্তুষ্ট।” বললো এক রাজা।
“কবুল না হওয়ার কারণ হলো, এসব কুমারী সতী-সাধ্বী ছিলো না।” বললো স্তম্ভিত রাধাকৃষ্ণ। “আমি পণ্ডিতদের জানি, এরা দীর্ঘদিন এই কুমারীদ্বয়কে হেফাজতের নামে দেবতাদের আমানতের খেয়ানত করেছে। এমন পাপী পণ্ডিতদের হাতে ব্যবহৃত কুমারী বলী দিলে দেবতারা তা গ্রহণ করে না। আমিও এ কথা ভাবছি। দেবতার চরণে এক পবিত্ৰা কুমারী বলী দেয়া দরকার। এ কুমারী তোমাদের কারো নর্তকীর মধ্য থেকে দিতে হবে। নর্তকী হতে হবে যুবতী, সুন্দরী, রূপসী এবং সে হবে মুসলমান। তাকে হতে হবে রাজার খুব ও প্রিয়জন।”
“নর্তকীরা তো আর পবিত্র হয় না মহারাজ। আর আপনি বলছেন তাকে মুসলমানও হতে হবে।” বললো এক রাজা।
“হ্যাঁ, আমি এ জন্যই বলছি, তাকে কোনো পণ্ডিত নিজের কাছে রাখেনি তা তা নিশ্চিত করতে হবে। পণ্ডিতের কাছে রক্ষিতা ন্ম হলে তাকেই আমি পবিত্র মনে করি। আমি সেই নর্তকীকে আমার তত্ত্বাবধানেই মন্দিরে রাখবো। এরপর দেখো, এই কুমারী বলী দেবতারা কবুল করে কিনা। নর্তকীকে আমি বাছাই করবো।”
সারা হিন্দুস্তানের সকল হিন্দু রাজ্যজুড়ে হাটে-মাঠে, অলিতে-গলিতে, মন্দিরে-ভজনালয় সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়লো এ খবর- মুসলমানরা তুফানের মতো মহাভারতের একটির পর একটি দুর্গ জয় করছে। মুসলমানরা পেশোয়ার থেকে মুলতান পর্যন্ত সকল হিন্দু তরুণীদের ধরে নিয়ে সেনাদের যৌন দাসীতে পরিণত করছে। মন্দিরগুলো মুসলমানরা আস্তাবলে পরিণত করছে। যেসব হিন্দু সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছে, এরা কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েছে এবং পঙ্গু হয়ে গেছে। এদের প্রতি দেবতারা অভিশাপ করেছে। যদি সকল হিন্দু রাজা-প্রজা মিলে মুসলমানদের প্রতিরোধ না করে, তাহলে সকল হিন্দু দেবতার অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাবে।
এসব প্রচারণায় সকল হিন্দুর মনে দেব-দেবীর অভিশাপের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। মন্দিরগুলোতে পুরোহিতরা ধর্মালোচনার চেয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষোদগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সকল পূজারী ও হিন্দু নারী-পুরুষের মধ্যে মুসলমানদের সম্পর্কে পচণ্ড ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বেশি আতংক ছড়িয়ে দেয়া হয় নারীদের মাঝে। এর ফল দাঁড়ায়, (ঐতিহাসিক গরদিজী, উতবী এবং আবুল কাসেম ফারিশতার ভাষায়) হিন্দু নারীরা তাদের রক্ষিত গহনাপত্র বিক্রি করে টাকা-পয়সা সরকারী কোষাগারে জমা দিতে থাকে। যেসব নারীর গহনাপত্র ছিলো না, তারা সূতা কেটে উপার্জিত অর্থ রাজকোষে জমা করতে থাকে। অতি দরিদ্র হিন্দু মেয়েরা শ্রম বিক্রি করে অর্জিত অর্থ রাজা-মহারাজাদের সামরিক তহবিলে জমা দিতে থাকে। সারা হিন্দুস্তানের হিন্দুদের মধ্যে এমন এক উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে যে, সবাই অর্থ উপার্জন আর তা সরকারী তহবিলে জমা করার চিন্তায় পেরেশান হয়ে যায়। হিন্দু যুবকরা নিজেদের ঘোড়া সাথে নিয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য উদগ্রীব সময় কাটায়।
এ উন্মাদনা ছিলো মহাভারতের হিন্দুদের মনে। বিষয়টি এমন যে, পাহাড়ী আগ্নেয়গিরি তার ভূগর্ভস্থ লাভা উদগিরণ করতে চাচ্ছে। আর ভেতর থেকে আগুন-পাথর বের করে দিচ্ছিলো তার লেলিহান শিখা। দেখে মনে হচ্ছিলো, এ পাহাড় যদি এখন ভেঙ্গে পড়ে তাহলে তার আগ্নোৎপাতে সারা দুনিয়া জ্বলেপুড়ে ভ হয়ে যাবে।
সুলতান মাহমুদ গজনবী এই মানব অগ্নেয়গিরির পাদদেশেই অবস্থান করছিলেন। তিনি সেসব মুসলমানের বিরুদ্ধে লড়াই করে পুনরায় ফিরে এসেছেন, যারা তার আশা-আকতক্ষা এবং তার বিশ্বাসের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করে। এসব ঈমান বিক্রেতাদের আক্রমণ থেকে গজনী সালতানাতকে রক্ষার জন্য সীমান্ত এলাকায় প্রচুর সংখ্যক সৈন্য যদি প্রহরায় নিয়োগ না করতে হতো, তাহলে এরা ভারত অভিযানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারতো। বেরা ও মুলতান যুদ্ধে সুলতান মাহমূদের বহু সৈন্য নিহত হয়েছিলো। সৈন্য ঘাটতিতে তিনি নতুন সৈন্য ভর্তি করে অনেকাংশে পূর্ণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু ভারত অভিযানের জন্য তা ছিলো অপর্যাপ্ত।
অব্যাহত বিজয়ের পরও সুলতান কখনো নিজের শক্তি-সামর্থের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আস্থায় আত্মশ্লাঘা অনুভব করতেন না। তিনি এমনটিও কখনো ভাবেননি যে, হিন্দু রাজা-মহারাজারা তাকে বিনা প্রতিরোধে ছেড়ে দেবে। সুলতান নিজের সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করার জন্য একটু অবকাশ চাচ্ছিলেন। রাজা আনন্দপালের পক্ষ থেকেই তিনি প্রত্যাঘাতের বেশি আশংকা করছিলেন। ভারতের সকল রাজা-মহারাজা সম্মিলিতভাবে তার বিরুদ্ধে আঘাত হানতে পারে এ চিন্তাও তিনি মাথায় রেখেছিলেন।
