“তোমরা কি আরাম-আয়েশ আর বিলাস-ব্যসনের ফল এখনো পাওনি? না এখনো আরো পাওয়ার বাকি আছে।” নগরকোট মন্দিরের রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসে রাজা-মহারাজাদের উদ্দেশ্যে বললো পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ। তোমাদের এই লজ্জাজনক পরাজয়ের কারণ তোমরা তোমাদের রাজপ্রাসাদগুলোকে স্বর্গে পরিণত করেছে। তোমরা ঘুমোত যাও তো নারী সেবিকারা তোমাদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়। তোমাদের ঘুম থেকে জাগানোর সময় হলে নারী সেবিকারাই তাদের নরম হাতের স্পর্শে তোমাদের ঘুম ভাঙ্গায়। তোমাদের জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, তাও নারী সেবিকারাই সারিয়ে দেয়। নারীর স্পর্শ আর নারীর সহযোগিতা ছাড়া তোমরা এক কদম চলতে পারো না। সেবিকাও তো এমন যারা সুন্দরী-রূপসী। তোমাদের তৃষ্ণা পেলে তো মিষ্টি শরাব দিয়েও তৃষ্ণা মেটাতে পারো।
“আনন্দ পাল বলেই না পরাজিত হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে এই স্নেহোর বাচ্চা আসুক না…।”
‘আনন্দ পাল নয়, ভারতের প্রত্যেক রাজার জন্যই এটি পরাজয়।” গর্জে উঠলো পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ। “বলছ কি? তোমরা কি হিন্দু নও! এই পরাজয় কি তোমাদের মোটেও স্পর্শ করেনি? গজনীর এক মুসলিম যোদ্ধা তোমাদের এক জাতি ভাইকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার অর্থ হলো, গোটা হিন্দু ধর্মের পরাজয়। আনন্দ পালের পরাজয় তোমাদের পরাজয়। আমার পরাজয়। বেরা, মুলতান, লাহোরের মন্দিরগুলো কি তোমাদের বিবেচনায় পবিত্র নয়?”
মুসলমানরা দেব-দেবীর মূর্তিগুলোকে মন্দির থেকে বাইরে ফেলে এগুলোর উপর দিয়ে ঘোড়া দাবড়িয়ে পায়ে পিষে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এগুলোর সাথে কি তোমাদের ধর্মের কোনোই সম্পর্ক নেই। যেখানে শঙ্খধ্বনি বাজতো, যেখানে বাজতো ঘণ্টা, যেখানকার তরুলতা আকাশ-বাতাস মন্দিরের গুণকীর্তন শুনতো, সংস্কৃতি ও ধর্মের শ্লোক ধ্বনিত হতো; সেখানে আজ ধ্বনিত হয় ‘আযান’!”
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের শ্লেষাত্মক কথায় রাজা-মহারাজাদের সমাবেশে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ বলছেন, “ওখানকার মুয়াজ্জিনের আযান এতোটা দূরে বসেও আমার কানে বিদ্ধ হয়। কষ্টে আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। হরেকৃষ্ণ ও হরেরামের পরিবর্তে আমার কানে বাজে আযানের ধ্বনি। আমি এখন মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতে ভয় পাই। দেব-দেবীদের চোখে-মুখে ক্ষোভ দেখছি। আমার মনে হয়, এ মন্দির, এ দুর্গ, এ পাহাড় সবই যেনো ক্ষোভে কাঁপছে। তোমরা কি চাও যে মুসলমানরা এখানে এসে আমাদের এই দেব-দেবীগুলোকেও উড়িয়ে দিক। এ মন্দিরেও ধ্বনিত হোক ওদের আষান।”
“এমনটি হতে দেয়া হবে না মহারাজ!” সমবেত সকল রাজা-মহারাজার কণ্ঠে সমস্বরে উচ্চারিত হলো। “আমরা আমাদের সবকিছু উৎসর্গ করে দেবো। কিন্তু কোনো মুসলমান এদিকে এলে তাকে আর জীবিত ফিরে যেতে দেবো না।”
“ওরা এখান থেকে ফিরে যাওয়ার জন্য আসবে না। ওরা এখানে আসবেই। আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি। আমার দৈবজ্ঞান এ কথাই বলছে। তোমরা তো সুন্দর প্রমোদবালা আর নর্তকীদের নিয়ে আমোদে ডুবে রয়েছে। তোমরা কি লক্ষ্য করছে, মুসলমান বিজয়ীরা কি তোমাদের মতো সুন্দরী ললনাদের সঙ্গে রাখে? তোমরা এই পবিত্র মন্দিরেও ভোগের সকল উপকরণ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে!
বলতে পারো, আমার কেনো ঘুম আসে না। আমি গভীর রাতে গঙ্গামাতার নির্মল পানিতে ডুব দিয়ে ভগবানের কাছে কান্নাকাটি করি কেন? আমার তো কোনো রাজ্য নেই, রাজধানী নেই। কিন্তু তারপরও আমার এতো উদ্বেগ, এতো দুশ্চিন্তা কেনো? তোমরা যদি পরিস্থিতি আমার চোখে দেখো, আমার জ্ঞানে চিন্তা করো, তাহলে সারা মহাভারত তোমাদের নিজের দেশ মনে হবে। মনে রেখো, মাহমুদ গজনবী কোনো দেশ দখলের জন্য লড়ছে না। হিন্দু ধর্মের অস্তিত্ব বিলীন করা আর এখানে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার জন্য তার যুদ্ধ। মুহাম্মদ বিন কাসিমের হাতে ভারতের হিন্দু রাজার পতন ঘটলেও পরে আমাদের বাপ-দাদারা এ দেশ থেকে ইসলামকে বিতাড়িত করেছিলেন। অথচ আজ আবার ইসলাম ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসছে। আর তোমরা এখনো গভীর বিলাস ঘুমে ডুবে আছে।
ধর্মকে না হয় তোমরা ভুলেই গেলে। কিন্তু তোমাদের নিজেদের কথা কি একটু ভেবেছো? তোমরা যদি পরাজিত হও, তোমরা কোথায় যাবে? তোমাদের শবদেহের সৎকার করার কেউ থাকবে? জীবিত থাকলে বাকি জীবনটা মুসলমানদের কারাগারে ধুকে ধুকে মরতে হবে। আর তোমাদের স্ত্রী-কন্যাদের সাথেও সেই আচরণই করা হবে, এসব নর্তকী-বাইজীদের সাথে তোমরা যা করে থাকো ।”
পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের বক্তব্য শুনে রাজা-মহারাজাদের চৈতন্যদয় হলো। তাদের ভ্রান্তি দূর হয়ে যায়। তাৎক্ষণিক তারা ভুলে যায় পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-ভেদাভেদ। তারা চরম উত্তেজনায় সুলতান মাহমূদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকে। তারা সম্মিলিত হিন্দু বাহিনী গঠন করে বেরা ও মুলতানের মাঝে মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা আঁটে।
আবেগ নয়, আকল দিয়ে কাজ করো। সবাই মিলে একক সেনাবাহিনী তৈরি করে মুলতানের দিকে অভিযান শুরু করে। আর মুসলিম সুলতানকে সেখানকার কোনো পাহাড়ের গিরি খাদে আটকে ফেলে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করো । তাকে উন্মুক্ত ময়দানে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পেরেশান করে তোলে। তাহলে বেরা ও মুলতান এমনিতেই তোমাদের দখলে চলে আসবে। তোমরা যদি পেশোয়ারে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হও তাহলে তোমাদের মোকাবেলায় থাকবে মুসলমানদের এক-তৃতীয়াংশ সৈন্য। বেরা ও মুলতান থেকে পাঠানো সাহায্যকারীদের তোমরা পথিমধ্যেই আটকে দিতে পারবে।
