এই বিশ্বাস থেকে রাধাকৃষ্ণ যৌবনে সংসার ত্যাগ করে হিমালয় পাহাড়ের কোলে হিন্দুদের পবিত্র গঙ্গা নদীর উৎসস্থলে চলে গিয়েছিলো । দীর্ঘ পনের বছর রাধাকৃষ্ণ বিজন প্রান্তরে দেব-দেবীর পূজা করে কাটিয়েছে। ততোদিনে তার রিপু তাড়না মরে যায়। তার মনে কোন কামনা-বাসনা আর বাকি থাকেনি। দীর্ঘ সাধনার পর গঙ্গা প্রবাহের পথ ধরে লোকালয়ে এগুতে থাকে রাধাকৃষ্ণ। নগরকোটে পৌঁছে পাহাড়ের উপর এ বিশাল মন্দির দেখে স্থানটি তার কাছে খুবই ভালো লাগে। মন্দিরের সেবায় লেগে যায়। এক পর্যায়ে কঠোর সাধনাবলে নিজেকে উন্নীত করে প্রধান পুরোহিতের মসনদে।
প্রধান পুরোহিত রাধাকৃষ্ণের বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। এতোগুলো বছর পাড়ি দিয়ে এলেও তার চেহারা-শরীরে বয়সের ছাপ পড়েনি। শরীরের শক্ত বাঁধনের ফলে চেহারার কোথাও বলিরেখা দখল পায়নি। নিরামিষভোজী রাধাকৃষ্ণ কোনো জীবজন্তুর গোশত ভুলেও আহার করে না। পূজা-পার্বন আর সেই ভোরবেলায় গঙ্গাজলে স্নান শীত-বর্ষা-হেমন্ত কোনো ঋতুতেই বিন্দুমাত্র ত্রুটি করে না। কঠোর নিয়ম-নীতি মেনে চলার কারণেই নগর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিসেবে সবাই তাকে বরণ করেছে। সাধারণ হিন্দুদের কাছে সে শুধু মন্দিরের পুরোহিতই নয়, এক জ্যান্ত দেবমূর্তিও।
তার হাঁটা-চলা, চাহনী, বলায় রয়েছে দারুণ সম্মোহনী শক্তি। রাজা-মহারাজাদের চেয়েও তার চলন-বলনে রয়েছে ঐশ্বর্যের বহিঃপ্রকাশ। সে গর্বভরে সবাইকে বলতো, দুনিয়ার খেল-তামাশা, আমোদ-প্রমোদ, নারীর স্পর্শ থেকে আমার দেহ-মন পবিত্র। তাই শত বছর পর্যন্ত আমার শরীর এমনই থাকবে। সে গর্ব করে বলতো, যে তার দেহ-মনকে পবিত্র করে নিতে পারে, তার শরীর সবসময় থাকে তরতাজা। জগতের রোগ-শোক জড়া তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
মহাভারতের হিন্দু ধর্মীয় অঙ্গনে সে ছিলো একটা স্তম্ভ। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ রামায়ণ ও মহাভারত ছিলো তার কণ্ঠস্থ। তার ভাষায় ছিলো জাদুকরী ক্ষমতা। মানুষ তাকে বাস্তব অবতার বলে পূজা করতো। ভাবতো, নগরকোট মন্দিরের প্রধান পুরোহিত সনাতন ধর্মের বাস্তব নতুনা। রাজা-মহারাজাদেরকে সে দাপটের সাথে শাসন করতো। যেসব রাজা-মহারাজাকে সাধারণ প্রজারা পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতো, সেসব রাজা-মহারাজা তার পায়ে মাথা ঠুকে প্রণাম জানাতো। তারা এই পণ্ডিতের সান্নিধ্যে এলে নিজেদের ক্ষমতা ও দাপট তার পদমূলে সঁপে দিতো।
নগরকোট মন্দির ছিলো সোনাদানা, মণিমুক্তা, হীরা-জহরতের ভাণ্ডার। সারা ভারতের রাজা-মহারাজারা প্রাণ খুলে নগরকোট মন্দিরে নিয়মিত নজরানা পাঠাতো। মণিমুক্তা, হীরা-জহরত, সোনাদানা পাঠাতে পারাকে তারা সৌভাগ্যের পরিচায়ক ভাবতো। নগরকোট অঞ্চলের সকল কৃষক, জমিদার নিয়মিত মন্দিরে খাজনা দিতো। কারণ, এ অঞ্চলের সব জমির মূল মালিকানার অধিকারী ছিলো না মন্দির। বিশাল এই সম্পদ পুরোহিত রাধাকৃষ্ণ না নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করতে, না সম্পদে কোন পুরোহিতকে হাত দিতে দিতো। এসব সম্পদের ব্যাপারে সে বলতো, এ সম্পদের মালিক ভগবান। ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানেই খরচ হবে এ সম্পদ। মন্দিরের বিশাল আয়ের একটি অংশ প্রধান পুরোহিত রাধাকৃষ্ণ অতি দরিদ্র হিন্দু প্রজাদের মাঝে ব্যয় করতো, আর কিছু বরাদ্দ থাকতো গরীব হিন্দুদের শিক্ষা-দীক্ষায়। বাকি সম্পদের ব্যাপারে তার কথা ছিলো, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্রতা রক্ষায় ব্যয় হবে মন্দিরের সব ধন-রত্ন।
১০০৭ খৃস্টাব্দ মোতাবেক ৩৯৮ হিজরী সনের ঘটনা। সুলতান মাহমুদ বর্তমান আটকাবাদে তৎকালীন লাহোরের প্রতাপশালী রাজা আনন্দ পালকে সম্মুখ সমরে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। লজ্জাজনকভাবে তৃতীয়বারের মতো পরাজিত হয়ে রাজা আনন্দপাল কাশ্মীরের দিকে পালিয়ে যায়। দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাজা আনন্দ পাল আর নিজের রাজধানীতে ফিরে আসেনি। এরপর সুলতান মাহমূদ বেরায় রাজা বিজি রায়কে চরমভাবে পর্যদস্ত করেন। বিজি রায়কে পরাজিত করার পরই মুলতানে হামলা করে হিন্দু ও খৃষ্টানদের ক্রীড়নক কারামতিদের দুর্ভেদ্য দুর্গ চিরতরে ধ্বংস করে দেন। সেই সাথে মুলতানকে গজনী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। বেরার অপর যুদ্ধে আনন্দ পালের ছেলে শুকপাল পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু সুলতানের অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে ধোঁকা দিয়ে পুনরায় ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করায় সুলতান মাহমূদ নিজে গজনী থেকে ফিরে এসে শুকপালের চক্রান্ত ভণ্ডুল করে দিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। ১০০৭ খৃস্টাব্দে মহাভারতের বুকে ইসলামের ঝাণ্ডা নতুন করে উড্ডীন হওয়ার ফলে নগরকোট মন্দিরের প্রধান পুরোহিত পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সুলতান মাহমূদের অপ্রতিরোধ্য অগ্রাভিযান এবং বেরা, পেশোয়ার ও লাহোর যুদ্ধে হিন্দু রাজাদের শোচনীয় পরাজয়বরণের সংবাদ নিয়মিত পাচ্ছিলো। এ কথাও তার অজানা ছিলো না যে, রাজা আনন্দ পাল পরাজিত হওয়ার পর রাজধানীতে না ফিরে কাশ্মীরের দিকে পালিয়ে গেছে। এ সংবাদ শুনে নগরকোটের প্রধান পুরোহিত পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ হিন্দুস্তানের সকল রাজা-মহারাজাকে নগরকোটে ডেকে পাঠায়। পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণের ডাকে উজান, কাশ্মীর, কনৌজ, গোয়ালিয়ার, আজমীরের রাজাসহ সকল রাজা-মহারাজা উপস্থিত হয়।
