দাউদ বিন নসর সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। দাউদের লাপাত্তা হওয়ার সাথে সাথে মুলতানের জমিন থেকে চিরতরে কারামাতী শাসন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হলো। কারামাতী শাসন এখন এক ইতিহাস। সুলতান মাহমূদ মুলতান দখল করে কেরামতীদের স্বর্ণমন্দির ধ্বংস করে দিলেন। ওদিকে ভেতর থেকে দরজা খুলে দেয়ার অভিযানে মুলতানের সেই দরবেশ, আলেম ও তাদের সহকর্মীবৃন্দ জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
মুলতান অভিযান শেষ করে তখনও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারেননি সুলতান। তিনি এর পুনর্গঠন ও মুলতানকে গজনী শাসনাধীনের মজবুত ঘাঁটি তৈরির ব্যাপার নিয়ে ভাবছিলেন। এ মুহূর্তেই হেরাতের গভর্নর আরসালানের কাছ থেকে পয়গাম এলো- কাশগরের রাজা এলিখ খান গজনী আক্রমণ করেছে। খবর শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন সুলতান।
তিনি আবু আলী মঞ্জুরীকে মুলতানের গভর্নর নিযুক্ত করে দ্রুত বেরায় পৌঁছলেন। বেরা এসে জানতে পারলেন, শুকপাল মুসলমান হয়ে গেছে। সে এখন সুলতানের গোলাম ও বৎস হয়েই থাকতে চাচ্ছে। সুলতানের মন তখন গজনীতে। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে গজনী আক্রমণের সংবাদে। তিনি গভীরভাবে অগ্রপশ্চাৎ ভাবার অবকাশ পেলেন না। শুকপালের আনুগত্য ও মুসলমান হওয়ার কারণে তাকে বেরার গভর্নর ঘোষণা করলেন। যদিও তাকে জানানো হলো, হিন্দুরা অবিশ্বস্ত, ওদের উপর এতোটা বিশ্বাস করা ঠিক হবে না কিন্তু কারো কথা শোনার সময় তার ছিল না। ঘোষণা সেরেই তিনি গজনীর পথে পা বাড়ালেন …।
সুলতান মাহমুদের সামনে এখন শকবলিত রাজধানী গজনী। অপরদিকে বেরায় নিজের নিয়োজিত হিন্দুজাদা শুকপাল। যার রক্তে রয়েছে অবিশ্বাস, প্রতারণা ও মিথ্যার মিশ্রণ। সুলতানের অনাবশ্যক পুরস্কার ও উদারতার প্রতিদান কিভাবে শোধ করবে শুকপাল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শ্রান্ত, ক্লান্ত সহযোদ্ধা ও সুলতান কিভাবে উদ্ধার করবেন শক্রকবলিত রাজধানী?
২.৩ নগরকোটের নর্তকী
নগরকোট ছিলো হিন্দুস্তানের এক বিখ্যাত দুর্গ। সেই যুগ ছিল দুর্গ শাসনের। নগরকোট দুর্গের ভগ্নস্তূপ এখনও বিদ্যমান। তৎকালীন হিন্দুস্তানের দুর্গগুলো একটির চেয়ে আরেকটি ছিলো নানা কারণে বৈশিষ্ট্যের দাবীদার। বিখ্যাত নগরকোট দুর্গের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো এর শক্ত কাঠামো, বিশাল বিস্তৃতি। মধ্যে অবস্থিত বিশাল মন্দিরটি ছিলো নগরকোট দুর্গের প্রধান আকর্ষণ। মন্দিরটিই ছিলো দুর্গের ভেতরে আরেক দুর্গসম। মন্দিরের মধ্যে অসংখ্য কক্ষ ছিলো। ভেতরে ঢুকলে অচেনা মানুষ হারিয়ে যেতো। মন্দিরের ভেতরে ছিলো গোপন কক্ষ, সুড়ঙ্গ পথ। নগরকোট মন্দিরের মধ্যে ঘোড়া-হাতি হারিয়ে গেলেও খুঁজে পাওয়া ছিলো দুষ্কর। বিশাল এই মন্দিরের নিরাপত্তার জন্যে এটিকে ঘিরে তৈরি হয় বিশাল দুর্গ। যা তৎকালীন মহাভারতের দুর্গগুলোর মধ্যে ছিলো অন্যতম।
এই দুর্গ ছিলো মহাভারতের বিখ্যাত শহর কাংরার নিকটবর্তী একটি পাহাড়ের উপর। পাহাড়ের উপর থাকার কারণে এটি ছিলো সুরক্ষিত। এই দুর্গে আক্রমণ করতে হলে পাহাড়ের উপর উঠতে হতো। দুর্গে অবস্থানরত নিরাপত্তা রক্ষীরা পাহাড়ের উপর থেকে তীর ছুঁড়ে এবং বড় বড় পাথর গড়িয়ে দিয়ে যে কোনো হামলাকারীকেই পরাস্ত করে দিতো। যার ফলে কারো পক্ষে এই দুর্গ দখল করা ছিলো দুষ্কর।
সুলতান মাহমুদ গজনবী যখন পেশোয়ার, বেড়া ও মুলতান দখল করে নিলেন তখন মহাভারতের হিন্দু রাজা-মহারাজাদের টনক নড়ে। তাদের কাছে মনে হলো, বিজয়ী সুলতান মাহমূদ মূর্তিপূজারী ভারতের বুকে খঞ্জর বিদ্ধ করেছেন। সুরক্ষিত হওয়ার ফলে নগরকোট মন্দিরের গুরুত্ব আরো বেড়ে গেলো । মন্দির যেমন ছিলো গুরুত্বপূর্ণ দ্রুপ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণও ছিলো হিন্দুদের কাছে পূজনীয়। নগরকোট মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাধাকৃষ্ণ কট্টর ব্রাহ্মণ।
রাজা-মহারাজারা শাসন করতো নিম্নবর্ণের হিন্দুদের, আর পুরোহিত রাধাকৃষ্ণ শাসন করতে রাজা-মহারাজাদের। অবতারের মতোই সকল বর্ণের হিন্দু রাধাকৃষ্ণকে সম্মান করতো, তার পায়ে মাথা ঠুকে প্রণাম জানাতে। সাধারণত মন্দিরে যেসব ঘটনা ঘটে থাকে, নগরকোট মন্দিরে সেসব কখনো ঘটতো না। পুরোহিত রাধাকৃষ্ণ নগরকোট মন্দিরে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছিলো যে, সেখানে হিন্দু পূজারীরা পূজা-পার্বন ছাড়া অন্যকিছু ভাবতেও পারতো না। নগরকোট মন্দিরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর পূজারীদের যাতায়াত ছিলো বটে, কিন্তু কোনো নারীর পক্ষে কোনো পণ্ডিতের সংস্পর্শে আসার অনুমতি ছিলো না এবং নারী-পুরুষ একত্রে পূজায় শরীকও হতে পারতো না।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর পূজারী পুরোহিত রাধাকৃষ্ণের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে চাইতো, কিন্তু পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ কোনো নারীকে শরীর স্পর্শ করতে দিতো না। নারী, শিশু, কিশোরী, যুবতী আর বৃদ্ধ যাই হোক না কেননা, কারো পক্ষেই প্রধান পুরোহিত রাধাকৃষ্ণের কাছে যাওয়ার অনুমতি ছিলো না। সে নারী সংস্পর্শ থেকে নিজেকে দূরে রাখাকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বলে বিশ্বাস করতো।
মন্দিরে বড় পুরোহিত রাধাকৃষ্ণের আরো কয়েকজন সহকারী পুরোহিত ছিলো। নারীর সংস্পর্শ থেকে তাদেরকে রাধাকৃষ্ণ দূরে থাকার জন্যে নির্দেশ দিতো। কঠোরভাবে তাদেরকে নারী সঙ্গ থেকে দূরে রাখতো। রাধাকৃষ্ণ মনে করতো, নারীই পৃথিবীতে সকল অনিষ্টের মূল। পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ বিশ্বাস করতো, নারীর মধ্যে এমন জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে, সে জাদু যদি কোনো পুরুষকে পেয়ে বসে তাহলে সেই পুরুষ আর কোনো ভালো কাজ করতে পারে না। সে পাপ ছাড়া ভালো কিছুর কথা ভাবতেও পারে না।
