“আমার সাথে কি ব্যবহার করা হবে।” সুলতানকে জিজ্ঞেস করল রাজকুমার।
“নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ কর। তোমার ক্ষেত্রে আমি হলে তুমি কি সিদ্ধান্ত নিতে। তবে এর আগে এ ব্যাপারটি বুঝে নাও, তোমাদের হাতে গড়া মূর্তিগুলো তোমাদের কোনই সাহায্য করতে পারে না। এসব মিথ্যা দেবদেবী ছেড়ে প্রকৃত সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে মানো, তাঁর ইবাদত কর। এই আল্লাহ আমাকে দুরবস্থার মাঝেও এ নিয়ে তৃতীয় বিজয় দান করেছেন।”
“আপনি আমার ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণ।” বলল শুকপাল।
সুলতান মৌলভী সাঈদুল্লাহকে ডেকে বললেন, “এই যুবককে আপনার কাছে রাখুন। সে কয়েদীও নয়, আযাদও নয়। এখন সে তার ধর্মের প্রতি আস্থাহীন। তাকে খুব যত্ন করুন।”
বিজয়ের তিনদিন পর সুলতান মুলতানের উদ্দেশে রওয়ান হওয়ার ঘোষণা দিলেন। তার সামনে দু’শ মাইলের দীর্ঘ সফর। সুলতান সকল কয়েদীকে পায়ের শিকল মুক্ত করে গলায় বেড়ী পরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। কাফেলা দ্রুত চলার জন্য গরুর গাড়িগুলো যেখানে বালু ও চড়াইয়ে আটকে যেতো কয়েদীদের ঠেলে তুলতে নির্দেশ দিতেন। কাফেলা অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছিলো।
এদিকে মুলতানের কারামাতী শাসক লাহোর ও বাটান্ডার সৈন্যদের রওয়ানা হওয়ার সংবাদের অপেক্ষায় ছিল। যুদ্ধে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হিন্দুদের “নিমক হালাল” করতে বাধ্য হয়েই সে বেরা আক্রমণের জন্যে তৈরি হয়ে সংবাদের অপেক্ষায় ছিল। তার কাছে আর লাহোর বাহিনীর সংবাদ পৌঁছল না।
বেরা থেকে যুদ্ধে যাওয়ার কোন সংবাদ এলো না বটে তবে তার গোয়েন্দারা তাকে খবর দিল, এক বিশাল বাহিনী দ্রুতগতিতে মুলতানের দিকে আসছে। দাউদ খবর পেয়ে দৌড়ে দুর্গের উপরে একটি মিনারে উঠে অগ্রসরমান সৈন্যদের দেখতে লাগল, ততক্ষণে সুলতানের বাহিনীকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। অল্পক্ষণের মধ্যে সুলতানের সৈন্যরা মুলতানের সীমানায় প্রবেশ করল। দাউদ তার বাহিনীকে দুর্গ প্রাচীরে মোকাবেলার জন্য দাঁড় করিয়ে প্রধান গেট বন্ধ করে সেখানকার পাহারা মজবুত করতে নির্দেশ দিল। দেখতে দেখতে সুলতানের বাহিনী মুলতান শহর অবরোধ করে ফেলল।
সুলতানের পক্ষ থেকে দাউদকে কয়েকবার শহর গেট খুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করার প্রস্তাব দেয়া হল। বলা হলো, গেট খুলে না দিলে শহরের প্রতিটি ইট খুলে ফেলা হবে এবং সকল কারামাতাঁকে হত্যা করা হবে।
সুলতান মাহমূদকে বলা হয়েছিল, কারামাতীরা নিবীর্য ও সাহসহীন। এরা পাপাচারে লিপ্ত বিলাসী ও আরামপ্রিয়। কিন্তু শহরে প্রবেশের প্রতিটি আক্রমণ ওরা ভয়ংকরভাবে ব্যর্থ করে দিচ্ছিল। কয়েকটি হামলা এভাবে ব্যর্থ করে দেয়ার পর সুলতানের ভুল ভাঙল।
টানা সাতদিন অবরোধ করে রাখার পরও কারামাতীরা শহরে প্রবেশ রোধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখল। সুলতান বললেন, “এভাবে অবরোধ দীর্ঘায়িত করার সুযোগ নেই। আমাদের হাতে সময়ও নেই। তোমাদেরকে আল্লাহ্ কঠিন মুহূর্তেও বিজয়ী করেছেন এবারও করবেন। প্রাচীর ডিঙাতে এবং ভাঙতে চরম আঘাত হাননা, এরা পাপাচারী। এরা তোমাদের ঠেকিয়ে রাখবে কোন শক্তি দিয়ে!”
সুলতান শহর দুর্গের প্রধান ফটক ও প্রাচীর ভাঙতে গাছ কেটে দুটি হাতির গায়ে বেঁধে হাতি দৌড়িয়ে আঘাত করতে নির্দেশ দিলেন। ঝুলন্ত গাছ নিয়ে হাতি শহর ফটকে আঘাত হানছিল। এভাবে কেটে গেল আরো তিনদিন। হাতি ও মানুষ মিলেও প্রধান গেট ভাঙতে সক্ষম হলো না। দরজার কাছাকাছি গেলেই উপর থেকে কারামাতীদের তীরবৃষ্টি বর্ষণে মুজাহিদরা হতাহত হচ্ছিল। প্রধান ফটকের দিকে কারামাতীদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে অন্যদিকে প্রাচীর ভাঙার চেষ্টা চলছে। শহরের ভেতরে অবরুদ্ধ লোকেরা আতংকিত হয়ে ভয়াবহ চেঁচামেচি শুরু করেছে। আর গেটের বাইরে মুসলিম সৈন্যদের তকবীর ধ্বনি ও হাতি-ঘোড়ার চিৎকারে ভয়াবহ এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। শহরের ভিতরের মুসলিম নাগরিকরা যখন জানতে পারল, গজনীর সুলতানের বাহিনী মুলতান আক্রমণ করেছে তখন তারা ভেতর থেকে প্রধান গেট খুলে ফেলার জন্যে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লে কারামাতীরা তাদের সবাইকে শহীদ করে ফেলে।
চতুর্থ দিন দাউদ বিন নসর ভীত হয়ে বছরে বিশ লাখ দিনার কর দেয়ার অঙ্গীকার করে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠাল সুলতানের কাছে। কিন্তু সুলতান যখন শুনলেন, ভেতরের মুসলমানরা দরজা খোলার চেষ্টা করলে তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়েছে, তখন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি কমান্ড নিজের হাতে নিয়ে আখেরী হামলা চালালেন। মুসলিম যোদ্ধারা মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল গেট ভাঙতে। কয়েক জায়গা ভেঙেও ফেলল। দুরাচারী কারামাতীদের গণহত্যার নির্দেশ দেয়া হলো। সুলতান নিজেই এভো কারামাতী হত্যা করলেন যে, জমাট রক্তে তরবারীর হাতলে তার হাতের মুষ্টি এভাবে আটকে গিয়েছিল, মুষ্টি আর খুলতে পারছিলেন না। দীর্ঘক্ষণ গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখার পর তার হাতের মুষ্টি খোলা সম্ভব হয়েছিল।
কারামাতীরা সেদিন ইতিহাসের শেষ লড়াই করেছিল সুলতান বাহিনীর মোকাবেলায়। সেদিন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ওরা শেষ রক্তবিন্দু ঢেলে দিয়েছিল। কারামাতী নারীরাও অস্তিত্ব রক্ষায় যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, কিন্তু মুসলিম বাহিনীর ক্রোধের মুখে তারা ছিটকে পড়ে গেল। সেদিনের যুদ্ধে কারামাতীদের রক্তের বন্যায় মুলতান শহর ভেসে গিয়েছিল।
