এ সংবাদ জানার পর দু’জন অশ্বারোহীকে সাথে নিয়ে রাতেই সুলতান সহযোগী বাহিনীকে যেখানে থামতে বলেছিলেন সেখানে চলে গেলেন। পেশোয়ারের সহযোগী বাহিনী ও লাহোরের আনন্দ পালের সৈন্যের মাঝে ব্যবধান ছিল মাইল পাঁচেক। তন্মধ্যে ছিল ঝিলাম নদী।
সহযোগী বাহিনীর অধিনায়ককে বুকে নিয়ে সুলতান বললেন, “তোমরা আমার জন্যে আল্লাহর রহমত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তোমরা আজ না পৌঁছলে আমি বুঝতে পারছিলাম না আমাদের অবস্থা কি হতো?”
“ভাই নুমান! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন! তোমার অবস্থান থেকে মাইল পাঁচেক দূরে রাজা আনন্দপালের সৈন্যরা অবস্থান করছে। ওরা রাতের শেষভাগে কিংবা ভোরে শহর অবরোধ কিংবা আক্রমণ করবে। বেলা উঠার আগেই তুমি সৈন্যদের নদী পার করিয়ে ওপারে নিয়ে যাবে। কিন্তু কোন শোরগোল করবে না। দিনের আলোতে গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে আর উঁচু জায়গায় বসে শত্রু সেনাদের পর্যবেক্ষণ করবে। আমি ওদেরকে শহর অবরোধ করার সুযোগ দেব না। একদল পদাতিক সৈন্যকে ওদের দিকে এগিয়ে দেবো, ওরা ওদের মুখোমুখি হয়ে পিছিয়ে আসবে। আর ওরা আমাদের দিকে এগিয়ে আসবে। তোমার সামনে থাকবে এদের একবাহু, ইচ্ছে করলেই তুমি ওদের পিছনে চলে যেতে পারবে। আমি ওদের সম্মুখ দিক ও বাম বাহু সামলাব।”
শুকপাল ও সেনাপতি রাজগোপাল রাত পোহাতে দেয়নি। ফজরের নামায থেকে সালাম ফেরাতেই সুলতানকে খবর দেয়া হলো, শত্রুবাহিনী অগ্রসর হচ্ছে। তাকে আরো বলা হলো, শত্রুবাহিনীর আগমন দেখে মনে হচ্ছে, তারা শহর অবরোধ করবে। শহরের কাছে এসে ওরা অবরোধ বিস্তৃত করছে, আরো ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে সুলতানের পরিকল্পনা বেকার হয়ে গেল। তিনি পদাতিক বাহিনী পাঠিয়ে ওদেরকে এগিয়ে এনে সুবিধামতো জায়গায় অবস্থান নেয়ার সুযোগ পেলেন না।
সুলতান মাহমূদ শহর প্রাচীরে উঠে দেখলেন, শহর থেকে এক মাইলের মতো দূরে–এগিয়ে আসছে শত্রুবাহিনী। তিনি কমান্ডারদের নির্দেশ দিলেন, অশ্বারোহীদেরকে দুভাগে ভাগ করে দুই প্রান্তে আক্রমণ করো। অশ্বারোহীরা প্রস্তুতই ছিল। দ্রুত শহর থেকে অশ্বারোহীরা বেরিয়ে দু’দিকে শত্রুবাহিনীর দুই বাহুর দিকে চলে গেল।
রাজগোপাল সুলতানের বাহিনীকে অগ্রসর দেখে বিদ্যুৎগতিতে তার বাহিনীর বিস্তৃতি রুখে সুলতানের অশ্বারোহীদের ঘেরাও করে ফেলার চেষ্টা করল । সুলতানের অশ্বারোহীরা বিজলীর গতিতে আঘাত করল শত্রবাহিনীর বাহুতে। সুলতান শহর প্রাচীরে দাঁড়িয়ে সবই প্রত্যক্ষ করছিলেন। তিনি দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনীর পিছনে পদাতিক বাহিনীকে পাঠালেন বাম বাহুতে আঘাত হানতে। সুলতানের নির্দেশ মতো উভয় দল পশ্চাদপসরণ শুরু করল। এতে শত্রুবাহিনী পদাতিক বাহিনীর দিকে ঝুঁকে পড়ল। ভেঙে গেল ওদের অবরোধ চেষ্টা। শত্রুবাহিনীর পশ্চাদদেশ এখন নদীর তীরে অপেক্ষমাণ সুলতানের সহযোগী বাহিনীর সামনে।
নুমান ছিলেন অভিজ্ঞ সেনাপতি। অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তারা আক্রমণ চালাল পিছন দিক থেকে। শুক্রবাহিনী আর পালিয়ে যাওয়ার অবকাশ পেল না । ওদের আহত হাতিগুলো তাদের জন্য হয়ে উঠল যমদূত।
বেলা তখন উপরে উঠে গেছে। হিন্দুদের ঢাকঢোল নাকারার আওয়াজ, হাতির চিৎকার আর ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি ও মুসলিম বাহিনীর তকবীরে আকাশ কেঁপে উঠছে। প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। সুলতান মাহমূদ নগর প্রাচীরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার দৃষ্টি ছিল রাজকুমার শুকপালকে বহনকারী হাতির উপর। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, হিন্দুদের পতাকা বহনকারী সওয়ার শহরের দিকে এগিয়ে আসছে। হতাহত হচ্ছে হিন্দুরা। মুসলমানরা ঝটিকা আক্রমণ করে দ্রুত জায়গা বদল করছে। এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে শুকপাল ও হিন্দুদের পতাকাবাহী হাতি সোজা এগিয়ে আসল শহর প্রাচীরের দিকে। সুলতান দেখলেন, হাতির উপরে রাজকীয় আসনে বসা এক যুবক। হাতিটি আহত হয়ে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছিল। শতচেষ্টা করেও মাহুত এটিকে শহরের দিকে আসার গতি ফেরাতে পারেনি। আহত হাতি শহর প্রাচীরের প্রধান গেটে এসে থামতেই এক সাথে কয়েকটি তীর এসে বিদ্ধ হলো হাতির গায়ে। ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল হাতি। মাহুত এক লাফে হাতি থেকে নেমে দৌড়ে পালাল। সুলতান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, “হাতিটিকে ধরে ফেল।”
যুবককে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, সেই হবে আনন্দ পালের ছেলে রাজকুমার শুকপাল। পতাকাবাহী ছাড়া তার সাথে আর কেউ ছিল না। বেসামাল হাতির আর্তচিৎকারে হাতি থেকে নেমে পড়ল শুকপাল। সে শহর প্রাচীরের গায়ে গা ঘেঁষে ভয়ে কাঁপতে লাগল। সুলতান নির্দেশ দিলেন, ওকে ধরে উপরে নিয়ে এসো।”
সুলতান এগিয়ে গেলেন শোকপালের দিকে। হাত ধরে বললেন, “ভয় পেয়ে । তোমার কিছু হবে না। তোমার সাহসের প্রশংসা করতেই হয়। তবে গনী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আসার আগে বাবাকে তোমার জিজ্ঞেস করে আসা উচিত ছিল, গনী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে কত মূল্য দিতে হয়। এখানে দাঁড়িয়ে তোমার সৈন্যদের পরিণতি দেখো।”
শুকপাল দেখলো, তার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে মুসলমানদের হাতে কচুকাটা হচ্ছে। ওদের গর্বের হাতিগুলো সেনাদের পিষে মারছে আর মুসলিম সৈন্যরা তকবীর দিয়ে ময়দানে একক প্রাধান্য বিস্তার করেছে। সেনাপতি রাজগোপালকে কোথাও দেখতে পেল না কপাল। শঙ্কায় কাঁপতে লাগল রাজকুমার।
