“দাউদ সেনাভিযান করবে এমনটা আমি কল্পনাও করতে পারি না।” বলল সেনাপতি রাজগোপাল। “ধন-সম্পদ, তোগ-বিলাস আর মদ-নারীতে আকণ্ঠ ডুবে থেকে সে তো ধর্মকেই ভুলে গেছে, সে কোন দিন যুদ্ধের সাহস করার কথা নয়। গনীর সৈন্যরা যুদ্ধ করে ঈমানের জোরে। দাউদ আমাদের কাছে ঈমান বিক্রি করে ফেলেছে, তার পক্ষে গনী বাহিনীর মোকাবেলা করা অসম্ভব।”
রাজগোপালকে অন্য কক্ষে নিয়ে গেল প্রেমদেবী। প্রেমদেবীর বয়স তখন প্রায় পঁয়ত্রিশ। কিন্তু তার শরীর, সৌন্দর্য তখনও কুমারীর মতো অটুট। সে রাজগোপালের চোখে চোখ রেখে বলল, “রাজগোপাল! ভুলে গেলে, শুকপাল যে তোমারই সন্তান। মহারাজাকে মানুষ শুকপালের বাবা বলে সে আমার স্বামী বলে। রাজরাণী হওয়ার পরও তোমাকেই আমি হৃদয়ের স্বামী বানিয়ে রেখেছি। মহারাজা আনন্দ পাল লাহোরের এ যুদ্ধে তোমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু আমি তাকে বলেছি, রাজধানীতে একজন অভিজ্ঞ সেনাপতি থাকা দরকার। তুমি তার সাথে গেলে নিশ্চয়ই নিহত হতে…। রাজগোপাল! তোমার সন্তানকে সিংহাসনে আসীন করাতে উদ্যোগী হও। আমি চাই, তোমার সন্তান ওকপাল মাহমূদকে কয়েদ করে লাহোরে নিয়ে আসুক। রাজগোপাল! তোমাকে আমার প্রেমের দোহাই দিয়ে বলছি, তুমি অভিযানে আপত্তি করো না।”
সুলতান মাহমূদ জানতেন, পেশোয়ার থেকে সহযোগী বাহিনীর এতো তাড়াতাড়ি পৌঁছা সম্ভব নয়। তবুও তিনি শহর প্রাচীরের উপরে উঠে অধীর উদ্বেগে উত্তর-পশ্চিম দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ধুলো উড়তে দেখলেই সহযোগী বাহিনী এসে গেছে বলে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠত।
* * *
মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসর উপঢৌকন হিসেবে প্রাপ্ত দুই তরুণী নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তরুণীদ্বয় পান পাত্রে ঢেলে দিচ্ছিল সুরা, আর আয়েশী ভঙ্গিতে গলাধঃকরণ করছিল দাউদ। এমতাবস্থায় দাউদকে খবর দেয়া হলো, প্রহরী হত্যাকারী কয়েদীকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পথে প্রহরীদেরকে বহু লোজন আক্রমণ করে আসামী ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। মদে মাতাল দাউদ নির্দেশ দিল, ওরা ঘুষ খেয়ে কয়েদীকে ছেড়ে দিয়েছে। ওদেরকে কয়েদখানায় বন্দী করে রাখে। আর কয়েদীর ঠিকানা তালাশ করে ওর স্ত্রী সন্তান ধরে এনে বশী করো। কিন্তু দরবেশের বাড়ি তালাশ করে সৈন্যরা ওখানে কোন মানুষকেই দেখতে পেল না।
একদিন সকালে উত্তর-পশ্চিম দিকের বদলে উত্তর-পূর্ব দিকে ধুলো উড়তে দেখলেন। সুলতান ধুলো দেখেই বুঝতে পারলেন কোন সেনাবাহিনী এদিকে আসছে। তিনি ভাবলেন, আমার সহযোগী বাহিনী হয়তো এসে পড়েছে। তিনি দৌড়ে শহর প্রাচীর থেকে নেমে এলেন মুলতান রওয়ানা হওয়ার জন্য। তিনি মুলতান পৌঁছাতে অধীর অপেক্ষায় ছিলেন। তার গন্তব্য ছিল মুলতানেরই দিকে। কিন্তু পথিমধ্যে বিজি রায় তার পথরোধ করার কারণে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হলো।
তিনি সেনাপতিদের ডেকে বললেন, “সহযোগী বাহিনী এসে গেছে। অতএব আমরা আগামীকালই রওয়ানা হচ্ছি।” এমন সময় এক অশ্বারোহী গোয়েন্দা খবর নিয়ে এলো, “কোন এক শত্রুবাহিনী আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। বাহিনীতে হাতি ও বহু সংখ্যক অশ্বারোহী ছাড়াও পদাতিক সৈন্য রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে এরা হিন্দু। কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না কোন রাজা বা মহারাজার সৈন্য এরা।”
সুলতান মাহমূদ চিৎকার দিয়ে উঠলেন এই বলে, তোমরা বসো, আমি নিজেই ওদের দেখে আসছি। তিনি দ্রুত একটি ঘোড়ায় চড়ে ঘন জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর একটি উঁচু টিলার উপর দাঁড়িয়ে তিনি অগ্রগামী বাহিনীকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি কয়েকবার জায়গা বদল করে শত্রুবাহিনীর জনবলের আন্দাজ করতে চেষ্টা করলেন এবং তার সাথে আগমনকারীকে বললেন, “আমরা ওদেরকে অবরোধের সুযোগ দেবো না, তাহলে মুলতানের বাহিনী এসে সেই অবরোধকে আরো দীর্ঘায়িত করবে। তুমি জলদী যাও। কৃষক ও মুসাফির বেশে কয়েকজন গোয়েন্দাকে পাঠিয়ে দাও, যাতে তারা এরা কার সৈন্য এবং এদের উদ্দেশ্য কি সে সম্পর্কে নিশ্চিত খবর নিয়ে আসতে পারে।”
শহরে ফিরে এসেই সুলতান নিজের স্বল্প সৈন্যদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছিলেন। এমন সময় তাকে আবার খবর দেয়া হলো উত্তর-পশ্চিম দিকেও ধুলো উড়তে দেখা যাচ্ছে। তিনি দৌড়ে শহর প্রাচীরের উপর উঠলেন। তাকে এ দুশ্চিন্তা পেয়ে বসেছিল যে, এটি কি পেশোয়ারের সহযোগী বাহিনী না রাজা আনন্দ পালের বাহিনী! দুশ্চিন্তায় তার চেহারায় ঘাম দেখা দিল। তিনি একবার উত্তর-পশ্চিম কোণে একবার পূর্ব-উত্তর কোণের উড়ন্ত ধুলোর দিকে তাকাচ্ছিলেন। উত্তর-পশ্চিম কোণে ছিল নদী। তার চিন্তাশক্তি বিদ্যুতের মতো তীব্র গতিতে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করছিল। নদীর দিক থেকে উধ্বশ্বাসে শহরের দিকে ছুটে এলো একজন অশ্বারোহী। কাছে পৌঁছতেই তাকে সুলতানের নিকটে আসার জন্য ইঙ্গিত করা হলো। অশ্বারোহী কাছে পৌঁছে সালাম দিয়ে জানাল, মাননীয় সুলতান! সহযোগী বাহিনী এসে পড়েছে।
সাথে সাথে সুলতান বললেন, “ওদেরকে নদীর তীরেই থামতে বল।” আরো বললেন, “অন্য কাউকে পাঠাও, এ লোকটি ক্লান্ত হয়ে গেছে।”
রাতে সুলতান নিজেও শয্যা গ্রহণ করলেন না, অন্য কাউকেও ঘুমাতে দিলেন না। ইত্যবসরে তার কাছে খবর পৌঁছল, উত্তর-পূর্বের বাহিনী আনন্দ পালের কিন্তু রাজা আনন্দ পাল নেই, তার ছেলে কপাল বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই সংবাদের ঘণ্টা তিনেক পর আবার সংবাদ এলো, লাহোরের বাহিনী শহর থেকে তিন মাইল দূরে থেমে গেছে কিন্তু তারা তাবু ফেলেনি। বোঝা যায়, রাতেই তারা শহর অবরোধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
