“বন্ধুগণ! আমি তোমাদের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা শুরু করিনি।” সকল কমান্ডারকে একত্রিত করে একদিন বললেন সুলতান। “উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি সচেতন। তবে জেনে রেখো এবং মনে সাহস রেখো, আমরা কখনও পালিয়ে যাবো না, পরাজিতও হবে না। আল্লাহ্ সঠিক সময়ে ঠিকই আমাদের সাহায্য করবেন। ইতোমধ্যে আমাদের অধিকাংশ আহত যোদ্ধা সুস্থ হয়ে উঠেছে, দু’ একদিনের মধ্যেই সহযোগী সৈন্যরা এসে পড়বে। ইনশাআল্লাহ, আমাদেরকে অবশ্যই মুলতান অভিযান করতে হবে। এখানে আমরা বসে থাকলে মুলতানের সৈন্যরা আমাদের ঘেরাও করে ফেলবে এবং আনন্দ পাল ও বিজি রায়ের সৈন্যরাও এদের সাথে যোগ দিবে। আর আমরা মুলতানে অভিযান চালালে ওদের পরাজিত করা কোন দুষ্কর ব্যাপার হবে না তা তোমরা জান। কারণ, মুলতানের সৈন্যদের যুদ্ধের কোন অভিজ্ঞতা নেই। মুলতান জয় করে নিলে ওখানকার সৈন্যদের দ্বারা আমাদের উপকার হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। শত পাপাচারী হলেও ওরা মুসলমান তো?”
সকল কয়েদীকে পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন সুলতান। যাতে ওরা চলতে পারে কিন্তু পা তুলে দৌড়াতে না পারে। অপরদিকে বেরার সকল এ মসজিদে আযান এবং বেদখল হওয়া মসজিদগুলোকে আবাদ করার নির্দেশ এ দিলেন আর বললেন, “পুরুষরা মসজিদে এবং মেয়েরা বাড়িতে কুরআন খতম ও ও মুসলমানদের কল্যাণে নফল নামায পড় এবং দু’আ করতে থাক।”
বেরায় সুলতান যখন সহযোগী সৈন্যাগমনের অধীর অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন তখন ৫ লাহোরে চলছে অন্য কাণ্ড। লাহোরের রাজা আনন্দ পাল সুলতানের পথরোধ করতে গিয়ে এমনভাবে পরাজিত হলো, সে রাভী নদী পেরিয়ে কাশ্মীরের পথে পালিয়ে গেল। লাহোরে তার স্থলাভিষিক্ত ছিল রাজকুমার কপাল। শুকপালের অধীনেও বহু সৈন্য রিজার্ভ ছিল। এরা এ পর্যন্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু রাজার সৈন্যরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে বিচ্ছিন্নভাবে দু’জন চারজন করে রাজধানীতে ফিরে এসে পরাজয়ে নিজেদের নিরপরাধ সাব্যস্ত করতে মুসলিম সৈন্যদের সম্পর্কে ভীতিকর বর্ণনা দিচ্ছিল। তাদের কথাবার্তায় মনে হতো, গনী বাহিনীর সৈন্যরা মানুষ নয়, এগুলো জিনের মতো। তাদের কথা শুনে যুদ্ধে না যাওয়া সৈন্যদের মধ্যেও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজকুমার কপাল ও তার মা রাণী প্রেমদেবী এসব সংবাদে চরম উদ্বিগ্ন ছিল। তারা রাজা আনন্দ পালের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল কিন্তু সপ্তাহ চলে যাওয়ার পরও তার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। কেউ বলতেও পারল না কোনদিকে গেছে রাজা।
আনন্দ পালের ছিল তিন স্ত্রী। প্রেমদেবীর পুত্র শুকপাল ছাড়াও তার আরো বৈমাত্রেয় ভাই ছিল। রাজার নিরুদ্দেশে প্রেমদেবীর উদ্বেগ ছিল না, তার দৃষ্টি ছিল রাজার অবর্তমানে পুত্র শুকপালকে সিংহাসনের অধিকারী করা।
একদিন শুকপালের কাছে খবর গেল, বেরা থেকে একটি দল জরুরী বার্তা নিয়ে এসেছে। তাদেরকে তখনি রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে ডেকে নেয়া হলো। এরা ছিল বেরার মন্দিরে লুকিয়ে থাকা সামরিক অফিসার ও পণ্ডিতদের প্রেরিত সংবাদ বাহক। এই সংবাদ বাহকরা বাটান্ডায় আনন্দ পালের দ্বিতীয় রাজধানীতে খবর পৌঁছালে সেখানকার কর্তাব্যক্তিরা তাদেরকে বলল, এখানে সেনাভিযান পরিচালনা করার মতো কর্তৃত্ববান কেউ নেই, আপনারা লাহোর যান। সেখানে রাজার পুত্র শুকপাল রয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। সংবাদ বাহকরা বেরার পরিস্থিতি জানিয়ে তাকে বেরা আক্রমণের প্রস্তাব করল। শুকপাল সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে তার মাকে জানাল। কপালের মা প্রেমদেবী সংবাদ শুনে সাথে সাথেই সেনাপতি রাজ গোপালকে ডেকে পাঠাল।
সেনাপতি রাজ গোপাল বেরা আক্রমণে অস্বীকৃতি জানাল। রাজ গোপাল আত্মপক্ষ সমর্থনে বলল, “যে বাহিনীর পথরোধ করতে গিয়ে রাজা আনন্দ পাল পরাজিত হয়ে হারিয়ে গেছেন, পথে বিপুল জনবল হারানোর পরও যারা অগ্রাভিযান চালিয়ে রাজা বিজি রায়ের মতো প্রতিষ্ঠিত ও সর্বাত্মক প্রস্তুত একটি বাহিনীকে পরাজিত করে রাজধানী দখল করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হলে ওদের চেয়ে তিনগুণ সৈন্য প্রয়োজন। আমাদের ততো সৈন্য নেই। তাছাড়া বেরা পর্যন্ত পৌঁছাতে অন্তত দুটো বড় নদী আমাদের পেরিয়ে যেতে হবে। আমাদের এখন যে সৈন্য রয়েছে এদের মানসিক শক্তিও ভঙ্গুর। রাজকুমার ওকপাল ছেলে মানুষ। এমতাবস্থায় এতো বড় ঝুঁকি না নিয়ে মহারাজা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।”
“মহারাজার অনুপস্থিতির সুযোগটুকুই আমি নিতে চাই সেনাপতি।” বলল রাণী প্রেমদেবী। “বেরায় মাহমূদের মুষ্টিমেয় যে সৈন্য রয়েছে এরা আমাদের বাহিনীর আক্রমণে মোটেও দাঁড়াতে পারবে না। এ অভিযানে আমাদের বাহিনী বিজয়ী হলে এই বিজয় আমার পুত্রের সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তা আমার ছেলের সিংহাসনের অধিকারী হওয়ার সহায়ক হবে। আর যদি পরাজয় ঘটে তবে সেই পরাজয় হবে আমার। কেননা, সেনাবাহিনী কমান্ড থাকবে আমার হাতে। তাতে শুকপালের কোন ক্ষতি হবে না।”
“শুকপাল সাথে থাকবে বটে তবে তাকে রাখতে হবে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝে। তার জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে।” বলল রাজরাণী প্রেমদেবী।
রাজগোপাল! তুমি কি বুঝতে পারছে না, আমাদের আগে যদি দাউদ বেরা দখল করে নেয় আর মাহমূদ ও দাউদ মিলে বেরাকে ইসলামী রাজ্যে পরিণত করে তবে এ অঞ্চলে গনীর দুটো ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। বলাতো যায় না, দাউদ আর যাই হোক মুসলমান তো, সে মাহমুদের সাথে যদি মিত্ৰতা গড়ে তোলে।”
