এসব ভাবনায় আলেমের সময় ক্ষেপণে কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল এক যুবক। বলল, “আমাদের বুযুর্গ সাথী জল্লাদের তরবারীর নীচে মৃত্যুর প্রহর গুনছে, এ কথাটি আপনারা অনুধাবন করছেন না কেন? আমাদের কারো জীবন চলে গেলেও তাতে আপত্তি নেই, তবুও তাঁকে মুক্ত করা একান্ত কর্তব্য।”
আলেম তাকে সান্ত্বনা দিতে বললেন, “দেখো, আমরা দরবেশকে মুক্ত করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে দরবেশকে তখনি জল্লাদের হাতে খুন হতে হবে। জীবন মরণের মালিক আল্লাহ্। আমরা যা কিছু করছি আল্লাহর জন্য করছি। ধৈর্য ধরো, আল্লাহ্ অবশ্যই একটা সুরাহা করবেন।”
হঠাৎ কে যেনো কড়া নাড়ল দরজায়। সবাই সতর্ক হয়ে গেলেন পালানোর জন্য। কারণ, গ্রেফতার ও মুক্তির পর তাদের পদে পদে বিপদাশঙ্কা আরো বেড়ে গিয়েছিল। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দরবেশ সবার ঠিকানা বলে দিতে পারেন এমন আশঙ্কাও তাদের আলোচনায় ছিল।
দু’জন হাতে খঞ্জর নিয়ে পায়ে পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। একজন দরজার শিকল খুলে দিয়ে দরজার আড়ালে চলে গেল। অন্যজন অপর পাল্লার আড়ালে লুকাল নিজেকে। ভেতরে এক লোক প্রবেশ করল। বন্ধ করে দিল দরজা। আগন্তুক তাদেরই একজন।
“এখানে কজন আছে।” জিজ্ঞেস করল আগন্তুক।
“আটজন।” জবাব দিল একজন।
“সবাই বাইরে চলে এসো। দরবেশকে চারজন সৈনিক এদিকে নিয়ে আসছে। আমরা ইচ্ছে করলে দরবেশকে এখন মুক্ত করতে পারি। এখন শহর একেবারে জনশূন্য। কাজটি করার এখনি উপযুক্ত সময়।”
কয়েদখানায় দরবেশের হাড়গুড়ো করে ফেলেছিল অত্যাচার চালিয়ে। তবুও তার মুখ থেকে তার সাথী ও অন্য কারো পরিচয় ও ঠিকানা বের করতে পারেনি জালেমরা। ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত শক্ত চিহ্নিত করতে অন্য পন্থা উদ্ভাবন করল। রাতের দ্বিপ্রহরে দরবেশকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রী-সন্তানকে শাস্তি দিয়ে তাদের কাছ থেকে অন্যদের পাত্তা উদ্ধার করবে। এ উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে চার সিপাহী তাকে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য রওয়ানা হয়েছিল। দরবেশের ঘর ছিল পুরনো হাভেলী থেকে অনেকটা আগে।
আলেম ও তার সাথীদের সবাই হাতে লোহার ডাণ্ড নিয়ে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। রাস্তায় একটু অগ্রসর হওয়ার পরই তারা সিপাহীদের দেখতে পেল। সিপাহীদের দেখেই তারা অন্ধকারে লুকিয়ে গেল। যেই তাদের পাশ দিয়ে দরবেশকে নিয়ে সিপাহীরা যেতে লাগল অমনি অতর্কিতে সবাই সিপাহীদের মাথায় আঘাত করল। উপর্যুপরি আঘাতে ওরা চিৎকার দেয়ার অবকাশও পেল না, জ্ঞান হারিয়ে চার সিপাহী লুটিয়ে পড়ল। দরবেশের হাত-পা বাঁধা ছিল শিকলে। তাকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে সাথীরা সবাই অন্ধকার গলির মধ্যে আড়াল হয়ে গেল। গলিপথ ছিল নীরব নিস্তব্ধ। কেউ এই মহা অপারেশন দেখতে পেল না।
দাউদের দরবার থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়িতে এসেই আলেম এক ব্যক্তিকে বেরায় এ সংবাদ দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যে, মুলতানের শাসক দাউদ বেরা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাকে রাজী করানোর জন্যে হিন্দুরা নারী ও সোনাদানা উপঢৌকন পাঠিয়েছে। অনুরূপ সংবাদ লাহোর ও বাটান্ডাতেও পাঠানো হয়েছে। তিন তরফ থেকেই আক্রমণ আশঙ্কা রয়েছে সুলতানের।
সুলতানের কাছে অবশ্য এ সংবাদ অপ্রত্যাশিত নয়। তিনি এ সংবাদ পাওয়ার আগেই দু’জন হিন্দু সংবাদবাহককে বন্দী করে ষড়যন্ত্রের খবর জানতে পেরেছেন। এরপর মন্দিরে তল্লাশী চালিয়ে বিজি রায়ের বহু সেনা অফিসারকে গ্রেফতার করা হলো। ষড়যন্ত্রকারী পণ্ডিতদেরও আটক করা হলো। সব হিন্দুকে শহরের বাইরে ময়দানে জড় করে মন্দিরের সকল মূর্তি ওদের সামনে রেখে দেয়া হলো। সমবেত সকল হিন্দুর উদ্দেশ্যে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন সুলতান :
“তোমাদেরকে আমি এখানে একত্রিত করে এ বিষয়টি বুঝাতে চাচ্ছি, তোমাদের হাতের তৈরি মাটি ও ইট পাথরর এসব মূর্তির কিছু করার ক্ষমতা নেই। এদের যদি ক্ষমতা থাকে তবে বল, তারা নিজেদেরকে রক্ষা করুক। এদের ধ্বংস প্রত্যক্ষ কর। সব ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদত কর, যে আল্লাহ সবাইকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি আমাদের জীবন মরণের মালিক।
সুলতানের নির্দেশে হিন্দুদের সামনেই সকল মূর্তি গুঁড়িয়ে টুকরো টুকরো করা হলো।
বেরা দখল করেই সুলতান দ্রুত পেশোয়ারে এই বলে দূত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, যত কম সংখ্যকই হোক দ্রুত সৈন্য পাঠাও, রসদের দরকার নেই।”
সেইদিন থেকে সুলতানের প্রতিটি প্রহর কাটতে সাহায্যকারী সৈন্যাগমনের অপেক্ষায়। পথ ছিল দীর্ঘ। তাছাড়া শক্র বেষ্টিত এলাকা দিয়ে অনেক ঘুরো পথে শত্রুদের দৃষ্টি এড়িয়ে সহযোগীদের পৌঁছাতে যথেষ্ট বিলম্ব হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু সমূহ বিপদাশঙ্কায় সহযোগী সৈন্যদলের আগমনের বিলম্ব অস্থির করে তুলেছিল সুলতানের মন। কারণ, দুটি অপ্রত্যাশিত যুদ্ধে সুলতানের অধিকাংশ সৈন্য শহীদ হয়ে গিয়েছিল। সৈন্য ঘাটতি পূরণ করার কোন ব্যবস্থাও ছিল না। অবশ্য বেরায় মুসলমান যথেষ্ট ছিল, কিন্তু হিন্দুরা মুসলমানদেরকে দাসে পরিণত করেছিল। সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের মোটেও নেয়া হতো না। শুধু তাই নয়, তরবারী, অস্ত্র চালনা ও অশ্বারোহণ করা ছিল মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ।
বেরায় সুলতানের অবস্থা হয়েছিল শিকারীদের পাল্লায় আহত বাঘের মতো । নিজের দেশ থেকে অনেক দূরে সুলতান। চতুর্দিকে শত্রু। অবস্থা এমনই করুণ যে, শুধু যে তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে পরাজিত হবেন তাই নয়, জীবনাশঙ্কাও প্রকট হয়ে উঠেছিল তার। অবশিষ্ট সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মনে বিরাজ করছিল চরম হতাশা।
