চকিতে দোভাষীর দিকে ফিরে সুলতান বললেন, “ওইসব পণ্ডিতদের তুমি জিজ্ঞেস কর, ওরা মন্দিরের ভেতরে পালিয়ে আসা হিন্দু সৈনিক, মন্ত্রী ও বড় বড় কর্তাব্যক্তিদের লুকিয়ে রাখেনি তো? ওদের জিজ্ঞেস কর, মন্দিরের ভেতরে বসে পণ্ডিতেরা আমাদের বিজয়কে নস্যাঁত করার জন্যে চক্রান্ত করবে না এমন গ্যারান্টি কি তারা দিতে পারবে?”
“না মহারাজ!” দোভাষীর কথা শুনে হাতজোড় করে বলল বড় পণ্ডিত। “আমরা আপনার গোলাম। মন্দিরে আপনার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র হচ্ছে না।”
“ওরা কোথায়?” ডানে বামে তাকিয়ে বললেন সুলতান। “যাদেরকে লাহোরের পথ থেকে ধরে আনা হয়েছে ওদেরকে এখানে হাজির কর।” একটু পরেই পিঠমোড়া করে হাত বাঁধা দু’জনকে দরবারে হাজির করা হলো।
পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে সুলতান বললেন, “তোমরা কি চেন এদের?” বন্দীদের বললেন, “তোমরা এদেরকে বল কেন তোমাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।”
“এই পণ্ডিতরাই আমাদেরকে লাহোর পাঠিয়েছিল। লাহোরের রাজা আনন্দ পালের পুত্র শুকপালের কাছে পণ্ডিতেরা আমাদেরকে এ সংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছিল যে, বেরা বিজয়ী সুলতান মাহমুদের সৈন্যবল একেবারেই কম। এখনই বেরা আক্রমণ করে বিজি রায়ের পরাজয় ও আনন্দ পালের পলায়নের প্রতিশোধ নিতে তারা শুকপালের বেরা আক্রমণের জন্যে অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এরা আমাদের কাছে বলে দিয়েছিল, বেরায় যে বিপুল পরিমাণ হিন্দু সৈনিক বন্দী হয়েছে, আক্রমণ হলে তারা বিদ্রোহ করে সুলতানের বাহিনীর জন্যে ভয়ংকর হয়ে উঠবে।”
নিজ নিজ অপরাধের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিল দুই কয়েদী।
“সন্দেহজনক অবস্থায় এদেরকে আমার সৈন্যরা পথ থেকে গ্রেফতার করেছে।” বললেন সুলতান। “আমরা এ কথাও জানতে পেরেছি, তোমরা মুলতানে দাউদের কাছেও এ ধরনের খবর পাঠিয়েছ।”
“তোমরা আমার কাছে জীবনের নিরাপত্তা চাইতে এসেছে। হে মূর্তিপূজারীরা! মনে রেখো, তোমরা আমার সৈন্যদের অগ্রাভিযান রুখতে পারবে না। তোমাদের দেব-দেবীদের বলো না, তারা আমার বিজয়কে নস্যাৎ করে দিক। তোমরা যেমন মিথ্যুক, প্রতারক, তোমাদের দেব-দেবী বিশ্বাসও ভিত্তিহীন কাল্পনিক। তোমাদেরকে আমি এতটুকু সুযোগ দিতে পারি, তোমরা তোমাদের মূর্তিগুলো কাঁধে নিয়ে শহর থেকে চলে যাও। অন্যথায় তোমাদের ধর্মীয় বন্দীদের দিয়েই আমি এগুলো গুঁড়িয়ে দেবো। আমি যে সত্য ধর্ম নিয়ে এসেছি তা যদি গ্রহণ কর তবে নিরাপদে সসম্মানে এখানে বসবাস করতে পারবে। তোমরা তো কায়া ও দেহ পূজারী; এসব ত্যাগ করে এখন রূহ ও আত্মাকে সমৃদ্ধ কর, আল্লাহর দেয়া নেয়ামত আত্মাকে খোরাক দাও। এতো দিনতো শুধু দেহের স্বাদ মেটালে এখন আত্মার স্বাদ মেটাও। সম্পদ, অর্থ আর সোনা-দানাতো খুব জমিয়েছে। এসবের মধ্যে সুখ নেই। আল্লাহর রহমতের সুখে সুখী হও। যাও! আমার প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি-না চিন্তা করে দেখো, এরপর আমাকে জবাব দাও।”
পণ্ডিতরা হতাশ হয়ে চলে গেলে সুলতানকে একজন আলেম বলল, “মাননীয় সুলতান! এরা গোড়া হিন্দু। এরা আপনার কাছে ইসলাম গ্রহণ করতে আসেনি, এসেছে আপনাকে ধোকা দিতে। এরা দেহ পূজারী, নিজেদের স্বার্থে এরা ধর্মকে ব্যবহার করছে।”
ব্রাহ্মণরা ইসলামের ঘোর শত্রু। এরা জানে, ইসলামে জাত-পাত নেই, উঁচু-নীচু নেই। সবাই সমান। কিন্তু এরা ধর্মের নামে সমাজে শ্ৰেণীবৈষম্য তৈরি করে রেখেছে। এরা জানে ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের প্রভুত্ব শেষ হয়ে যাবে।”
এই আলেমের নাম হলো সাঈদুল্লাহ। তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের অধিবাসী। সেই সময়ে মুহাম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসূরীদের মধ্যে যে স্বল্পসংখ্যক পরহেযগার লোক এ অঞ্চলে ছিলেন তন্মধ্যে সাঈদুল্লাহ উল্লেখযোগ্য। সুলতান মাহমুদের বেরা বিজয়ের খবর শুনে তিনি তাকে স্বাগত জানাতে হাজির হন। সুলতান মাহমূদ আলেম ও জ্ঞানীদের সম্মান করতেন। তার দরবারে আলেমগণ সব সময়ই কদর পেতেন।
মৌলভী সাঈদুল্লাহ সুলতানকে বললেন, “এ অঞ্চলে মুহাম্মদ বিন কাসিমের একজন অনুসারী দীর্ঘদিন ধরে এমন অভিযানের জন্যে অধীর অপেক্ষা করছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল, কোন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম নেতা যদি এ অঞ্চলে অভিযান চালায় তবে তারা জীবনবাজী রেখে বেঈমান কারামাতী ও হিন্দু-মুশরিকদের পদানত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে, যাতে মুহাম্মদ বিন কাসিমের হৃতগৌরব পুনরুজ্জীবিত করে আবার এ অঞ্চলকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আনা যায়।
মাননীয় সুলতান! হিন্দুরা স্বভাবজাত ধোঁকাবাজ। ব্রাহ্মণরা নিজেদের প্রভুত্ব বজায় রাখতে হেন কোন অপকর্ম ও অপকৌশল নেই যা তারা করতে পারে না। আপনি দেখলেন তো, একদিকে ওরা আপনাকে পরাজিত করতে চক্রান্তের জাল বিছিয়েছে, অপরদিকে আপনার দরবারে এসে আপনার পায়ে লুটিয়ে পড়ে প্রাণভিক্ষা চাইছে। এদেরকে বিশ্বাস করা কঠিন। দৃশ্যত আনুগত্যের ভান করবে কিন্তু অন্তরালে আপনার প্রশাসনকে নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য ইঁদুরের মতো কাটতে থাকবে। এরা ইসলাম গ্রহণ করলেও দুশমনী ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হতে পারবে না। ভেতরে ভেতরে ঘুণের মতো মুসলিম শাসনকে দুর্বল করতে থাকবে। ফোকালা করে দেবে আপনার প্রশাসনকে।”
“আমাদের শক্তির খুঁটি ও শিকড় তো আমাদের জাতি-ভাইয়েরাই কাটছে। ক্ষমতালিন্দু ও দুর্নীতিপরায়ণ মুসলিম শরীফ শ্রেণীই তো আমাদের প্রশাসনকে ফোকলা করে দিচ্ছে। পারস্পরিক ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধ অমিত সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। যে সৈন্যদের কর্তব্য ছিল মুশরিক পৌত্তলিকদের নির্মূল করা, তারা ভ্রাতৃঘাতি লড়াইয়ে নিজেদেরকে ধ্বংস করছে। আপনি দেখুন, এ অঞ্চলের সব মুসলিম রাজ্য ও সৈনিক যদি ঐক্যবদ্ধ হয় তবে এক অভিযানেই সারা ভারত জয় করা সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, রাজধানী থেকে দূর অভিযানে বেরুলে সব সময় আমি উহ্বর্ণ থাকি কখন না খবর আসে, প্রতিবেশী কোন মুসলিম শাসক গনী আক্রমণ করেছে। আমাদের জ্ঞাতি শাসকরা ঈমান আমল নিলাম করে ফেলেছে। রাসূল আকরাম (সা.) যাদের হাতে ইসলাম রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যারা মুসলিম সেনাদের পৃষ্ঠপোষকতা করার কথা তারা নিজেরাই ঈমান বিক্রি করে দিয়েছে। এরা শিক নির্মূল করার পরিবর্তে শিরকের পৃষ্ঠপোষকতা করছে।”
