“মাননীয় সুলতান! আপনাকে আমরা এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারি, দীর্ঘদিন ধরে বৈরী শক্তির মোকাবেলা ও অমুসলিম শাসনাধীনে থেকেও ঈমানকে আমরা বুকে পুষে রেখেছি, আপনি এখান থেকে চলে গেলেও মুসলমানের ঈমান রক্ষার জিহাদ আমরা অব্যাহত রাখবো। ইনশাআল্লাহ্।”
“এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঈমান ব্যাপারী তো মুলতানের ক্ষমতার অধিকারী দাউদ। সে তো রীতিমতো ঈমান বিক্রির মেলা বসিয়েছে।”
“জ্বী হ্যাঁ, আমরা শুনেছি, মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসর ও হিন্দুরা মিলে সাংঘাতিক চক্রান্ত করছে, মুসলমানরা দলে দলে ঈমানহারা হচ্ছে।”
“সেই খৃষ্টানের দেমাগের প্রশংসা করতেই হয়, হতভাগা মুসলমানদের ঈমান হরণের সাংঘাতিক এক ফেরকা তৈরি করেছে। যারা কারামাতী নামে মুসলিম পরিচয় দিয়ে বেঈমানীর বাজার গরম করেছে। দাউদ কারামাতীর ইসলামের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। ধর্ম কর্ম নিয়ে ওর কোন মাথাব্যথা নেই। তার সবচেয়ে বড় চাহিদা ক্ষমতা আর ভোগ-বিলাসিতা।”
* * *
এদিকে আলেম ও তার সাথীদের বন্দী করে ফেলল কারামাতীরা। আলেম দেখলেন, চৌদ্দজন সৈনিকের সাথে মোকাবেলায় প্রবৃত্ত হওয়া মানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এর চেয়ে ওদের অপকর্ম সম্পর্কে দাউদকে বললে হয়তো একটা সুরাহা হবে। তাই তিনি মোকাবেলা না করে স্বেচ্ছায় গ্রেফতারী বরণ করে নিলেন। সাথীরাও তার অনুগামী হলো ।
কারামাতী সৈনিকরা তাদের হাত বেঁধে ফেলল। হিন্দু কাফেলাসহ সবাইকে নিয়ে রওয়ানা হলো মুলতানের উদ্দেশে।
দিনের অপরাহ্নে মুলতানের উপকণ্ঠে পৌঁছে গেল তারা। লোকজন দেখতে পেল চৌদ্দজন সৈনিকের একটি কাফেলা। তাতে তিনজন নারী দু’জন হিন্দু এবং চারজন বন্দী। বন্দীদের হাত বাঁধা। দর্শকরা আশ্চর্য হলো আলেমকে দেখে। কারণ, মুলতানে তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। আলেমের সাথী যুবকরাও অনেকের পরিচিত। কি বিস্ময়! তাদেরকে সৈনিকেরা হাত বেঁধে আনল কোত্থেকে কি অপরাধ করেছে এরা।
যারাই এই কাফেলাকে দেখছিল, আলেমকে বন্দী দেখে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করছিল, “এরা কি করেছে, বন্দী করা হলো কেন?”
“হত্যা! এরা হত্যা করেছে।” বলল এক সৈনিক।
“কাকে হত্যা করেছে।”
“সেনাবাহিনীর লোক হত্যা করেছে।”
“আমরা সৈন্য হত্যা করিনি ডাকাত হত্যা করেছি।” চিৎকার দিয়ে বললেন আলেম।
“আমরা এই মহিলার সম্ভ্রম হরণকারী চার কারামাতাঁকে হত্যা করেছি।” উচ্চ আওয়াজে বলল বন্দী এক যুবক।
“চুপ কর!” ধমকে বলল এক সৈনিক।
“আল্লাহর আওয়াজকে তোমরা শক্তি দিয়ে বন্ধ করতে পারবে না।” চিৎকার দিয়ে বলল অপর বন্দী যুবক।
অবস্থা বেগতিক দেখে সৈনিকরা তাদেরকে পেটাতে শুরু করল। তারাও আর উচ্চবাচ্য করল না।
দাউদকে খবর দেয়া হলো, দরবেশের সাথীদের গ্রেফতার করে আনা হয়েছে। আরো বলা হলো, আমাদের যে চার গোয়েন্দা বেরা যাচ্ছিল দরবেশের সাথীরা তাদেরকে খুন করেছে। সেই সাথে এ খবরও দেয়া হলো, দু’জন পুরুষ ও তিনজন হিন্দুর একটি কাফেলা বেরা থেকে পয়গাম নিয়ে এসেছে।
সবার আগে হিন্দুদেরকে ডেকে পাঠালো দাউদ। হিন্দু বৃদ্ধ দরবারে এসে দাউদকে কুর্নিশ করে দুই তরুণীকে উপঢৌকন হিসেবে পেশ করল। সেই সাথে দাউদের পায়ের কাছে একটি চামড়ার থলে মেলে ধরল। দাউদ একবার তরুণীদের আরেকবার পায়ের কাছে স্থূপীকৃত স্বর্ণমুদ্রা দেখছিল। তরুণীদ্বয় তাদেরকে বরণ করে নিতে মুচকি হাসি ও সলজ্জ আনুগত্য ও অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলল অবয়ব জুড়ে। একে তো এরা সীমাহীন সুন্দরী, তদুপরি কাউকে কাবু করতে এদেরকে দীর্ঘ ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল দক্ষরূপে। কোন্ কাজে কিসের জন্যে তাদেরকে কার কাছে পাঠানো হচ্ছে সে কথা তাদেরকে আগেই বলে দিয়েছিল পণ্ডিতেরা। তাই অল্পক্ষণের মধ্যে দাউদের মনে কামাগ্নি জ্বালিয়ে দিল তরুণী দুটি। ওদের পটলচেরা চাউনী ও মোহনীয় ভঙ্গিতে বেসামাল হয়ে পড়ল দাউদ।
বৃদ্ধ হিন্দু জানাল, “আমি বিজি রায়ের সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ড ইন চীফ ছিলাম। মহারাজার পরাজয়ের পর আমরা মন্দিরে আশ্রয় নিই। পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলে মন্দিরের মধ্যে রাজকোষের অধিকাংশ স্বর্ণ, রৌপ্য লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিভাবে তাদের পরাজয় ঘটল এবং সুলতান মাহমূদের অবস্থা এখন কিরূপ সবই সবিস্তারে জানাল বৃদ্ধ। তার কাছে তাকে কোন উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে তাও ব্যক্ত করল। বলল, লাহোর ও বাটান্ডাতেও পয়গাম পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেও সৈন্য আসবে। তখন আপনার কাজ আরো সহজ হয়ে যাবে। হিন্দু বৃদ্ধ আরও বলল, আপনি যদি শাসন টিকিয়ে রাখতে চান তবে আপনাকে বেরা আক্রমণ করতেই হবে। বেরা আক্রমণ করলে আপনি শুধু শত্রুমুক্ত হবেন না, অঢেল সম্পদও আপনার কজায় আসবে।
খুব গম্ভীরভাবে বৃদ্ধের কথা শুনছিল দাউদ। বৃদ্ধ বলা শেষ করার পরও দাউদের কাছ থেকে সে কোন প্রতিক্রিয়া পেল না। হিন্দু বৃদ্ধ জানতো, যুদ্ধবিগ্রহ কারামাতীদের ধাতে নেই। এই বেঈমান গোষ্ঠী চক্রান্তের ফসল। চক্রান্তই এদের প্রধান হাতিয়ার। ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও ইসলামের মোড়ক এঁটে কুফরী কর্মই এদের টিকে থাকার প্রধান সহায়ক। কেননা, ইসলামের নামে কুফরী মতবাদ প্রচার করে খাঁটি মুসলমানদের ঈমান হারা করতেই খৃস্টান, হিন্দু ও ইহুদীরা এদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে। কারামাতীদের এসব দুর্বলতা ও দাউদের সাহস সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছিল হিন্দু বৃদ্ধের। তাই সে বলল, “মহামান্য মুলতানের অধীশ্বর বাটান্ডা ও লাহোরের সৈনিকদের আপনার সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। আপনি বিলক্ষণ জানেন, আপনার ক্ষমতা আমাদের সহযোগিতায় টিকে রয়েছে। এও জানেন, চারপাশে হিন্দু রাজা মহারাজাদের বেষ্টনীর মধ্যে আপনার অবস্থান। হিন্দুরা যদি আপনার সহযোগিতা
