“জাহাপনা! আমাকে অনুমতি দিন ওর ধৃষ্টতা জীবনের জন্যে খতম করে দেই।” দাউদকে নিশ্চুপ দাঁড়ানো দেখে বলল এক দরবারী। সে আরো বলল, “কারামাতী আদর্শের অপমান আপনাকে নীরবে সহ্য করতে দেখে আমি আশ্চর্য হচ্ছি জাহাপনা!”
“মুলতানে আমার হাজারো শক্ত বেড়ে উঠেছে। আমার আস্তিনের মধ্যে রয়েছে কালসাপ। ওর কাছ থেকে আমাকে জানতে হবে, কে কোথায় রয়েছে। নয়তো একে তো আমি দরবারেই শেষ করে দিতে পারতাম।”
“এর সাথে যারা ছিল তারাও হয়তো ধরা পড়বে।” বলল এক দরবারী।
“উধাও হয়ে যেতে পারে।” বলল দাউদ। এদের চেয়েও আমার দৃষ্টি এখন মাহমূদের দিকে। মাহমূদের গতিবিধি সম্পর্কে বেরা থেকে একটা নিশ্চিত খবর পাওয়া খুব জরুরী। তার এক সেনাপতিকে হাত করে আমরা ফাঁদে ফেলতে পেরেছিলাম, কিন্তু আমাদের সে ধোকা ব্যর্থ হয়ে গেছে। খবর পেয়েছি, আমাদের নীল নক্শা ফাস হওয়ার ফলে সে আত্মহত্যা করেছে। বিজি রায় পরাজিত হয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে। মাহমূদ গনীর হাতে সৈন্য কম বলেও তার মাথায় বুদ্ধি আছে। অথচ হিন্দুস্তানে সৈন্যের অভাব নেই কিন্তু বুদ্ধির ঘাটতি রয়েছে প্রচুর।
সুলতান মাহমূদ বেরা জয় করে বিজয়ের তৃপ্তির চেয়ে প্রকট সৈন্য ঘাটতিতে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। সাম্রাজ্য বিস্তার তার নেশা নয়, ধন-সম্পদ, মণি-মুক্তা অর্জনের লোভও তার নেই। বেরা ছিল হিন্দুস্তানের মূল ভূখণ্ডের প্রথম শহর। বেরায় মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যাও খুব কম ছিল না কিন্তু অধিকাংশ মসজিদ মন্দিরে রূপান্তরিত দেখে তার অন্তর কেঁদে উঠেছিল। তিনি বেরার কোথাও ইসলামের কোন অবিকৃত চিহ্ন দেখতে পেলেন না।
বেরা দখলের পর সর্বপ্রথম পণ্ডিতদের দল সুলতানকে স্বাগত জানাতে আসল। পণ্ডিতরা সুলতানের সামনে এসে দু হাত জোড় করে প্রথমে তাকে নমস্কার জানাল এরপর কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে প্রণাম করল। বিজয়ের পর পেশোয়ারের পণ্ডিতরাও এভাবেই তাকে অভিবাদন জানিয়েছিল। সুলতানকে সিজদা করতে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন; ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললেন, “দাঁড়াও তোমরা! আমি খোদা নই। এভাবে কোন মানুষকে সিজদা করা এবং সিজদা গ্রহণ করা শিক। আমি তোমাদের শহর দখল করেছি বটে কিন্তু শহরের অধিবাসীদের প্রভু হয়ে যাইনি। আমাদের ধর্মে আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করা হারাম। তোমরা আমাকে গুনাহগার করছে। তোমরা কি বলতে চাও, তা বল।”
“জাঁহাপনা! আমরা আপনার কাছে আমাদের জীবন ও মন্দিরের মর্যাদা ভিক্ষা চাচ্ছি।” দুহাত জোড় করে নিবেদন করল পণ্ডিতগণ।
“এখানকার মসজিদগুলোর যে সম্মান তোমরা দিয়েছো, মন্দিরের সে রকম মর্যাদাই কি তোমরা চাও?” পণ্ডিতদের বললেন সুলতান। “তোমরা যেমন এখানকার মুসলমানদের মর্যাদা দিয়েছিলে সে রকম মর্যাদা কি তোমরা চাচ্ছো? তোমাদের রাজমহল থেকে হিন্দু নারীর চেয়ে মুসলমান মেয়েই বেশি উদ্ধার করা হয়েছে। তোমরা যদি ধর্মের খাঁটি অনুসারী হতে তাহলে মেয়েদের এভাবে বেইজ্জতি বরদাশত করতে না। নারীর ইজ্জত সম্ভ্রম লুণ্ঠন করাই কি তোমাদের ধর্ম?”
মহামান্য মহারাজ! আমাদের করার কিছুই ছিল না।” বলল বড় পণ্ডিত। “আমাদের দেশে মহারাজার হুকুম ধর্মের বিধানের মতোই পালনীয়।”
“তবে তোমাদের দেশে ধর্ম মহারাজার গোলাম। আর তোমাদের মতো যারা ধর্মের কাণ্ডারী, ধর্মের পাহারাদার তারা ধর্মকে মহারাজাদের পায়ের নীচে সোপর্দ করেছে।” বললেন সুলতান। পণ্ডিত ও দুভাষীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তার একান্ত এক সেনাধ্যক্ষকে বললেন, “আমাদের ধর্মের বহু শাসক ও আলেমদের মধ্যেও এ ব্যাধি রয়েছে। আমাদের শাসকশ্রেণী, আমীর, শরীফ ও ধর্মীয় পণ্ডিতেরাও নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে ধর্মকে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। শাসকরা নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে নিজেদেরকে ইসলামের খাদেম বলে দাবী করে।”
“মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসরও এই ব্যাধিতে আক্রান্ত।” বললো সেনাধিনায়ক।
সুলতান ও সেনাধিনায়কের মধ্যে কথোপকথন হচ্ছিল ফারসী ভাষায়। বেরার পণ্ডিতেরা ফারসী জানতো না। তাই তাদের পক্ষে সুলতানের কথা বুঝার কোন উপায় ছিল না।
সুলতান দোভাষীর মাধ্যমে বললেন, পণ্ডিতদের বলে দাও, তোমাদের দেবদেবী যদি সত্য হয়ে থাকে তবে তাদের বল তোমাদের জীবন, মান-সম্মান ও ধর্মকে যেন তারা রক্ষা করে। দেব-দেবীদের বললো, তারা নিজেদের রক্ষা করুক। আমি গুনাহগার বলছি, তোমাদের দেবদেবীগুলোকে যদি মন্দির থেকে বাইরে ফেলে দেই, তোমরা দেখতে পাবে, একজন গুনাহগার ব্যক্তির হাত থেকেও এরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না। ওরা আবার মানুষের অপরাধের শাস্তি দিবে কিভাবে
দোভাষী যখন স্থানীয় ভাষায় পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে সুলতানের কথা ব্যক্ত করল, পণ্ডিতদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল।
সুলতান বললেন, “আমি জানি, ধর্মের বরকন্দাজ সেজে মন্দিরগুলোতে তোমরা কতো জঘন্য অপকর্ম কর। তোমাদের ধর্মের মেয়েরাই তোমাদের ইবাদাতখানাগুলোতে সম্প্রম নিয়ে বাঁচতে পারে না। এজন্যই কি তোমরা কাদা-মাটি, ইট-পাথর দিয়ে দেবদেবী বানিয়ে রেখেছে, যাতে ওরা তোমাদের কোন অপকর্মে বাধা দিতে না পারে তোমরা আমার কাছে তোমাদের ইজ্জত, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষার আবেদন নিয়ে না এলেও আমি কোন নারীর ইজ্জত ও কোন নাগরিকের জীবন সম্পদের ক্ষতিসাধন হতে দিতাম না। বেকসুর মানুষের জীবন সম্পদ রক্ষা করা আমার আল্লাহর হুকুম। আমাকে এসব থেকে আল্লাহ্ বিরত রাখেন। আল্লাহর নির্দেশ পালনেই আমি এখানে এসেছি। সব কাজ আমি আল্লাহর বিধান মতো সম্পাদন করার চেষ্টা করি।”
