এক অশ্বারোহী তাদের বিছানাপত্র দেখে চেঁচিয়ে উঠল। এখানে তো অনেক বিছানা। লোক তো দেখা যাচ্ছে কম। নিশ্চয়ই আরৌ লোক এখানে ওয়েছিল, তারা কোথায়?”
“এই মেয়েদের ন্যাংটা করে ফেলল।” নির্দেশ দিল কমান্ডার। “বুড়ো দু’টিকে ঘোড়ার পিছনে বেঁধে টেনে-হেঁচড়ে মুলতান পর্যন্ত নিয়ে যাও। মেয়েদেরকে টিলার আড়ালে নিয়ে চল । দেখবে অল্পের মধ্যে এদের দেমাগ ঠিক হয়ে যাবে।”
মেয়েরা দেখতে পেল দৈত্যের মতো চৌদ্দজন অশ্বারোহী। চার পাঁচজন কমান্ডারের নির্দেশে তাদেরকে ন্যাংটা করতে অগ্রসর হলে মেয়ে দুটো চিৎকার শুরু করল। ততক্ষণ পর্যন্ত হিন্দু বৃদ্ধ ও যুবক আলেম ও তার সাথীদের সম্পর্কে মুখ খুলেনি।
যেই ওরা মেয়েদের কাপড় ধরে টানাটানি শুরু করল তখন আড়াল থেকে আওয়াজ এলো, “সাবধান! মেয়েদের গায়ে হাত তুলবে না, আমাদের গ্রেফতার করতে পার, এদেরকে আমরাই খুন করেছি।”
দৃঢ় পায়ে ওদের সামনে এগিয়ে এলেন আলেম। তিনি মেয়েদের বেইজ্জতি দেখে ওদের সামনে আত্মপ্রকাশ করলেন। সাথীরা তার অনুগামী হলো। আলেম বললেন, “অযথা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করো না। তোমাদের শাসকের কাছে নিয়ে চলো আমাদেরকে। যা বলার সুলতানের দরবারেই বলব সব।”
* * *
মুলতানের রাজদরবার। দাউদের রোষাগ্নিতে পতিত দরবেশ। বিস্ময়কর সেই প্রহরী হত্যার নায়ককে নিজেই জিজ্ঞেস করছিল দাউদ।
“তুমি কিভাবে সুড়ঙ্গ পথে ঢুকলে? প্রহরীকে হত্যা করলে কেন?”
“আমি তোমার এই প্রহরীকে হত্যা করেছি একথা প্রমাণ করতে যে, মৃত কুমারীদের জীবন্ত করে উপস্থিত করা এবং জিনকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা মুলতান শাসকের নেই।” দৃঢ়কণ্ঠে দাউদের জবাব দিল দরবেশ। “এ বিষয়টিও আমি প্রমাণ করতে চেয়েছি যে, এখানে কোন জিন-দানব নেই, কোন ভূত-প্রেতও নেই। কারামাতীদের এই দাবী সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং প্রতারণা।”
প্রচণ্ড আক্রোশে দরবেশের চেহারায় একটা চপেটাঘাত করল দাউদ। বলল, “এতো বড় স্পর্ধা! আমার দরবারে দাঁড়িয়ে আমার কেরামত সম্পর্কে কটুক্তি করছো তুমি! তুমি আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে! জানো! তোমার জীবন-মৃত্যু এখন আমার হাতের মুঠোয়! আমার হাত থেকে তোমাকে এখন কে বাঁচাবে?”
“মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ আমাকে বাঁচাবেন।” দৃঢ়কণ্ঠে বললেন দরবেশ। “দাউদ! ফেরাউন ক্ষমতার দম্ভে খোদা দাবী করেছিল। তার পরিণতির কথা তুমি জান। তোমার পরিণতি ফেরাউনের চেয়েও ভয়ংকর হবে দাউদ! আমি দেখতে পাচ্ছি, তোমার দিন শেষ হয়ে এসেছে, অচিরেই তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।”
আবারো কষে একটা থাপ্পড় মারল দাউদ। ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলল, “আমার পায়ের নীচের একটি পিপড়ার চেয়েও নিকৃষ্ট তুমি। তোমার সাথে তর্ক করতেও আমার ঘৃণা হয়। একথা তোমাকে বলতেই হবে, তোমার সাথে কে কে ছিল এবং বেরায় কোন উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলে?”
“আমি একা। আল্লাহ্ ছাড়া আমার আর আপন কেউ নেই।” বলল দরবেশ। “তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব হলো, আমি বেরা যাচ্ছিলাম ঠিক তবে কেন যাচ্ছিলাম তা কখনও বলবো না।”
“তোমরা মাহমূদ গযনবীকে একথা বলতে যাচ্ছিলে যে, সে যেন মুলতান দখল করে কারামাতী শাসন ধ্বংস করে দেয়।” বললো দাউদ। “তুমি তো আমার কারামাতী দেখলে, তুমি বিজন প্রান্তরে একটা কথা বললে আর এতো দূরে থেকেও আমরা তা জেনে গেছি। তুমি আমার প্রশ্নের জবাব না দিলে পস্তাবে। তোমার হাড়ি থেকে আমরা গোত আলাদা করে ফেলব। একটু পরে তুমি চিৎকার করে আমার কথার জবাব দেবে কিন্তু তখন আর তোমার জবাব আমরা শুনবো না। আজ রাত তোমাকে চিন্তা-ভাবনা করার অবকাশ দেয়া হলো। কয়েদখানায় বসে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর। আগামীকাল তোমাকে জবাব দিতে হবে, তোমার সাথে আর কে কে ছিল। সুড়ঙ্গ পথে তুমি কিভাবে প্রবেশ করেছিলে এবং সুলতান মাহমূদের গোয়েন্দা মূলতানে কতজন আছে এবং এরা কোথায় থাকে।”
“ঠিক আছে, এসব প্রশ্নের জবাব না হয় আগামীকালই শুনবে। কিন্তু আজ শুনে রাখো, ক্ষমতার তখৃত কারো জন্যে স্থায়ী নয়। ক্ষমতার মোহে পড়ে পৃথিবীতে বহু লোক ধ্বংস হয়েছে। তোমার মতো লোকেরা ক্ষমতার মসনদে বসে যখন মাথায় রাজমুকুট পরে তখন আল্লাহর ক্ষমতার কথাটি ভুলে যায়। তোমার মতো শাসকেরাই ক্ষমতায় বসে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়, জুলুম-অত্যাচার চালায়। কিন্তু আল্লাহকে কেউ ধোকা দিতে পারে না। আল্লাহ সব সময় মজলুমদের পক্ষে, জালেমদের বিরুদ্ধে। তুমি মিথ্যা পয়গাম্বরী দাবী করে আল্লাহর সত্যধর্ম ইসলামকে বিকৃত করেছে, স্বাধীন মানুষকে দাসে পরিণত করেছে। ধর্মের আশ্রয়ে নারীদের সম্ভ্রম লুটে নিয়ে তুমি ধর্মকে কলংকিত করেছে। তোমার মিথ্যা প্রকাশ করে দেয়ার জন্যই আমি সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ করে তোমার নিযুক্ত প্রহরীকে খুন করেছি। তুমি মহাপাপী। তোমার পাপ আল্লাহ কখনও ক্ষমা করবেন না।”
গর্জে উঠল দাউদ। “নিয়ে যাও একে! বন্দিশালায় আটকে রাখো।”
কয়েকজন রক্ষী দৌড়ে এসে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে চলল দরবেশকে। দরবেশের ভরাট কণ্ঠের আওয়াজ শোনা গেল, “দাউদ! তোমার মিথ্যা দাবী ও পাপাচারের দিন শেষ। তোমার মসনদের উপরে আমি জহরের বজ্ৰপাত দেখতে পাচ্ছি …! দাউদ, আল্লাহর গজবকে তুমি বন্দী করতে পারবে না। আল্লাহর গজব তোমাকে ধ্বংস করবেই।”
