“পণ্ডিতেরা হিন্দু-মুসলমান বিরোধকে ধর্মের অংশ মনে করছেন। পণ্ডিতেরা হিন্দুদের বলছে, মাহমূদ গযনবীর অবস্থান যদি বেরায় মজবুত হয়ে পড়ে তবে শুধু যে আমরা রাজ্যহারা হলাম তাই নয়, গোটা ভারত থেকে হিন্দুত্ববাদ বিলীন হয়ে যাবে। মুহাম্মদ বিন কাসিমের মতো সারা ভারতে সুলতান মাহমূদও ইসলাম ছড়িয়ে দেবে। তাই মুসলমানদের অগ্রগতি রোধ করা প্রত্যেক হিন্দুর ধর্মীয় কর্তব্য। ধর্মের জন্য প্রত্যেক হিন্দু নারী-পুরুষের জীবন বাজী রাখতে হবে। মুসলমানদেরকে হত্যা করা আজ হিন্দুদের প্রধান পুণ্যের কাজ। আপনি মুসলমান, আপনার কাছে হয়তো আমার কথা পীড়াদায়ক মনে হবে, কিন্তু আমি আপনাকে সত্য বলার অঙ্গীকার করেছি, এজন্য প্রকৃত সত্যই বলে দিলাম। এখন আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের হত্যাও করতে পারেন, ইচ্ছা করলে ছেড়ে দিতে পারেন।”
এই হিন্দু বৃদ্ধ ও যুবক কোন সামরিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোক ছিল না, ছিল গোড়া হিন্দু ধর্মের ভাবাবেগে সোনা গহনা ও তরুণী দু’টিকে সাথে নিয়ে রাস্তার বিপদাপদের কথা না ভেবেই ধর্মীয় মিশনে বেরিয়ে পড়েছিল। সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হলে এতো সহজে এরা ভড়কে যেতো না এবং ভীত-বিহ্বল হয়ে কঠিন সত্যগুলো এত সহজে প্রকাশ করত না। আলেম ওদেরকে অভয় দিলেন, বললেন, “তোমাদের ভয় নেই, আমরা তোমাদের উপর কোন জুলুম করবো না।” আলেম আরো বললেন, “তোমরা এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারো, আমার লোকেরা তোমাদের পাহারা দেবে।”
এদের কাছে একজন সাথীকে প্রহরায় নিযুক্ত করে অপর দুজনকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে আলেম পরামর্শে বসলেন। দীর্ঘ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন, এদেরকে মুলতানের পথে ছেড়ে দিবেন এবং তারা দ্রুত বেরায় পৌঁছে সুলতানকে জানাবেন মুলতানের অবস্থা। একথাও বলবেন, সুলতান যেন মন্দিরে লুকিয়ে থাকা হিন্দু সৈনিক ও দুষ্কৃতকারী পণ্ডিতদের গ্রেফতার করেন আর বিজি রায়ের ছেলে ও দাউদের আক্রমণ সম্পর্কে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
দরবেশকে অপহরণকারী কারামাতীরা মাঝ রাতে রওয়ানা হয়ে তীব্রগতিতে পথ চলে দিনের শেষ ভাগেই মুলতান পৌঁছে গিয়েছিল। এরা দরবেশকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় দাউদের সামনে ফেলে দিয়ে বললো, “হুজুর! এই সেই চার-কুমারী দুর্গের ঘাতক। এই লোকটিই সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশ করে প্রহরীকে হত্যা করেছে।” তারা কিভাবে দরবেশের কাছ থেকে রহস্য জেনেছে এবং তাকে অপহরণ করেছে। সবিস্তারে সব জানাল।
দাউদ বিন নসরকে যখন একথা জানাল যে, দরবেশের সাথে আরো চার ব্যক্তি ছিল এবং তারা বেরার পথে রয়েছে। তখন দাউদ রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গর্জে উঠল, “ওদেরকেও ধরে নিয়ে আসলে না কেন?”
কমান্ডার শুধু একে নিয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছিল। কমান্ডার এই খুনীর সাথীদের সাথেই বেরা যাচ্ছে।
এ খবর শুনে দাউদ দশ বারোজন চৌকস সৈনিককে শক্তিশালী ঘোড়া নিয়ে দ্রুত দরবেশের অপর সাথীদেরকেও ধরে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল। নির্দেশ পেয়েই তারা রওয়ানা হয়ে গেল দরবেশকে অপহরণকারী দুই সৈনিককে সাথে নিয়ে। এরা দ্রুতগামী ঘোড়া নিয়ে চোখের পলকে শহর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাতের দ্বিপ্রহর। আলেম ও তার দুই সাথী একজনকে পাহারায় নিযুক্ত করে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ অনেকগুলো অশ্বখুরের আওয়াজ শোনা গেল। দ্রুতই শব্দটা এগিয়ে এলো তাঁবুর দিকে। পাহারাদার তার সাথী ও হিন্দুদেরকেও জাগিয়ে দিল। আলেম জেগেই আঁচ করলেন বিপদাশঙ্কা। তিনি দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে মেয়েদেরকে টিলার আড়ালে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
অল্পক্ষণের মধ্যে মশালবাহী কয়েকজন অশ্বারোহী এদিকটায় কি যেন খুঁজতে লাগল। যেখানে কারামাতীদের লাশ পড়েছিল মশালের আলোয় নজরে পড়ল ওদের। কাছে গিয়ে ওরা ওদের চেহারা পরখ করে এদিক সেদিক তাকাল। অনতিদূরেই ছিল ওদের উট ও ঘোড়াগুলো বাঁধা। উট ও ঘোড়া দেখে ওদের বুঝতে বাকী রইল না অবশ্যই ধারে কাছে মানুষ রয়েছে। এদের সাথে আরো এসে যোগ হলো আট দশজন অশ্বারোহী। সবাই সমস্বরে হুশিয়ার ধ্বনি দিতে শুরু করল কাউকে না দেখে। চিৎকার করে বললো, যারাই এখানে আছে বেরিয়ে এসো। না হয় কাউকেই জীবিত রাখা হবে না।
কয়েকবার এমন হুমকি দেয়ার পরও যখন কোন সাড়া পেল না তখন খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিল। টিলার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল সবাই। প্রথমেই তাদের নজরে পড়ল মেয়ে দু’টি। মেয়ে দুটিকে তারা ধরে ফেললো। বয়স্ক হিন্দু দুজনও বেরিয়ে আসলো আড়াল থেকে। অশ্বারোহীরা বলল, আমরা মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসরের লোক তোমাদের এগিয়ে নিতে এসেছি। কিন্তু দরবেশকে অপহরণকারী দুই কারামাতী বলল, “আমরা যাদের খোঁজে এসেছি, এরা সেই লোক ওদের সাথে কোন নারী ছিল না।”
“এদেরকে কান্না হত্যা করেছে।” কারামাতীদের লাশের দিকে হিন্দুদেরকে জিজ্ঞেস করল এক অশ্বারোহী।
“আমরা জানি না।” বলল বৃদ্ধ হিন্দু। “আমরা বেরা থেকে এসেছি। দাউদ বিন নসরের জন্য একটি পয়গাম নিয়ে মুলতান যাচ্ছিলাম, আমরা এখানে তাবু খাটানোর আগে থেকেই লাশগুলো পড়েছিল।”
“মিথ্যা বলছে তোমরা।” হুমকির স্বরে বলল দলনেতা। “কি পয়গাম নিয়ে মুলতান যাচ্ছে তোমরা?”
“আমাদের মুলতান যেতে দাও, বলার তা তোমাদের শাসক দাউদকেই বলব, আর কাউকে বলা যাবে না।” বলল বৃদ্ধা।
