“তাহলে তো আপনারা অবশ্যই কারামাতী। আমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী।”
“না, আমরা কারামাতীদের দুশমন। তুমি আমাদের সাথে নির্ভয়ে কথা বলতে পার, আমরা তোমাদের নিরাপত্তার ওয়াদা করেছি। তোমাদের কোন ক্ষতি করবো না, ক্ষতি করতেও কাউকে দেবো না।” বললেন আলেম।
আলেমের কথা শুনে ম্লান হয়ে গেল হিন্দু বৃদ্ধের চেহারা। আলেম লক্ষ্য করলেন, বয়স্কা মহিলাকে এই লোকটি নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু দেখে মনে হয় না এরা স্বামী-স্ত্রী। ইতোমধ্যে ঝর্ণা থেকে রক্তমাখা শরীর পরিষ্কার করে হিন্দু যুবকের সাথে ফিরে এসেছে দু’ যুবতী। আলেম গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলেন ওদের। যুবকটির চেহারা ও অবয়বের সাথে তরুণীদের কোন মিল নেই। তরুণী দু’টির রাজকুমারীর মতো অবয়ব। গায়ের রঙও ওদের ফর্সা আর ওদের কথিত মা নিকষ কালো। মা মেয়ে এবং ভাই বোন ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেমন না আছে বয়সের সামঞ্জস্য, না আছে ওদের চেহারার আদল অভিব্যক্তির মিল। বস্তুত বয়স্কা মহিলাটিকে ওদের সেবিকা বলেই মনে হয়। আর যুবকটি ওদের কোন হুকুম বরদার।
“এই মৃত বদমাশগুলো তোমাদের পালিয়ে যেতে দিয়েছিল, আমরা তোমাদের যেতে দেবো না। এদের মতো আমরা তোমাদেরকেও হত্যা করব। আর মেয়ে দুটিকেও নিয়ে যাবো। এই মহিলাকে রেখে যাবো এখানেই। যেন কোন হিংস্র জানোয়ার ওকে খেয়ে ফেলে। যদি আমাদের মিথ্যা বলো, তোমাদের এই পরিণতিই বরণ করতে হবে । আর যদি সত্য কথা বলে, তাহলে তোমাদের সসম্মানে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া হবে। এই মেয়ে দুটি তোমার কন্যা নয়, আর এই যুবক ওদের ভাই নয়, এই মহিলাও ওদের মা নয়। ঠিক নয় কি? আমরা তোমাদের জীবন বাঁচিয়েছি, তোমাদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার ওয়াদা করেছি অথচ তোমরা আমাদের সাথে মিথ্যা পরিচয় দিচ্ছে। তোমরা কি বলোনি, কারামাতীরা তোমাদের সুহৃদ?”
আলেমের কথায় পার হয়ে গেল হিন্দু বৃদ্ধের চেহারা। সে বলল, হ্যাঁ, বলেছিলাম। ওদেরকে এ কথা বলার কারণেই ওরা আমাদের ছেড়ে দিয়েছিল।
“দেখো, রাজা-বাদশাহ-যুদ্ধ-ক্ষমতা এসবের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা ব্যবসায়ী, ব্যবসা আমাদের পেশা। তোমরা সঠিক পরিচয় দিলে আমরা আমাদের কৃত অঙ্গীকার পালন করবো।”
আপনারা আমাদের জীবন রক্ষা করেছেন। আমাদের বখশিশ পর্যন্ত নেননি। আমাদের মুখে সত্য কথা শুনে যদি আপনারা খুশি হন তবে মনে করব আপনাদের কিছুটা হলেও কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পেরেছি। তাহলে শুনুন, আমি এদের পিতা নই, ওই বয়স্কা মহিলাও এদের মা নয়। আসলে এই তরুণী দু’জনের সেবিকা সে। যুবকটি এদের সেবক।
“সত্য ঘটনা বলো। অবশ্যই বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে তোমরা মুলতান যাচ্ছিলে?” জিজ্ঞেস করলেন আলেম।
“আপনার ধারণা ঠিক। আমরা মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসরের কাছে এ পয়গাম নিয়ে যাচ্ছিলাম যে, সুলতান মাহমুদের কাছে এখন সৈন্যসংখ্যা খুবই কম। দাউদ যদি এ মুহূর্তে বেরা আক্রমণ করে তাহলে সুলতান মাহমূদ বেরা কজায় রাখতে ব্যর্থ হবে। কারণ, দাউদ যদি বেরা ঘেরাও করে তাহলে বেরাতে যে তিন হাজার হিন্দু সৈনিক বন্দী রয়েছে এবং মন্দিরগুলোতে যেসব হিন্দু যোদ্ধা লুকিয়ে রয়েছে এবং যেসব হিন্দু নাগরিক সুলতানের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার সুযোগে নিজের বাড়িঘরে রয়েছে সবাই একসাথে বিদ্রোহ করে সুলতানের মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়বে। অভ্যন্তরীণ ও বহিঃআক্রমণের মুখে মুষ্টিমেয় সৈন্য দিয়ে কিছুই করতে পারবে না সুলতান। সুলতানকে পরাজিত করার এ এক মোক্ষম সুযোগ। আমরা এ সংবাদ নিয়েই মুলতান যাচ্ছিলাম।”
“তোমাদেরকে কে পাঠিয়েছে।”
“পরাজয়ের পর বিজি রায়ের সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছে। আমি বিজি রায়ের সরকারের মন্ত্রী ছিলাম। অন্যান্যের মতো আমিও মন্দিরে আত্মগোপন করেছিলাম। মন্দিরেই আমরা গোপনে সলাপরামর্শ করে ঠিক করি, এ মুহূর্তে যে করেই হোক দাউদ বিন নসরকে বেরা আক্রমণে রাজি করানো জরুরী। সবাই মিলে আমাকেই এ কাজে প্রতিনিধিত্ব করতে সাব্যস্ত করলেন। দাউদের জন্য উপহার হিসেবে সোনা গহনা, মুদ্রা ছাড়াও দেয়া হলো এই মেয়ে দু’টিকে। এরা রাজমহলের প্রশিক্ষিত রক্ষিতা। নারী, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি আজন্ম লিন্স দাউদের। ওর এ চরিত্রের কথা ভালভাবে জানে হিন্দুরা। তাই দাউদের সাথে তারা অর্থ ও নারীর ভাষায়ই কথা বলে। এই মেয়ে দুটি বিজি রায়ের পরাজয়ের পর মন্দিরেই আত্মগোপন করেছিল। তাদেরকে বহু বলে কয়ে বুঝানো হলো যে, তাদেরকে দাউদের কাছে একটি মিশনে পাঠানো হচ্ছে। তারা নিজেদেরকে বিলিয়ে দিয়ে যে ভাবেই হোক দাউদকে যেন বেরা আক্রমণে রাজী করায়। হৃতরাজ্য উদ্ধার ও ধর্মের খাতিরে মেয়েরাও রাজী হয়।
আপনি যেসব সোনা গহনা দেখেছেন, এগুলো ছাড়াও আমাদের কাছে আরো মণিমুক্তা রয়েছে। এগুলো ডাকাতরা খুঁজে পায়নি। আপনাকে আমি অনুরোধ করছি, আমাদের কাছ থেকে কিছু সম্পদ আপনারা রেখে দিন। আপনারা আমাদের জীবন রক্ষা করেছেন।” বলল হিন্দু বৃদ্ধ।
“আলেম বৃদ্ধকে ধমকের সুরে বললেন, তোমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছি, সোনা গহনা টাকার কথা আমার সামনে আর বলবে না। এসবের প্রতি আমাদের লোভ নেই। রাজ্য রাজা আর যুদ্ধের যে কাহিনী বলছে, তাতেও আমাদের কিছু যায় আসে না। আমাদের কাছে বড় বিষয় হলো, তোমাদেরকে নিরাপদে মুলতান পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকার পালন করা। তোমাদের রাজার পরাজয় ও আত্মহত্যার পরও কি তোমাদের নেতৃস্থানীয় লোকেরা পরাজয় মেনে নিতে পারেনি। বৃদ্ধের অন্তরের আরো গভীর থেকে সত্য বের করার জন্যে কৌশলের আশ্রয় নিলেন আলেম।
