আলেম সাথীদের বললেন, “কেউ আবেগপ্রবণ হয়ে তাড়াহুড়ো করো না। আগে ওদের অবস্থা পরখ করে নাও, তারপর সুযোগ মতো আঘাত হানো। ওদের দেখে মনে হয় প্রশিক্ষিত সৈনিক।”
আলেম ও সাথীরা ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন কারামাতীদের তাঁবুর দিকে। ওদের ভাবুটি ছিল একটা টিলার ঢালে। আলেম টিলার পাশ ঘেঁষে পিছন দিক থেকে দেখে নিলেন ওদের অবস্থা। মশাল জ্বলছে, কারামাতী চার পাষণ্ড দুর্বাঘাসের উপর বসে মদ গিলছে আর অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ছে। তরুণী দু’জন সম্পূর্ণ নিরাবরণ। মদের সুরাহী ওদের হাতে। যেই ওদের পানপাত্র খালি হয়ে যাচ্ছে মেয়ে দুটো আবার ঢেলে দিচ্ছে। কারামাতীরা মদে অভ্যস্ত। এই মদ ও পানপাত্র ওদের সাথেই ছিল কিন্তু নিজেদের মুসলমান বুঝতে এরা গতদিন মদ বের করেনি।
দীর্ঘক্ষণ আলেম ও সাথীরা কারামাতী হায়েনাদের অপকর্ম দেখলেন। যুবতী দুটোকে নিয়ে এরা কাবাবের মতো টানাটানি করছে। একজন ছেড়ে দিচ্ছে তো আরেকজন আবার কোলে টেনে নিচ্ছে। সেই তালে চলছে সুরাপান। এক পর্যায়ে কারামাতী কমান্ডার উঠে দাঁড়িয়ে গেল। বেশি মদ পানের কারণে ওর পা দুটো টলছিল। দাঁড়িয়ে নিজের কাপড় খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল কমান্ডার। আর একটি মেয়েকে পাল্লায় নিয়ে ঘাসের উপর শুইয়ে দিয়ে হামলে পড়ল তার উপর। আলেম সাথীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আঘাত হানে।”
সাথীরা সবাই এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কারামাতীরা ছিল মদে চুরচুর। আঘাত প্রতিরোধের কোন সুযোগ পেল না কেউ। আলেমের তরবারীর প্রথম আঘাতেই কমান্ডারের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। যে তরুণীকে নিয়ে কারামাতী কমান্ডার আদিমতায় মেতে উঠেছিল সে একটা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। কারামাতীর রক্তে স্নাত হয়ে গিয়েছিল মেয়েটি। আলেমের সাথীরা অন্য তিন নরপশুরও ইহলীলা সাঙ্গ করে দিল।
বেহুশ তরুণীর চোখে মুখে পানির ঝটকা দেয়া হলে সে জ্ঞান ফিরে পেল। উভয় তরুণীকে বলা হলো কাপড় পরে নিতে। ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা নির্বাক হয়ে পড়েছিল। ওরা ভেবেছিল, চার নরপশুর পাঞ্জা থেকে তারা আরেক দল পাষণ্ডের কজায় পড়েছে। কিন্তু তাদের ধারণা পাল্টাতে বেশি সময় লাগল না। অল্প সময়েই তারা বুঝতে পারল, এরা হায়েনারূপী মানুষ নয়, ঘোর এ দুঃসময়ে তাদের জন্যে রহমতের দূত।
আলেম দু’ হিন্দু পুরুষকে বললেন, “তোমরা তোমাদের ছিনিয়ে নেয়া মালপত্র মুদ্রা ও অলংকারাদি ওদের আসবাব থেকে বের করে নাও। প্রয়োজনে ওদের উট ঘোড়াসহ সবকিছুই তোমরা নিয়ে যেতে পার।”
হিন্দুরা কারামাতীদের দেহ ও গাঠুরী তল্লাশী করে তাদের সোনা গহনা ও মুদ্রা উদ্ধার করল । আলেম হিন্দু বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, “এতো স্বর্ণমুদ্রা ও অলংকার নিয়ে প্রহরী ও সওয়ারী ছাড়া এ পথে পা বাড়ালে কেন?”
হিন্দু বৃদ্ধ জানাল, “মুসলমান বিজয়ীরা বেরা থেকে কোন হিন্দুকেই বাইরে যেতে এবং ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। তাই আমাদের লুকিয়ে ছাপিয়ে আসতে হয়েছে। কোন সওয়ারী সংগ্রহ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।”
“এখন তোমরা আমাদের হেফাযতে থাকবে। তোমরা ইচ্ছা করলে আমাদের সাথে বেরায়ও ফিরে যেতে পার, আর চাইলে আমরা তোমাদেরকে মুলতান পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারি।” বললেন আলেম।
বৃদ্ধ হিন্দু কিছু স্বর্ণমুদ্রা ও অলংকার আলেমের সামনে রেখে বলল, “এখন যেহেতু আমরা উট ও ঘোড়া পেয়ে গেছি, মুলতান যেতে আর অসুবিধা হবে না। আপনারা আমাদের প্রাণ রক্ষা করেছেন। মেহেরবানী করে এই নজরানা কবুল করলে কৃতজ্ঞ হবো।”
“হু, তোমরা কি আমাদেরকে ভাড়াটে খুনী ভেবেছোয় ক্ষুব্ধকণ্ঠে গর্জে উঠলেন আলেম। “সম্পদের লিলা থাকলে তরবারীর আঘাতে তোমাদের সবকিছু আমরা ছিনিয়ে নিতে পারতাম। এসব রাখো। আজ রাত আমাদের এখানে আরাম করো। তরুণীদের ঝর্ণায় নিয়ে গা ধুইয়ে আনন। জানোয়ারটার রক্তে ওদের শরীর মেখে গেছে।”
আলেম ও সাথীদের এই সৌজন্য ব্যবহার ছিল হিন্দুদের কাছে অকল্পনীয়। আলেম একথা বলার পর যুবকটি তরুণী দুটিকে ঝর্ণায় নিয়ে গেল রক্ত মাখা শরীর পরিষ্কার করাতে।
আলেম হিন্দু বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, “বেরার অবস্থা কি?” বৃদ্ধ বলল, বেরার অবস্থা খুবই শোচনীয়। বেরার বাইরে হিন্দু ও মুসলমান সৈন্যদের প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধে উভয় বাহিনীর অর্ধেকের বেশি সৈন্য মারা গেছে। রাজা বিজি রায় আত্মহত্যা করেছেন।” বৃদ্ধ আরো বলল, “মুসলমান সৈন্যসংখ্যা এখন এতো কম যে যদি কোন বহিঃশত্রু আক্রমণ করে বসে তাহলে সুলতান মাহমূদ বেরাকে রক্ষা করতে পারবেন না।”
“কার পক্ষ থেকে আক্রমণ আশঙ্কা রয়েছে।”
“আক্রমণ করলে রাজা আনন্দ পাল করতে পারেন। শুনেছি, পেশোয়ারের কাছে আনন্দ পাল সুলতান মাহমূদের অগ্রাভিযান রুখে দেয়ার জন্যে পথ রোধ করেছিলেন। কিন্তু সুলতানের বাহিনী নদী পেরিয়ে আনন্দ পালের সৈন্যদেরকে এভাবে ঘিরে ফেলে যে বহু কষ্টে জীবন নিয়ে পালিয়ে গেছেন আনন্দ পাল। এখন রাজধানীতে রাজা আনন্দ পালের ছেলে ওকপাল রয়েছে। ইচ্ছে করলে সে বেরা আক্রমণ করতে পারে।”
“আচ্ছা! আপনারা কোত্থেকে এসেছেন?” আলেমকে জিজ্ঞেস করল হিন্দু বৃদ্ধ।
“মুলতান থেকে এসেছি আমরা। আমরা মুলতানের অধিবাসী।”
