তিন যুবকের কেউই আলেমকে ফেলে বাড়ি ফিরে যেতে রাজী হলো না। পক্ষান্তরে তারা আলেমকে তাদের দলনেতা স্বীকৃতি দিয়ে বললো, “আপনি আমাদের যে কোন নির্দেশ দিবেন, আমরা জীবন বাজী রেখে তা পালনে অঙ্গীকার করছি।”
ইতিহাসের এ এক নির্মম বাস্তবতা। যাদের রক্তের বিনিময় ও ত্যাগে রচিত হয় ইতিহাস, যাদের কুরবানীর বিনিময়ে সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর যতো রাজা-বাদশাহ-বিজয়ীর কীর্তিগাথা, তাদের অধিকাংশই রয়ে গেছে অজ্ঞাত। কেননা, ইতিহাস যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ীর নামোল্লেখ করে, যে সব অজ্ঞাত লোক নিজেদের পরিচয় আড়াল করে বিজয়ের ভিত রচনা করতে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে ইতিহাস তাদের জানে না।
তখন সূর্য ডুবে গেছে। কারামাতী কমান্ডার রাত যাপনের জন্যে যাত্রাবিরতি দিতে অনুরোধ করল। জায়গাটি ছিল সবুজ শ্যামল, তাজা ঘাসের প্রাচুর্য ছিল সেখানে। অসংখ্য ঝোঁপঝাড় উঁচু নীচু টিলায় ভরা। কারামাতী কমান্ডার আলেমের উদ্দেশ্যে বলল, “একটি সুবিধা মতো জায়গা দেখুন, আমিও দেখছি।” আলেম সাথীদের নিয়ে আরো সামনে অগ্রসর হলেন। একটি মরু প্রস্রবণের পাশে তিনি তাবু খাটাতে বললেন সাথীদের। জায়গাটিতে পানি ও ঘাস রয়েছে। পশুগুলোর খাবার ও নিজেদের বিশ্রাম উভয়টা একই সাথে সারা যাবে।
কারামাতীরা পিছনে রয়ে গেল। আলেম ভাবলেন, ওরা হয়তো এদিক সেদিক দেখে এ জায়গাটিকেই পছন্দ করবেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কারামাতীরা এলো না। আলেম ওদের আসার ব্যাপারে ভাবলেশহীন। ওরা ভিন্ন রাত কাটাক, তাতে কিছু যায় আসে না।
আলেম লক্ষ্য করলেন, “তাদের অদূরেই একটি তাবু খাটানো । সেখানে এক হিন্দু বৃদ্ধ এবং এক যুবক দাঁড়ানো। সাথে একজন বয়স্কা মহিলা এবং দুজন তরুণী। তরুণী দুজন দেখতে রাজকুমারীর মতো। তাদের তাঁবুর সামনে একটি মশাল জ্বলছে।
আলেমও তাদের তাঁবুর সামনে একটি মশাল জ্বালিয়ে এর হাতল মাটিতে পুঁতে দিয়ে সবাইকে নিয়ে শুয়ে পড়লেন। ক্লান্তির আবেশে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল অল্প সময়ের মধ্যেই।
মাঝরাতে নারী ও পুরুষের আর্তচিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল সবার। আলেম ও সাথীরা সবাই উঠে তরবারী হাতে নিলেন বিপদাশঙ্কায়। জ্বলন্ত মশালের আলোয় দেখতে পেলেন, তাদের দিকে এগিয়ে আসছে পাশের তাবুর বৃদ্ধ হিন্দু ও বয়স্কা মহিলা। কিন্তু তাদের সাথের দু’ যুবতাঁকে দেখা গেল না।
আলেম ও সাথীরা তরবারী উঁচিয়ে ওদের দিকে অগ্রসর হলে ওরা পাশ ফিরে দৌড়াতে উদ্যত হলো। আলেমের সাথীরা সমস্বরে ওদের হুঁশিয়ার করে বললো, “পালাতে চাইলে নির্ঘাত মরতে হবে, জীবন বাঁচাতে চাইলে দাঁড়াও।”
মৃত্যুভয়ে ওরা দাঁড়িয়ে গেল। আলেম ও সাথীরা তাদের কাছে গেলে জীবন ভিক্ষা চাইল তারা। আর ভয়ে কাঁপতে লাগল। অনেক কষ্টে আলেম তাদের বুঝলেন, “আমরা তোমাদের হত্যা নয়, সাহায্য করতে চাই। বলল, তোমরা পালাচ্ছিলে কেন?”
“তোমাদের সাথীরা আমাদের সবকিছু নিয়ে গেছে। আমাদের সাথে থলে ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা ছিল, অনেক দামী গহনা ছিল, সবই ওরা নিয়ে গেছে। তোমাদের সাথীরা মেয়ে দুটিকেও নিয়ে গেছে।” ভয়ার্তকণ্ঠে বলল বৃদ্ধ।
“মেয়ে দুজন তোমার কি হয়?”
“ওরা আমার মেয়ে। এ আমার ছেলে, আর এ আমার স্ত্রী। আমরা বেরা থেকে পালিয়ে এসেছি। বেরা মুসলমানরা দখল করে নিয়েছে। আমরা হিন্দু।”
“গনীর মুসলমানরা কি তোমাদের ঘরবাড়ি লুটপাট করেছে। শহরে গণহত্যা চালিয়েছে তোমাদের মেয়েদের নির্যাতন করেছে?”
“না-না, তা নয়।” বলল বৃদ্ধ। “বিজয়ী সুলতান তো নির্দেশ দিয়েছেন, কোন হিন্দুর ঘরে কেউ যাবে না, কোন নারীকে কেউ লাঞ্ছিত করো না। সকল নাগরিকের মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধানের নির্দেশ দিয়েছে সুলতান। কিন্তু আমার এই মেয়ে দুটো খুব সুন্দরী। বলাতো যায় না, বিজয়ী সৈন্যরা আবার আমার মেয়েদের লাঞ্ছিত করে কি-না। এই আশঙ্কায় আমি তাদের নিয়ে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, বেরাতেই আমরা নিরাপদ ছিলাম।
হুজুর! দয়া করে আপনার সাথীদের কাছ থেকে আমার মেয়ে দুটিকে উদ্ধার করে দিন। ওরা ওদের মেরে ফেলবে। আমার অনেক সোনাদানা ওরা নিয়ে গেছে, সব আপনারা নিয়ে নিন তবুও আমাদেরকে এদের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমার সাথে যা আছে তাও আপনাদের দিয়ে দেবো। তবুও আপনারা আমার মেয়ে দুটির প্রতি একটু দয়া করুন।”
বৃদ্ধ হিন্দুর কথা শুনে আলেম বুঝতে পারলেন কারামাতীরাই এই অপকর্মের হোতা। কারণ, কারামাতীদের কাছে জীবন মানে ভোগ আর সম্ভোগ। ওরা বেঁচেই থাকে পাপকর্মের জন্য। সুন্দরী মেয়ে দুটিকে দেখে ওরা আর লোভ সামলাতে পারেনি। ওদের কাছে নারীভোগ পাপ নয়, পুরুষের অধিকার।
“তোমাদের কাছে কি অস্ত্র নেই?” হিন্দুদের জিজ্ঞেস করলেন আলেম।
“মালপত্রের সাথেই ছিল আমাদের তরবারী। ওরা আমাদের উপর এভাবে হামলে পড়ল যে, আমরা তরবারী হাতে নেয়ার সুযোগ পেলাম না। ওরা আমাদের মারপিট করে সব ছিনিয়ে নিয়েছে। নিরুপায় হয়ে আমরা এখন বেরার দিকে ফিরে যাচ্ছিলাম, এ সময় আপনারা আমাদের দাঁড়াতে বললেন।”
আলেম তার তিন সাথীকে বললেন, “এই হিন্দুকে আমাদের এ কথা বুঝতে হবে যে, মুসলমানদের কাছে নারীর ইজ্জত ধর্ম বর্ণের উর্বের বিষয়। মুসলমান যে কোন ধর্মের নারীর ইজ্জত রক্ষার্থে জীবন বাজী রাখতে কুণ্ঠাবোধ করে না। নারীর মর্যাদা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানী কর্তব্য। আজ আমাদের একথা প্রমাণের সময় এসেছে যে, মুসলমানরা কর্তব্য পালনে কতটুকু নিষ্ঠাবান। আমাদের চোখের সামনে দুটি অসহায় নারীর ইজ্জত লুষ্ঠিত হবে আর আমরা নিশ্চুপ বসে থাকবো তা হতে পারে না। আশা করি তোমরা এদের ইজ্জত রক্ষায় জীবন বাজী রাখতে পিছপা হবে না। আমি তোমাদের সাথে আছি। এসো এক সাথে পাষণ্ডদের রুখে দাঁড়াই, আল্লাহ্ আমাদের মদদ করবেন।”
