“আমরা ডাকাত হলে এখন আমাদের কাউকে তুমি এখানে দেখতে না। আর তোমরাও জীবিত থাকতে না। সবাই লাশ হয়ে থাকতে।” বললেন আলেম। “দেখো! তোমাদের দু’লোক নিরুদ্দেশ। আমার তো মনে হয়, তোমাদের ওই লোকেরা চুরি করার জন্যে মালপত্র বাধছিল, তা দেখে ফেলেছিল দরবেশ। ওদের অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাবে মনে করে ওরা দরবেশকে হত্যা করে নদীতে ফেলে পালিয়ে গেছে। ওরা জোয়ান দুজন, আর দরবেশ বুড়ো একা।”
তাদের লোক কোথায় গেছে, তা কারামাতীদের জানা। তাই কারামাতী কমান্ডার মনে করল, এরাও যদি দরবেশের গোপন মিশনের সহযোগী হয়ে থাকে, তবে এদের বেশি ঘাটানো ঠিক হবে না। এদের কাছ থেকে আরো তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনায় কারামাতী কমান্ডার আলেম ও তার সাথীদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে এ বিষয়ে আর উচ্চবাচ্য করল না। বস্তুত তাদের উদ্বেগের কোন কারণও ছিল না। কমান্ডার নিজেই তো দরবেশকে অপহরণের ব্যবস্থা করেছে।
পুনরায় উভয় কাফেলা বেরার দিকে রওয়ানা হলো। কারামাতীরা আগে আর আলেম ও সাথীরা ওদের পিছনে।
“এদের গতিবিধি আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। সাথীদের ক্ষীণ আওয়াজে বললেন আলেম।” সকাল থেকে এদেরকে আমি গভীরভাবে দেখছি, আমার কাছে এদেরকে ব্যবসায়ী মনে হয়নি। এরা ব্যবসায়ী নয় অন্য কোন পেশার লোক। দরবেশ গতরাতে আবেগপ্রবণ হয়ে সুড়ঙ্গ পথে প্রবেশের ঘটনা বলে দিয়েছিল। আমার মনে হয়, এরা দাউদের লোক। গোয়েন্দা। এরাই দরবেশকে অপহরণ করে মুলতান নিয়ে গেছে। এরা বেরা যাচ্ছে, সুলতান মাহমূদের গতিবিধি ও তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানার জন্যে।”
“আমাদের সচেতন থাকা দরকার।” বলল এক সাথী। “ওরা যেন বুঝতে পারে, দরবেশের সাথে আমাদের গভীর কোন সম্পর্ক ছিল।”
“এরা যদি সত্যিই গোয়েন্দা হয়ে থাকে, তবে এদেরকে আমি বেরায় ধরিয়ে দেবো। এখন থেকে এদের সাথে আমরা আরো আন্তরিক ভাব দেখাবো।”
“এ বিষয়টা তো পরিষ্কার বোঝা গেছে, এরা আমাদের নবী দাউদ বিন নসর ও কারামাতী ধর্মাদর্শের ঘোরতর বিরোধী। এখন থেকে ওদের সাথে আমরা গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ ভাব দেখাবো। আমাদের জানতে হবে এদের প্রকৃত পরিচয় এবং এদের মূল উদ্দেশ্য।” সাথীদের বলল কারামাতী কমান্ডার।
সূর্য যখন মাথার উপর, তখন কারামাতী কমান্ডার সওয়ারীগুলোকে ঘাস পানি খাওয়ানো এবং নিজেদের বিশ্রাম ও আহারের জন্য কাফেলা থামিয়ে দিল। আহার পর্বে কারামাতী কমান্ডার আলেমকে জিজ্ঞেস করল–
“দরবেশের সাথে আপনার সম্পর্ক কতো দিন ধরে?”
আলেম বললেন, “আমি শুধু এতটুকু জানতাম, মুলতানে সে ব্যবসা করে। কোথায় কি ব্যবসা তা জানি না। আমরা যখন বেরা রওয়ানা হলাম, তখন সে আমাদের সাথে এসে মিলিত হয়েছে।”
“ঐ লোকটি চার-কুমারী দুর্গে একটি লোক হত্যা করেছে, তা কি আপনারা জানতেন?”
“খুনের কথা জানতে পারলে আমরা তাকে সাথেই রাখতাম না।” বললেন আলেম। “সে যদি ধর্মীয় ভাবাবেগে খুন করে থাকে তাও ঠিক করেনি। নরহত্যা মহাপাপ। হত্যাকাণ্ড আল্লাহও ক্ষমা করেন না।”
গুপ্তচর নেতা বহু চেষ্টা করেও আলেমের কাছ থেকে নতুন কোন তথ্য উঘাটন করতে পারল না। কারামাতীরাও আলেম কাফেলার সাথে একথাই প্রকাশ করছিল যে, তারা কারামাতী নয় নিষ্ঠাবান মুসলমান।
রাজা, মহারাজা কোন সুলতানের শাসনের বাইরে বিজন মরু প্রান্তরে দুটি ছোট কাফেলা একই কাফেলায় লীন হয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু দৃশ্যত একটি কাফেলা হলেও এদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বিস্তর ব্যবধান। একদল আরেক দলের প্রাণঘাতি শক্র। এরা পারস্পরিক শক্রতায় লিপ্ত এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চিন্তায় বিভোর। হক ও বাতিলের অদৃশ্য সংঘাতে তারা অহর্নিশ চিন্তামগ্ন। আলেম সন্দেহাতীতভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, এরা ব্যবসায়ী নয় কারামাতী। আলেম ছিলেন বয়স্ক প্রবীণ। তার তিন সাথী অবশ্য যুবক। কিন্তু কারামাতীদের সবাই শক্তিশালী। আলেম ভাবছিলেন, এরা যদি প্রশিক্ষিত সৈনিক হয়ে থাকে, তবে তার তিন সাথী কি এদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারবে?
মনে মনে আল্লাহর উপর ভরসা করে অগ্রসর হচ্ছিলেন আলেম। আল্লাহই সকল বিপদে মদদগার। কোন মানুষ মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে না যদি আল্লাহর রহমত না থাকে। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত করে ফেলেছেন, এরা যদি তার সাথে বেরা পর্যন্ত যায় তবে এদেরকে তিনি ধরিয়ে দিবেন। তবে বুযুর্গ দরবেশকে নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন তিনি। তাকে যদি কারামাতীরা হত্যার দায়ে দাউদের কাছে ধরে নিয়ে যায় তবে বৃদ্ধ লোকটি অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মুলতানে আমাদের সবার ঠিকানা বলে দিতে পারে। তাহলে তাদের স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়দের দাউদের বাহিনী চরম লাঞ্ছিত করবে ও অত্যাচার চালাবে।
ইসলামী ইতিহাসে কষ্ট ও ত্যাগের কথা মনে হলো তার। কতো কঠিন নির্যাতন, নিপীড়ন সহ্য করেছেন সাহাবায়ে কেরাম। এ মুহূর্তে ইসলামের জন্যে তাদেরও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কুরবানী এখন সময়ের দাবী। সাথীদের উদ্দেশ্যে বললেন
“প্রিয় সাথীরা! আজ আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তা খুবই কঠিন। ইসলামের জন্যে আমাদের ত্যাগ ও কুরবানী স্বীকারের সময় এসেছে। আশা করি আল্লাহর রাস্তায় যে কোন ত্যাগ স্বীকারে তোমরা পিছপা হবে না। মনে রেখো, যে মুসলমান ত্যাগ স্বীকার না করে কষ্ট দেখে পালিয়ে যায়, ইতিহাস থেকে তাদের নাম চিহ্ন হারিয়ে যায়। হতে পারে আমাদের এই অভিযানের কারণে তোমাদের প্রত্যেকের পরিবারে অবর্ণনীয় অত্যাচার নেমে আসবে। সব জুলুম-অত্যাচার দৃঢ়তা ও সাহসের সাথে সহ্য করতে হবে। তোমরা যদি কষ্ট দুর্ভোগ ও নির্যাতনের মোকাবেলায় অটল থাকতে না পার তবে এখনই বাড়িতে ফিরে যেতে পার। তবে মনে রাখবে, যে মুসলমান ঈমানের পরীক্ষায় পালিয়ে যায়, ইতিহাস থেকে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।”
