“যে দিক থেকে আপনারা চার-কুমারী এবং ধোয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখলেন সেদিক থেকে কোন লাশ বের হতে দেখেননি” কারামাতী কমান্ডারের কথায় আবেগ তাড়িত হয়ে রহস্য প্রকাশ করে দিলেন দরবেশ।
“লাশ! কার লাশ?” বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল কারামাতী কমান্ডার।
“দাউদের একজন বিশ্বস্ত প্রহরীর লাশ। চার কুমারী আর জিনের ভোজভাজি আমি দুর্গের ভেতরে গিয়ে দেখে এসেছি।” বললেন দরবেশ।
“বলেন কি? আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদেরকে এই রহস্যের কথা খুলে বলুন তো! আমরা তো ভাবতেই পারিনি, কোন বাতিল গোষ্ঠীর মধ্যে এমন অলৌকিক ক্ষমতা থাকতে পারে। আমরা তো তার কারামাতী দেখে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে মুরীদ হওয়ার চিন্তা করেছিলাম। আর আপনি বলছেন, ভোজভাজি! ভাই মেহেরবানী করে আমাদের সন্দেহমুক্ত করুন। এতেও আপনার সওয়াব হবে!”
কারামাতী কমান্ডারের চাতুর্যপূর্ণ কথায় আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন দরবেশ। তিনি ওদেরকে সুন্নী মুসলমান মনে করে তার গোপন অভিযানের কথা সবিস্তারে বলে দিলেন। বললেন, কিভাবে তিনি ভেতরে প্রবেশ করে গোপন কক্ষে চার কুমারীকে দেখলেন এবং দাউদ ও সহযোগীদেরকে তরুণী বেষ্টিত অবস্থায় মদ পানরত অবস্থায় পেলেন। তাও বললেন, একজনকে হত্যা করে কিভাবে তিনি গোপন সুড়ঙ্গ পথ ডিঙিয়ে বেরিয়ে এলেন।
কারামাতী কমান্ডার ও সাথীরা অভাবিত এই সফল অভিযানের জন্যে দরবেশকে বাহবা ও ধন্যবাদ দিল। এ কৃতিত্বের জন্য দরবেশের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাকে খুবই উজ্জীবিত করতে লাগল। ওরা তো দরবেশের কথা শুনে হতবাক। বলে কি বুড়ো! যে হত্যাকারে কিনারা করতে না পেরে দাউদ মহলের অভ্যন্তরীণ সকল নিরাপত্তারক্ষীকেই কঠিন শাস্তি দিচ্ছে, ওরা ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বলতে পারছে না কে ঘটিয়েছে হত্যাকাণ্ড। আর এই বুড়ো কি সেই হত্যার নায়ক! মনে মনে মহা খুশি হল তারা, অভাবিতভাবে হাতের নাগালে অপ্রত্যাশিত শিকার। আর পালাবে কোথায়? শিকার এখন তাদের হাতের নাগালে। ভেতরের মনোভাব প্রকাশ করল না কারামাতীরা।
রাতের আহারপর্ব সেরে সবাই বিছানা পেতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারামাতী কমান্ডার দরবেশের প্রতি দারুণ ভক্তি দেখাচ্ছে। তার প্রতি অত্যধিক সম্মান দেখিয়ে সে অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে দরবেশের বিছানা করল। সারাদিনের বিরামহীন ক্লান্তির কারণে শুয়েই সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।
মধ্যরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল দরবেশের। চোখ মেলল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। মোটা কাপড় দিয়ে তার চোখ মুখ বেঁধে ফেলা হয়েছে। সে উঠে দাঁড়াল কিন্তু পা বাড়াতে পারল না। দু’তিনজন লোক তার হাত পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলল। সাথে সাথে তাকে ধরাধরি করে একটি উটের উপরে রেখে বেঁধে ফেলল উটের সাথে। উটের রশি আরেকটি ঘোড়ার সাথে বেঁধে ঘোড়াকে তাড়া দিল। সহগামী হলো আরেকটি ঘোড়া। কারামাতী গুপ্তচররা অপ্রত্যাশিতভাবে চার-কুমারী দুর্গের রহস্যজনক নিরাপত্তারক্ষী হত্যাকারীকে পেয়ে তাকে দাউদের কাছে পৌঁছে দিয়ে মোটা অংকের পুরস্কার প্রাপ্তির আশায় দরবেশকে মুলতানে নিয়ে যাওয়ার জন্য দু’জনকে দিয়ে রাতের অন্ধকারেই পাঠিয়ে দিল। এ কাজটা আসলেই ছিল তাদের জন্য বিরাট এক সাফল্য আর দরবেশ ও সাথীদের জন্যে মারাত্মক বিপর্যয়।
দরবেশের সাথীরা তার কাছ থেকে অনেকটা দূরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছিল। রাতের এই অপহরণ ঘটনা মোটেও টের পেল না তারা।
খুব ভোরেই ঘুম ভাঙল আলেম ব্যক্তির। তিনি ঘুম থেকে উঠে নামাযের জন্য দরবেশকে জাগাতে তার বিছানায় গেলেন। কিন্তু বিছানা খালি। ভাবলেন, দরবেশ হয়তো তার আগেই শয্যা ত্যাগ করে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেছেন। অথবা অযু করতে নদীতে গেছেন। কারামাতী কমান্ডার ঘুম থেকে উঠে তাদের বাধা উট ও ঘোড়র দিকে গেল। একটু পরই চিল্লাতে শুরু করল, “হায়! আমাদের দুটি ঘোড়া ও একটি উট নেই। আমাদের দু’ সাথীও নেই। হল্লাচিল্লা করে কারামাতী কমান্ডার আবিষ্কার করল, আমাদের দামী জিনিসপত্রগুলোও সব নিয়ে গেছে। কমান্ডার চেমামেচি করে ঘোড়ায় জিন লাগাতে শুরু করল, আর বলতে লাগল, বেশি দূর যেতে পারেনি। চলো, ওদের তালাশ করি।” এমন সময় আলেম বললেন, “আমাদের দরবেশকেও তো দেখছি না।”
“হ্যাঁ, তাহলে সে-ই আমাদেৰু লোকদের অপহরণ করেছে। তাকে তো আমরা দরবেশ মনে করেছিলাম। কিন্তু গতরাতে সুড়ঙ্গের মধ্যে যেভাবে এক সৈনিককে সে হত্যা করে ফিরে এসেছে এ লোক পেশাদার খুনী। চল ওকে ধরতে হবে।”
“ওর পিছু নেয়া বোকামী।” বলল অপর এক কারামাতী। জানা তো নেই এখান থেকে কখন কোন দিকে পালিয়েছে সে।”
“হ্যাঁ। তুমি ঠিক বলেছো। এ মৰু বিজন প্রান্তরে কোথায় খুঁজে ফিরব আমরা। ওকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।” বলল কমান্ডার।
“আলেম ব্যক্তি নীরবে দাঁড়ানো। তার তিন সাথীও হতবাক। হচ্ছে কি এসব? দরবেশকে তো তারা জানে, সে খুন-খারাবী, চুরি-ডাকাতি করবে, একথা তারা কল্পনাও করতে পারে না। তার মতো একজন মর্দে মুমেন নেক মানুষ সচরাচর দেখা যায় না। অথচ এরা বলছে, দরবেশ তাদের মালপত্র লোকসহ অপহরণ করে নিয়ে গেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় তারা হতবাক।
“আমার তো মনে হয় তোমরাও ডাকাত।” আলেমকে উদ্দেশ্য করে বলল কারামাতী কমান্ডার।
