উভয় কাফেলা মুখোমুখি হলে কুশল বিনিময় হলো, সালাম কালামও হলো। কিন্তু পরিচিতি পর্বে উভয় কাফেলা কিছুটা রক্ষণশীলতা বজায় রাখলো। দরবেশ জানালো, “তারা মুলতানের বাসিন্দা, মুলতানেই ব্যবসা করে। ব্যবসায়িক কাজে বেরা যাচ্ছে। কারামাতীরা বলল, “তারা লাহোরের বাসিন্দা। ব্যবসায়িক কাজে মুলতান এসেছিল। এখন বের হয়ে লাহোর ফিরে যাবে।”
“আপনারা তো মুলতানের অধিবাসী, তাহলে তো আপনারা কারামাতী মুসলমান?” দরবেশকে জিজ্ঞেস করল এক কারামাতী।
“না, আমরা সুন্নী মুসলমান। কারামাতীদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। ওদেরকে আমরা মুসলমানই মনে করি না। আপনারা তো মনে হয় সুন্নী মুসলমান। কারণ, মুলতান ছাড়া আর কোথাও কারামাতী নেই।” বলল দরবেশ।
“ওদের আমরা চিনি না।” বলল এক কারামাতী সৈনিক। “আমরাও আপনাদের মতই সুন্নী মুসলমান। আচ্ছা- শুনলাম, সুলতান মাহমূদ বেরা দখল করেছে ওখানকার রাজা বিজি রায় নাকি আত্মহত্যা করেছে?”।
“শুনলাম তাই।” বললেন আলেম। “যদি খবরটি সত্য হয়ে থাকে, তবে আপনার, আমার সবারই খুশি হওয়া উচিত। মুহাম্মদ বিন কাসেমের পর এই প্রথম কোন ন্যায়পরায়ণ সুলতান এদিকে অভিযান করলেন। আপনি দেখে থাকবেন, এ অঞ্চলের অশিক্ষিত দরিদ্র মুসলমানরা কীভাবে দলে দলে হিন্দুদের চক্রান্তে ধর্মান্তরিত হচ্ছে।”
“আমরা খুব খুশি হয়েছি।” বলল কারামাতী কমান্ডার। “আমরা চাই সুলতান মাহমূদ লাহোরও দখল করে নিক। এ এলাকাটিও মুসলমানদের দখলে আসা দরকার।”
“লাহোরের আগে সুলতান মাহমূদের উচিত মুলতান দখল করা। কথায় বলে, ঘরের শত্রু বিভীষণ। আপনি হয়তো জানেন, মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসর খৃস্টান ও হিন্দুদের ক্রীড়নক সেজে মুসলমানদের পরিচয়ে ইসলামের শিকড় কাটছে।”
“জানা তো নেই, সুলতান মাহমুদ দাউদের স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে জানেন কি । সুলতানের কাছে সঠিক তথ্য আছে কি না তাও তো জানা নেই।” বলল কারামাতী কমান্ডার।
“জানা না থাকলেও তার এখন জানা উচিত।” বললেন আলেম।
“আমরা তো এক সাথেই বেরা যাচ্ছি। সুলতান মাহমূদ যাতে দাউদ বিন নসরকে বন্ধু মনে না করেন, এ ব্যাপারটি তাকে অবহিত করা তো আমাদেরও কর্তব্য।” বলল কারামাতী কমান্ডার।
“অবশ্যই।” বললেন দরবেশ। এ কর্তব্য আমাদের অবশ্যই পালন করা দরকার।
সবাই সমতালে চলতে লাগল। আলেম ও দরবেশ এ কথা প্রকাশ করতে চাচ্ছিল না যে, তারা সুলতান মাহমুদের কাছেই যাচ্ছে। তাদের গতিবিধি দেখে কারামাতীদের এমন কোন সংশয়ও হয়নি। কিন্তু কারামাতীরা ছিল দুর্দান্ত চালাক এবং পৈশাদার গোয়েন্দা। ওরাও নিজেদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেনি। কারামাতীরা দরবেশ ও সাথীদের আকীদা বিশ্বাস নিয়েই কথাবার্তা বলছিল। দরবেশ ও আলেম ঘুণাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারেনি যে ওরা সুন্নী মুসলমান নয় এবং ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য কিছুও হতে পারে। তাদের মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক না হওয়ায় সমমনা মনে করে তারাও অকপটে ওদের সাথে কথাবার্তা বলতে লাগল।
বেলা ডুবার আগেই তারা মুলতান অঞ্চলের বড় নদী রাভী পেরিয়ে গেল। যে জায়গা দিয়ে তারা নদী পার হল এখানে নদীটি বেশ চওড়া কিন্তু অগভীর। নদী পেরিয়ে তীরে উঠেই তারা সবাই রাত যাপনের জন্যে সুবিধা মতো একটি জায়গা বেছে নিল। এ সময় কারামাতী দলের কমান্ডার তার ঘোড়র পিঠ থেকে সামান ও জিন খুলছে, তার এক সৈনিক তার কাজে সহযোগিতা করছে। সহযোগী সৈনিকটি জিন খুলতে খুলতে কমান্ডারের উদ্দেশ্যে বলল, “লোকগুলোকে দেখে তো ব্যবসায়ীই মনে হয় কিন্তু আমার সন্দেহ হয়, ওরা আমাদের বিরুদ্ধে কোন বদ মতলবে বেরা যাচ্ছে না তো? যে দু’জন লোক আমাদের সাথে কথাবার্তা বলছে, মনে হয় এরা শিক্ষিত, আলেম। এরা যদি আমাদের সম্পর্কে কোন কূটকৌশল না করে তবুও আমাদের উচিত হবে এদের সাথে থাকা। কারণ আলেম হিসাবে বেরাতে তারা যে সম্মান পাবে এদের সাথে থাকলে আমরাও তাদের দ্বারা উপকৃত হবো। আমাদের উচিত তাদের সাথে হৃদ্যতা সৃষ্টি করা।”
“আজ রাতে আমরা মদের মশক খুলব না। যাতে তারা আমাদেরকে মুমেন মুসলমান মনে করে। তাদের মধ্যে ওই বুড়ো লোকটি খুব ভালভাল কথা বলে। আমরা তাদেরকে সুলতান মাহমূদের সাথে সাক্ষাতের জন্যে উৎসাহ দেবো। এরপর তাদের সাথে আমাদের একজনও চলে যাবো মাহমূদের দরবারে। তাহলে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানা যাবে।”
সবাই এক সাথে আহারে বসল। আহার পর্বেও কারামাতী কমান্ডার সারাদিনের মতো ধর্মীয় প্রসঙ্গে কথা বলতে লাগল। ওদের কথায় বুঝা যাচুিল, তারা নিষ্ঠাবান মুসলমান। কথার ধরনও ছিল এমন যে, আলেম ও দরবেশ মনে করলেন, তাদের মতো এরাও সুলতান মাহমূদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তাদের মতোই ইসলামের জন্যে নিবেদিত প্রাণ। কারামাতী দলের সবাই প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা। ট্রেনিংপ্রাপ্ত সৈনিক। দরবেশ ও আলেমের মিশন ছিল ইসলামী চেতনা থেকে উৎসারিত কর্তব্যের প্রতিফলন। তাই তাদের মধ্যে সব বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতনতার বোধ ছিল না। তাদের মন-মস্তিষ্কেও এসবের গন্ধ নেই। পক্ষান্তরে কারামাতী দলটির মিশনই ছিল সন্দেহজাত, ধূর্তামি আর প্রতারণার। কথায় কথায় কারামাতী প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করে দিল দলনেতা।
“কারামাতীদেরকে আমরা ভ্রান্ত মনে করি।” বলল কারামাতী কমান্ডার। “কিন্তু মুলতানে আমরা যাকেই দেখলাম সবাইকে দাউদের অনুসারীই মনে হলো। সেখানে লোক মুখে চার-কুমারী দুর্গের কথা গুনে গতরাতে আমরা সেই মেলা দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা জিন দেখলাম, কুণ্ডলীর ভেতর থেকে চারটি তরতাজা কুমারী মঞ্চে আবির্ভূত হলো। তারা আবার ধোয়ার মধ্যেই হারিয়ে গেল। আমাদের কাছে তো এগুলো বাস্তব এবং দাউদের কারামতীই মনে হলো। মনে হয় দাউদের মধ্যে বিশেষ আধ্যাত্মিক গুণ আছে– না হয় এসব কি কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব?”
