চার-কুমারী দুর্গে দাউদের তেলেসমাতী দেখে আসার পর বুযুর্গের নেতৃত্বে আবার পুরনো বাড়িতে বসল তাঁর সতীর্থদের পর্যালোচনা বৈঠক। আগেই আমার সন্দেহ হয়েছিল এই দুর্গে জিনদের কোন অস্তিত্ব নেই, থাকলেও এভাবে এদেরকে বন্দী করে রাখা যায় না।
বুযুর্গ ও তার সহযোগিরা যখন চার-কুমারী দুর্গের ঘটনা ও তাদের করণীয় নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন তখন সেই বাড়ির দরজায় কড়া নড়ে উঠল । দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল বাড়ির মালিক। আর অন্যেরা বিপদাশংকায় পালানোর জন্যে তৈরি হয়ে গেল। বাড়ির মালিক ছিল এদের সহযোগী। কোন বিপদ সংকেত থাকলে সে দরজার কাছে এসে কাশি দেবে এমন কথা ছিল। কিন্তু আজ সে কাশি দেয়নি। যখন দরজা খোলা হল তখন দেখা গেল, তাদেরই অন্য এক সাথী উপস্থিত।
আমি যে খবর শুনে এসেছি, তা যদি সত্য হয় তবে কারামাতীদের মৃত্যু ঘণ্টা ঘনিয়ে এসেছে। বেরা থেকে কয়েকজন লোক এসে বলেছে, সুলতান মাহমূদ বেরা দখল করে নিয়েছেন। বেরার রাজা বিজি রায় আত্মহত্যা করেছে। লোকগুলো বলেছে– তিনদিন পর্যন্ত এমন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছে যে, সুলতান ও বিজি রায় সবারই সহায় সম্পদ সব বিনষ্ট হয়ে গেছে। এখন সুলতান গজনীর সাহায্যের জন্যে অপেক্ষা করছেন। গজনী থেকে রসদপত্র পৌঁছাতে সময় লাগবে। বর্তমানে বেরা থেকে কাউকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না, কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।
সবাই গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। কিছুক্ষণ পর আলেম বললেন, “রাজশক্তির সাথে টক্কর দেয়া আমাদের সম্ভব নয়। আমরা এখন গোপনে কারামাতী চক্রান্তকারীদের নির্মূল করার কাজটি চালিয়ে যেতে পারি। যে কাজটি আমাদের দরবেশ সুনিপুণভাবেই শুরু করে এসেছে। সতর্ক থাকতে হবে আমাদের যেন কেউ চিহ্নিত করতে না পারে। যদি দাউদকে হত্যা করা যায় তবে হয়তো এই অপকর্ম বন্ধ হয়ে যাবে। তৃতীয় পন্থা হতে পারে আমাদের কয়েকজন বেরা গিয়ে সুলতান মাহমূদকে এখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে মুলতান আক্রমণের জন্যে অনুরোধ করা।
একথায় সায় দিল সবাই। সিদ্ধান্ত হল, আলেম, বুযুর্গ ও আরো তিনজন নওজোয়ান সাথী পরদিন সকালেই বেরার উদ্দেশে রওয়ানা হবে।
দরবেশের গোপন আস্তানায় যখন সুলতান মাহমুদের বেরা বিজয়ের খবর শোনানো হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে দাউদকেও তার গোয়েন্দারা খবর দিল যে, সুলতান মাহমূদ বেরা দখল করে নিয়েছে এবং বিজি রায় আত্মহত্যা করেছে।
দাউদ তখন চার-কুমারী দুর্গের যাদুকরী ধোকাবাজীর এক সহযোগী হত্যার অপরাধে অন্যান্য প্রহরীর উপর চড়াও হচ্ছিল। প্রহরীরা তার সামনে দণ্ডায়মান হয়ে করজোড়ে নিবেদন করছিল, তাদের কেউ ওকে হত্যা করেনি। বরং তারা একজনকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে। কিন্তু দাউদ কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে রাজি নয়। দাউদের বিশ্বাস, কোন তরুণীর চক্রান্তে এদেরই কেউ ওকে হত্যা করেছে। দাউদ ওদেরকে শাসাচ্ছিল কিন্তু প্রহরীদের সবাই মিনতি করছিল আমরা ওকে হত্যা করিনি।
এ সময় দাউদের সেনাপতি এসে জানাল বেরার দুঃসংবাদ। সংবাদ শুনে দাউদের অবস্থা এমন হলো যে, তার মদের নেশা উবে গেল। বেসামাল দাউদ চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশংকায় চোখে অন্ধকার দেখছিল। এরই উপর ভয়ানক দুঃসংবাদ ওকে আরো শংকিত করে ফেলল। নিরাপত্তা প্রধানকে হুকুম দিল, ওদেরকে হাত পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে দাও, তারপরও যদি সত্য কথা না বলে তবে কোন খাবার না দিয়ে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ফেলে রাখবে।
প্রহরীদেরকে নিয়ে যাওয়ার পর সেনাপতিকে দাউদ বলল, মাহমূদ যদি বেরা দখল করে থাকে তবে আমাদেরকে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। তুমি আগামীকাল সকালেই ব্যবসায়ীর বেশে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা পাঠিয়ে দাও। তারা গিয়ে সরেজমিনে ব্যাপারটি দেখে আসুক। মাহমূদের কাছে যদি সৈন্যবল কম থেকে থাকে তবে আমরা মহারাজা আনন্দ পালকে খবর দেবো ওর উপর হামলা করতে।
সকাল বেলা মুলতান থেকে ছোট দুটি কাফেলা বেরার উদ্দেশে বের হল। এক দলে দরবেশ, আলেম ও তার তিন সাথী, আর অপর দলে দাউদের সেনা বাহিনীর দুই কর্মকর্তা ও অপর চারজন সৈনিক।
দাউদের লোকেরা যখন দরবেশের কাফেলাকে দেখল তখন বলল, মনে হয় ওরাও ওদিকে যাবে। চল, আমরাও ওদের সাথে মিশে যাই।
২.২ হক ও বাতিলের লড়াই
থমকে গেল দাউদের চমক। উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তায় দাউদের নাচ, নখরা ভাটা পড়ল। বেরা পতনের খবরে দাউদের মাথায় চক্কর দিয়ে উঠল। সে চারজন কমান্ডার ও দুইজন ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসারকে বেরার উদ্দেশে পাঠাল। ওদেরকে নির্দেশ দিল, যে করেই হোক, তোমরা বেরায় গিয়ে সুলতান মাহমূদের অবস্থা জানাবে। সে কবে নাগাদ মুলতান অভিযানে বের হতে পারে এবং তার সৈন্যসংখ্যা কত? ওখানকার হিন্দুদের অবস্থা কি তাও ভাল করে অনুসন্ধান করবে এবং সম্ভব হলে ওদের সাথে যোগাযোগ করে আসবে। নির্দেশ মত ছয়জনের কাফেলা বণিকের বেশে বেরার পথে রওয়ানা হল। এই ছয়জনের প্রত্যেকেই ছিল গোয়েন্দাবৃত্তিতে পারদর্শী এবং কট্টর কারামাতী।
মুলতান থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর গুপ্তচর কারামাতীরা দরবেশ, আলেমসহ আরো তিন ব্যক্তিকে বেরার দিকেই যেতে দেখল। তারা এদের সাথে মিশে গেল। ভাবল, একই দিকে যেহেতু যাচ্ছি, তাই এদের কাছ থেকে কোন সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। দাউদের গুপ্তচররা ছিল অশ্বারোহী। তাছাড়াও তাদের তিনটি উট বোঝাই ছিল মালপত্রে। দরবেশের সাথীদের তিনজন ছিল উষ্ট্রারোহী এবং আলেম ও দরবেশ অশ্বারোহী। এরা ছিল নিষ্ঠাবান সুন্নী মুসলমান। তারা যাচ্ছিল সুলতান মাহমূদকে কারামাতীদের দুষ্কৃতি সম্পর্কে অবহিত করে মুলতান আক্রমণের অনুরোধ জানাতে।
