আক্রান্ত আর্তচিৎকার দিলে দৌড়ে সিঁড়ির প্রবেশপথে এসে পড়লেন বুযুর্গ । তার দিকে দৌড়ে এলো কয়েকজন। বুযুর্গ বললেন, জলদি নিচে যাও। আমি আসছি। ওরা আহতের আর্তচিৎকার শুনেছিল। বুযুর্গকে চিনতে না পেরে ওরা সুড়ঙ্গপথের দিকে দৌড়ে গেল আর এই ফাঁকে দৌড়ে গলিপথ মাড়িয়ে জনারণ্যে মিশে গেলেন বুযুর্গ। রক্তমাখা খঞ্জরটি এর আগেই কোমরে খুঁজে ফেলেছিলেন তিনি।
সমবেত সকল লোকের আকর্ষণ ছিল মঞ্চের দিকে। সেখানে আলোর তীব্রতা কম। সবার দৃষ্টি মঞ্চের দিকে। বুযুর্গ তাঁর সাথীদের খুঁজে বের করে সংক্ষেপে বললেন, তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, কি দেখেছেন এবং কি করে এসেছেন। সাথীরা তাকে এখান থেকে চলে আসার প্রস্তাব দিয়ে বলল, অন্যথায় আপনার ধরা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শংকা না বাড়িয়ে বুর্গ চলে এলেন দুর্গ থেকে।
একটু পরই নাকাড়া বেজে উঠল। বাজল সানাই। এটা দাউদের মঞ্চে আগমন বার্তা। একটু পরই ঘোষক ঘোষণা দিল- মুলতানের শাসক, কারামাতী পয়গাম্বর, আবুল ফাতাহ শাইখ নসর বিন শাইখ হামিদ কারামাতী, সত্য ইসলামের পতাকাবাহী মঞ্চে আসছেন, জিন ওভূত তার তাবেদার। উপস্থিত সকলেই মাথা নীচু করে তাকে অভিবাদন জানাবে।
ঢোল নাকারা বাজতে থাকল। বাজনার তালে তালে সৃষ্টি হলো সুর লহরী, যেন আন্দোলিত হতে থাকলো শত শত বছরের পরিত্যক্ত দুর্গের সব ঘরদোর। বাজনার আবহে মঞ্চের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো দাউদ, মাথায় রাজমুকুট। সারা গায়ে জরিদার জমকালো রাজকীয় পোশাক। সে এসে উপবেশন করল হীরা-মুক্তার সিংহাসনে। মানুষ তার আগমনে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করল। ঘোষক হাক দিল, “শত শত বছর ধরে এই দুর্গ জিন-ভূত-প্রেত্নীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল, এরা প্রতিদিন একজন না একজনের তাজা রক্তপান করতো। সত্যধর্মের পয়গাম্বর তার বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতাবলে খোদর বিশেষ ক্ষমতায় সকল ভূত-পেত্নী ও জিনকে তিনি অনুগত বানিয়ে ফেলেছেন। ওদেরকে বন্দী করে রেখেছেন। সমবেত সকল মানুষের কর্তব্য তার আনুগত্য স্বীকার করে তার হাতে মুরীদ হওয়া। না হয় জিন-ভূতেরা তাদের ক্ষতি করবে।”
এমন গুরু গম্ভীর আওয়াজে এই ঘোষণা দেয়া হলো যে, সমবেত মানুষজন ভীষণ প্রভাবিত হলো। এরপর কানে ভেসে এলো ধীরলয়ের যন্ত্রসঙ্গীতের আওয়াজ, সেই সাথে নৃত্যের সুরলহরী। এ সময়ে সমবেত কণ্ঠের কোরাস সঙ্গীতের আওয়াজও ভেসে এলো। পুরো প্যান্ডেলটি বাজনার তালে তালে নেচে উঠল। দাউদ বিন নসর মসনদ থেকে দাঁড়িয়ে গেল দর্শকদের দিকে পিঠ করে । বিড় বিড় করে মন্ত্রের মতো কি যেন আওড়াল। সুড়ঙ্গ পথ ছিল অন্ধকার। ওখান থেকে প্রথমে ধোয়া নির্গত হয়ে মঞ্চের জায়গাটি অন্ধকার হয়ে গেল। দাউদ দুহাত প্রসারিত করে বলল, খোদায়ে যুলজালাল! হে মানুষ ও জিনের সৃষ্টিকর্তা! আমাকে তুমি খোদায়ী শক্তি দাও। যাতে জিন ও ভূতের কষ্ট থেকে তাদের আমি মুক্তি দিতে পারি। সে ধমকের স্বরে বলল, “আমার সামনে আয়।” কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায় মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে ধোয়া কমে গেল, ধোয়ার ভেতর থেকে চারটি কুমারী সুন্দরী দৃশ্যমান হল।
মেয়েগুলো যেন জান্নাতের হুর। তাদের গায়ে ফিনফিনে রেশমী পোশাক। বাদকদলের বাজনা আরো তীব্র হলো। যন্ত্রসঙ্গীতের সুরে কেঁপে কেঁপে উঠল মঞ্চ। যুবতীরা এক সাথে দাউদকে কুর্নিশ করতে সেজদায় পড়ে গেল। দাউদ তাদেরকে উঠে যেতে ইশারা করল। ধোয়া সম্পূর্ণ গায়েব হওয়ার আগেই যুবতীরাও অদৃশ্য হয়ে গেল।
যুবতীদের অন্তর্ধান বুঝে উঠার আগেই মঞ্চে দেখা গেল চারটি দৈত্যের মতো জংলী মানুষ। লোমশ কালো চেহারা। কুচকুচে কালো শরীর। বড় বড় চোখ। মাথার চুলগুলো সজারুর কাঁটার মতো খাড়া। মাথায় বাঁকানো শিং। দীর্ঘ দাঁত ওদের মুখের গহ্বর থেকে বেরিয়ে এসেছে। মঞ্চের উপরে বেতাল বেশামালভাবে নাচতে শুরু করে দিল দৈত্যগুলো। ঘোষণা হলো– এরাই জিন। এদের চেয়ে আরো উট চেহারার দানবের মতো একটি লোককে দেখা গেল হাতে চাবুক নিয়ে দাঁত খিটমিট করছে। সে বন্য দৈত্যগুলোকে এভাবে পেটাতে শুরু করে দিল যে, ওদের বিকট চিঙ্কারে দর্শকগণ ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল।
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল, থামোয় থেমে গেল পেটানো। ভূতগুলো সমস্বরে বলে উঠল, হুজুর! আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি। হজুর! আমরা এখন আপনার কথা মানবব, আমরা আপনার মুরীদ হয়ে গেছি। আমরা কসম করে বলছি আপনি আল্লাহ্র পয়গম্বর, আল্লাহ্র দূত। এ সংবাদ আমরা গায়েব থেকে জানতে পেরেছি।
মঞ্চের দিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আবারো ধেয়ে আসল। অন্ধকার হয়ে গেল মঞ্চ। ধোয়া কেটে যখন মঞ্চ পরিষ্কার হয়ে গেল তখন সেখানে দৈত্য দাউদ কাউকেই আর দেখা গেল না। ঘোষণা করা হল কারামাতী পয়গম্বর আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিতে গেছেন।
তোমরা যা দেখে এলে এসবই সেই সুড়ঙ্গের তেলেসমাতি। সাথীদের উদ্দেশ্যে সেই পুরনো বাড়িতে বসে বলছিলেন বুযুর্গ ব্যক্তি। যে মেয়েগুলোকে তোমরা দেখে এসেছে ওদেরকে আমি একটি বন্ধ ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছি। এ সবই সেই সুড়ঙ্গ পথের কারিগরী। সুড়ং পথটি নতুন তৈরি করা হয়েছে। এই সুড়ঙ্গ পথটি মঞ্চে এসে শেষ হয়েছে। এই সুড়ঙ্গ পথেই মঞ্চের দিকে ধোয়া ছোঁড়া হয়। মেয়ে ও কৃত্রিম দৈত্যগুলো এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়েই দৃশ্যমান হয়ে আবার ধোয়ার অন্ধকারে সুড়ঙ্গ পথে চলে যায়।
