“বাবারা! মনোযোগ দিয়ে শোন!” বললেন আলেম। “কারামাতী গোষ্ঠী কাফেরদের সৃষ্ট। ওদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য তোমরা জান। চিন্তার ব্যাপার হলো- ধর্ম অনেক সময় মানুষকে দুর্বল করে দেয়। মুসলমানরা ধর্মের জন্যে জীবন বাজী রাখতে দ্বিধা করে না, আমাদের শত্রুরা তা ভালভাবে জানে বলেই ধর্মের অস্ত্র ব্যবহার করেই আমাদের ঘায়েল করতে তৎপর।”
“দাউদ ক্ষমতালি। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্যে সে ধর্মের লেবাস পরেছে। ধর্মের লেবেল এটেই দাউদ নিজের ক্ষমতা শক্ত করার কাজে লিপ্ত। লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবে, আমাদের ধর্মের লোকেরা জাতিগতভাবে যতো প্রতারণার শিকার হয়েছে সবগুলো ধর্মের আবরণেই হয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগ তো আর এখন নেই। তারা নিজেরা যেমন খাঁটি ছিলেন লোকদেরকেও খাঁটি ধর্মকর্ম পালনে বাধ্য করতেন। বর্তমান শাসকরা ধর্মের আবরণে নিজেদের খেলাফত টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট। এরা ধর্মকে মোড়কের মতো ব্যবহার করে অশিক্ষিত লোকদের সমর্থক বানাচ্ছে। সাধারণ লোকদের এদের ধোকা বুঝতে অনেক দেরী হয়। আর যখন বুঝে তখন আর করার কিছু থাকে না। কেউ যদি এদের ধোঁকার মোকাবেলায় সঠিক কথা বলে তাকে ক্ষমতার শক্তি-লে নিঃশেষ করে দেয়া হয়।
দাউদ বিন নসর যে মুসলমান নয় এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দাউদ যে ইসলামের ক্ষতি করছে, খৃস্টান ও হিন্দুদের সাথে মিলে মুসলমানদের ধ্বংস করতে শুরু করেছে প্রকাশ্যে একথা আমাদের বলা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ ওর বিরুদ্ধে মোকাবেলায় যাওয়াও কঠিন ব্যাপার। ওর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে না আমরা কিছু করতে পারছি না, আর আমরা সত্য কথা বলতে পারছি। এজন্য আমাদেরকে গোপন তৎপরতা চালাতে হবে।” বলল সেই অগ্রসর যুবক।
“যা। আজ রাতেই আমরা চার-কুমারী দুর্গে যাব।” বললেন দরবেশ। “সরেজমিনে পরিস্থিতিটা দেখে এসে তারপর আমরা ঠিক করব পরবর্তী কর্তব্য।”
সন্ধ্যার পর দুর্গের জনারণ্যে প্রবেশ করল বুযুর্গ ও তাঁর সাথীরা। দুর্গাভ্যন্তরের পরিবেশ দেখে সবাই অবাক। দর্শকদের আগ্রহ, মুগ্ধতা দেখে তাদের বিস্ময় আরো বেড়ে গেল। দর্শকরা দুর্গের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ঘরবাড়িগুলো দেখছিল। বুযুর্গের সাথে ছিল নয়জনের একটি তরুণ দল। তন্মধ্যে দুজনের বয়স ছিল সতেরো আঠারো। তারা এটা সেটা দেখতে দেখতে এমন এক জায়গায় এসে থামল সেখান থেকে আর সামনে কাউকে যেতে দেয়া হয় না। একজন প্রহরী দর্শকদেরকে সামনে অগ্রসর হতে না দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছিল। বুযুর্গ ও তার সাথীরাও এখানে এসে থেমে গেল। সামনে এগুতে চাইলে বাধা দিল প্রহরী। বুযুর্গ প্রহরীকে জিজ্ঞেস করল, সামনে কি? প্রহরী জবাব না দিয়ে রাগতস্বরে বুযুর্গকে ফিরে যেতে বলল। ইত্যবসরে প্রহরীর দৃষ্টি অন্য দিকে চলে গেল আর ফাঁক বুঝে প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন বুযুর্গ। জায়গাটি ছিল আলো আঁধারী। তাই প্রহরী বুযুর্গের অনুপ্রবেশ ঠাহর করতে পারল না। বুযুর্গ প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে সাথীদের ইশারা করলেন ওখান থেকে চলে যেতে। সাথীরা ওখান থেকে ফিরে গিয়ে মঞ্চের চারপাশে জড়ো হওয়া মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।
অন্ধকার গলিপথে যেতে যেতে বুযুর্গ একটি ঘরের মধ্য থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতে দেখলেন। তিনি দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলেন, ভেতরের ঘরটি খুব সাজানো, মেঝের মধ্যে সুদৃশ্য গালিচা বিছানো । গালিচার উপরে বালিশ। রঙ বেরঙের ঝাড়বাতি জ্বালানো। অর্ধনগ্ন পাঁচ ছয়টি সুন্দরী তরুণী উজ্জ্বল নৃত্যরত। বালিশে ঠেক দিয়ে দুই সুদর্শন পুরুষ রাজকীয় ভঙ্গিতে বসা। তাদের সামনে পানপাত্র। তারা থাবা দিয়ে নৃত্যরত একেকটি তরুণীকে ধরে নিজের কোলে টেনে নিয়ে ওকে উলঙ্গ করে নানাভাবে মজা করছে আর অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ছে।
এ দৃশ্য দেখে বুযুর্গ আরো সামনে অগ্রসর হলেন। সামনে পেলেন দরজা খোলা একটি কামরা। ভেতরে বাতি জ্বলছে, কোন লোক নেই। ভেতরে ঢুকে পড়লেন বুযুর্গ। দেখলেন এককোণে একটি সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে। বুযুর্গ ভাবলেন, এটা হয়তো কোন সুড়ঙ্গ পথ নয়তো কোন গুদাম ঘরের সিঁড়ি। সিঁড়ি ভেঙে সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন বুযুর্গ। আশ্চর্য! বাড়ির কোথাও কোন মেরামতের কাজ না হলেও এ সিঁড়িটি ছিল নতুন এবং সুড়ঙ্গ পথটি ছিল যথেষ্ট প্রশস্ত। একজন জোয়ান মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তার মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে পারতো। বুযুর্গ সুড়ঙ্গ পথে এগুতে থাকলেন, সুড়ঙ্গের জায়গায় জায়গায় বাতি জ্বালানো। বুযুর্গ টেরই পাননি, তার কয়েক কদম পিছনে খঞ্জর হাতে একলোক তাকে অনুসরণ করছে। লোকটি খঞ্জর হাতে পা টিপে টিপে বুযুর্গের পিছনে পিছনে আসছিল। লোকটি বুযুর্গ ব্যক্তিকে খঞ্জর দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করতে হাত উপরে উঠাল কিন্তু লোকটি বুঝে উঠতে পারছিল না, সুড়ঙ্গ পথটি এতোটুকু চওড়া নয় যে, হাত উঁচু করে হাত ঘুরিয়ে আঘাত হানা যাবে। সুড়ঙ্গ পথের দেয়ালে আঘাত লেগে শব্দ হলে বুযুর্গ চকিতে পিছন ফিরে বিদ্যুৎগতিতে কোমর থেকে খ র বের করে আঘাতকারীকে প্রতিঘাত করলেন। উভয়ের হাতের খঞ্জরে টক্কর খেয়ে শব্দ হল। কেউ লক্ষ্যভেদ করতে পারল না। বুযুর্গ বামপায়ে সজোরে প্রহরীর কোমরে লাথি মেরে চিৎ করে ফেলে দিলেন। নিজের খঞ্জর ওর বুকে আমূল বিদ্ধ করে হেচকা টানে বের করে আবার পাজরে ঢুকিয়ে আরেকটি লাথি মারলেন। লোকটি আর্তচিৎকার দিয়ে গড়িয়ে পড়ল।
