মুলতান শহরের সবচেয়ে ঘন-ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাস মুসলমানদের। কারামাতীদের হাতে মুলতানের শাসনক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকে হকপন্থী মুসলমানদের আর্থিক ও সামাজিক অবনতি ঘটে। চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য সর্বদিক থেকেই মুসলমানদের উপর নেমে আসে দুর্যোগ। যারা কারামাতীদের অনুসারী তারাই সরকারী সহযোগিতা ও আনুগত্যে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে।
ঘন বসতি মুসলিম এলাকায় অনুরূপ আরেকটি দুর্গসম বাড়িতে কিছু সংখ্যক খাঁটি মুসলিম পরিবার বাস করে। চার-কুমারী দুর্গে মেলা শুরু হওয়ার ক’দিন পর এই দুর্গসম বাড়িতে কয়েকজন লোক একটি পুরনো ঘরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আলোচনারত। তবে তাদের আলোচনার বিষয় দাউদের কারামতীর প্রশংসা নয়, দাউদের কারামতীর বিরূপতা। আলাপকারীদের একজন সেই বুযুর্গ যিনি রাবেয়াকে আসেম ওমরের চক্রান্ত ফাঁস করে দেয়ার জন্য দাউদের প্রাসাদ থেকে ফেরার হতে সাহায্য করেছিলেন।
“মুলতানের শাসনক্ষমতা কারামাতীদের হাতে। সর্বময় দণ্ডমুণ্ডের মালিক তারা। তাই আমরা প্রকাশ্যে একথা বলতে পারছি না, কারামাতী আসলে ইসলামী আদর্শ নয়, সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী। ইসলাম মানুষকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে নেক কাজে উৎসাহিত করে। ইসলামের সম্পর্ক মানুষের আত্মার সাথে আর কারামাতী ধর্ম শরীর সর্বস্ব। কারামাতী মতে, মানুষ যথেচ্ছভাবে তাবৎ বিলাস-ব্যসন, জিনা-ব্যভিচার, মদ-নারী সম্ভোগ করতে পারে। কারামাতী মতে একজন সুন্দরী নারী ইচ্ছে করলে স্বামী ছাড়াও যে কোন পছন্দনীয় পুরুষের সঙ্গ লাভ করতে পারে, তাতে কোন বাধা নেই। সে তার শরীরের একচ্ছত্র মালিক। তার ইচ্ছায় বাধা দেয়ার এখতিয়ার কারো নেই। তাদের মতে, আল্লাহ্ মানুষকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন দুনিয়ার স্বাদ উপভোগ করতে। এতে বিধি-নিষেধ থাকতে পারে না। আপনারা লক্ষ্য করেছেন– কারামাতীদের অনুসারী ঢলের মতো বাড়ছে। সাধারণ অজ্ঞ মানুষ এদের প্ররোচণায় আকৃষ্ট হয়ে ঈমান হারাতে শুরু করেছে।” বললেন একজন।
“মানুষ স্বভাবতই পাপকর্মের প্রতি দ্রুত আকৃষ্ট হয়।” বললেন সমবেতদের মধ্যে আলেম ব্যক্তি। “নেক কাজে দৈহিক কোন সুখ নেই। মানুষের আসল শক্তি আত্মা। আত্মা দেখা যায় না। আত্মার সুখ তারাই অনুভব করতে পারে যারা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করে আত্মা পবিত্র রেখেছে। সাধারণত মানুষ এটা বুঝতে চায় না। আত্মা পাপকর্মে দুর্বল হয়ে যায়। আত্মা দুর্বল হয়ে গেলে শরীরও দুর্বল হয়ে পড়ে। বেশি পাপকর্ম করলে মানুষের আত্মা মরে যায়। জীবন শেষে মানুষ যখন মরে যায় তখন দেহটাকে মাটিতে দাফন করা হয় কিন্তু আত্মা কখনও মরে না, আত্মা আল্লাহর দরবারে হাজির করা হয়।”
“আপনি যা বলছেন– তা এখানে উপস্থিত সবাই জানে। আমাদের মাথার উপর এখন যে মুসিবত চেপে বসেছে দয়া করে এ ব্যাপারে কথা বলুন!” বলল এক যুবক। “যেদিন থেকে চার-কুমারী দুর্গে দাউদ মেলা বসিয়ে জিন ও চারকুমারীর প্রেতাত্মাকে দেখাচ্ছে, সে দিনের পর থেকে দলে দলে মুসলমান দাউদের কারামাতী ধর্ম গ্রহণ করে ঈমান হারাচ্ছে। আমি একটি মসজিদে ইমামকে ওয়াজ করতে শুনেছি, কারামাতী ধর্ম সত্যধর্ম। কোন ভ্রান্ত মতাদর্শ যখন মসজিদে প্রভাব সৃষ্টি করে তখন সাধারণ মানুষ এটিকে সত্য বলেই গ্রহণ করতে শুরু করে।”
‘আপিন কি জানেন, হিন্দু পণ্ডিতেরা মন্দিরে পূজারীদেরকে বলছে, কারামাতী ধর্ম সত্যিকার ইসলামী ধর্ম। মৌলভীদের ধর্ম সঠিক নয়।’ বলল আরেক যুবক।
“ইমাম আর পণ্ডিত উভয়ে একই কথা বললেও কোন হিন্দুকে তুমি কারামাতী ধর্ম গ্রহণ করতে দেখবে না।” বললেন বুযুর্গ ব্যক্তি। “আমরা লোকদের একথা বলতে পারছি না যে, কারামাতী সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটি গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠী খৃস্টানদের সৃষ্ট। মহাভারতে এরা হিন্দু ও খৃস্টানদের সহায়তায় মুসলমানদের ঈমানহারা করতে মিশনারী কাজ করছে। বেঈমানদের অন্যতম একটি নীল নকশা হলো ইসলামের মোড়কে মুসলমানদের ঈমানহারা করতে গুনাহর কাজে জড়িয়ে ফেলা। কারামাতীদেরকে রীতিমতো হিন্দুরা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, যাতে মুলতানের কারামাতীদেরকে মুসলিম বলে সাধারণ মুসলিমদের ধোকা দিতে পারে।
ভাইয়েরা! মুসলমানদের বিরুদ্ধে জঘন্য চক্রান্ত শুরু হয়েছে। চার-কুমারী দুর্গের কারামাতী মুলতানের অর্ধেক মুসলমানকেই ঈমানহারা করে ফেলেছে। এখন আমাদের চিন্তা করতে হবে, কি করে আমরা এই জঘন্য চক্রান্ত রুখতে পারব। এখনও পর্যন্ত আমাদের কারো স্বচক্ষে দেখা হয়নি, চার-কুমারী দুর্গে আসলে কি ঘটছে।”
“যারা দেখে এসেছে তারা বলেছে, প্রত্যেক রাতেই চারকুমারী ও শিশুদের নাকি জীবন্ত করে দেখানো হয়।” বললেন আলেম। শোনা যাচ্ছে, একটি ধোয়ার কুণ্ডলী থেকে নাকি মেয়েগুলো দৃশ্যমান হয় আবার দেয়ার কুণ্ডলীতে হারিয়ে যায়। আমাদের কারও স্বচক্ষে ব্যাপারটি দেখে আসা উচিত। আমরা তো ওখানে যাচ্ছি না এসব আজগুবী ঘটনা আমাদের ধর্মের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে।”
“এ মুহূর্তে আমাদের করণীয় কি, এটা নির্ধারণ করতেই আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি।” বলল এক যুবক। “ওখানে যদি কোন ধোকা প্রতারণা কিংবা জাদুটোনার ব্যাপার ঘটান হয়ে থাকে তবে কারামাতীদের রহস্য আমরা ফাঁস করে দেবো।” যুবক তার সমবয়সী যুবকদের ইঙ্গিত করে বলল, “আমরা ইসলামের জনন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। ওখানে যদি আমাদের কোন সংঘাতের মুখোমুখি হতে হয় তবুও আমাদের ভয় নেই। আপনি আলেম-জ্ঞানী। আপনি আমাদের করণীয় কি সে সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা দিন।”
