ওদের পোশাক দেখেই বুঝতে পারছিলাম, এরা উদ্ধারকারী গজনীর সেনা নয় এবং মুসলমানও নয়। ওদের দেখে আমার কোন দুর্ঘটনার আশংকা হয়নি কিন্তু যখন দেখি, ওদের একজন তোমাকে মেরে ফেলতে তরবারী তুলেছে, কোন কিছু না ভেবে দৌড়ে এসে ওর মুখে মশাল দ্বারা আঘাত করলাম। কাসেম! এ আসলে আল্লাহ্র দারুণ মেহেরবানী। তোমার বেঁচে থাকাটা একটা বিস্ময়। তবে তোমাকে বেঁচে থাকতেই হবে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। কারণ তোমার কাজ এখনও শেষ হয়নি।”
দাউদ বিন নসর বিজি রায়ের পরাজয় সংবাদ পেয়ে কারামতী প্রাসাদ ছেড়ে মুহাম্মদ বিন কাসেমের সময়ে নির্মিত একটি দুর্গে আশ্রয় নেয়। দুর্গের ভেতরে বিশাল প্রাসাদ। প্রাসাদের অভ্যন্তরে বহু কক্ষ। প্রহরী, গোলামখানা, আস্তাবল, বিরাট আঙিনা, শানবাঁধানো পুকুর, সজ্জিত বাগান মোটামুটি একটি রাজপ্রাসাদ। এই দুর্গ সম্পর্কে জনশ্রুতি ছিল যে, মুহাম্মদ বিন কাসিমের পর যখন এলাকাটি হিন্দুরা দখল করে নেয় তখন অনেক শিশু ও নারীকে হত্যা করে এর একটি কক্ষে নিক্ষেপ করেছিল। এখন এই দুর্গটিতে জিন-ভূতের বসবাস এ কথা ছিল সব লোকের মুখে মুখে। বিশেষ করে লোকেরা বলাবলি করতো, ওই বাড়িতে হিন্দু দখলদাররা চার কুমারীকে চরম নির্যাতন করে হত্যা করেছিল। দুর্গের ভেতরে নিহত চার কুমারীর কান্না এখনো নাকি শোনা যায়। শিশুদের দৌড় ঝাঁপ, খেলাধুলা চেঁচামেচি এবং কোলাহলরত মানুষের কথাও নাকি মাঝে মাঝে শুনতে পাওয়া যায়।
এই দুর্গ সম্পর্কে মানুষের মনে এতো ভীতি ছিল যে, কেউ এর ধারে-পাশে যেতো না। কেউ কেউ বলতো, তারা দুর্গের ছাদের উপরে আগুন জ্বলতে দেখেছে। দেখেছে ভূত-পেত্নীর ঝগড়া-ফ্যাসাদ। ওখানে এখনো নাকি মৃতদের হাড়গোড় পড়ে রয়েছে।
যেদিন সুলতান মাহমূদ বেরা জয় করেন সেদিন মুলতানের এই চার-কুমারী দুর্গে ছিল মেলা। মুলতানের শাসক দাউদ বিন নসর কারামাতীদের ধর্মীয় নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সে মানুষের কাছে নিজেকে আল্লাহ্র বাস লোক ও পয়গম্বর বলে পরিচয় দিতো এবং নানা অলৌকিক কীর্তি জাহের করে সরল ও অল্পশিক্ষিত মানুষকে কারামাতী মতাবলম্বী করতে সচেষ্ট ছিল। এ সময়ে দাউদ বিন নসরের ভক্তরা দেশ জুড়ে একথা প্রচার করল যে, মুসলমানদের শাসক, কারামাতী ধর্মের নেতা, আল্লাহর ওলী দাউদ বিন নসর স্বীয় কারামাতীতে চার-কুমারী দুর্গের সকল জিন-ভূতকে বন্দী করে তার অনুগত বানিয়ে ফেলেছেন, যাতে এগুলো মানুষের কোন ক্ষতি করতে না পারে এবং মানুষ এই দুর্গের কাছে যেতে ভয় পায়। দাউদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা আরো প্রচার করল, চার-কুমারী দুর্গের জিন-ভূতেরা প্রতিদিনই একজন তাজা মানুষের রক্ত পান করতো, আল্লাহর বিশেষ রহমতে দাউদ নিজের কারামতী ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগুলোকে বন্দী করে রেখেছেন, যে কেউ ইচ্ছা করলে বন্দী জিন-পেত্নীদের দেখতে পারে।
সুলতান মাহমূদ বেরায় যে সময়ে নতুন সৈন্য ঘাটতি পূরণে ব্যস্ত এ সময়ে চার-কুমারী দুর্গে চলছে লোকমেলা।
এ আজব খবর শুনে দাউদের কারামতী দেখতে দলে দলে লোক সন্ধ্যার পরে চারকুমারী দুর্গে সমবেত হতে লাগল। দুর্গটিকে সাজানোও হলো নতুনরূপে। জায়গায় জায়গায় প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। দুর্গের প্রধান ফটক ও রাস্তার চারপাশে এমন তীব্র সুগন্ধী ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে, যারাই দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করছিল, দুনিয়া ভুলে মুগ্ধ বিমোহিত হচ্ছিল কিংবদন্তির দুর্গাভ্যন্তরের অবস্থা দেখে।
দুর্গের বহিরাঙ্গন অবিকল পূর্বের মতোই রেখে দেয়া হয়েছে। যেখানে দীর্ঘদিনের ময়লা আবর্জনা জমে ইঁদুর, মাকড়সা জাল বুনেছে, আর পলেস্তরা খসে খসে পড়ে গেছে। শুধু ভেতরের পরিবেশ আমূল বদলে বাড়ির উঠোনে বিশাল প্যান্ডেল টেনে রঙ-বেরঙের শামিয়ানা টাঙিয়ে রঙীন বাহারী বাতি জ্বালিয়ে এমন স্বপ্নিল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, সাধারণ মানুষ তা দেখে হতবাক।
প্যান্ডেলের মাঝখানে রাখা হয়েছে একটি বিরাট গালিচা। গালিচার উপর সিংহাসন। সিংহাসনটি মণি-মুক্তা হীরা জওহারে সজ্জিত। রঙীন আলোতে সিংহাসনের মণিমুক্তাগুলো তারার মতো ঝকমক করছিল। সাধারণ মানুষ অভূতপূর্ব এ দৃশ্য দেখে অপার বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে দাউদের অলৌকিক শক্তির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠছিল।
দু’চার দিনের মধ্যে সারা মুলতানে ছড়িয়ে পড়ল দাউদের কারামতী। লোকমুখে প্রধান আলোচ্য বিষয় চার-কুমারীর দুর্গ।
মানুষ বলাবলি করছিল, হাজার বছর আগে নিহত চার কুমারীকে দাউদ আবার লোকের সামনে জীবিত করে এভাবে দেখিয়েছে যে, তারা বাতাসে উড়ে এসে আবার বাতাসে মিলিয়ে গেছে। দর্শকেরা নাকি কিশোরীদের আওয়াজ ও শিশুদের কথাও শুনেছে।
দাউদের কারামতী মুলতানবাসীর মধ্যে এমনই প্রভাব ফেলল যে, কোন কোন মসজিদের ইমাম জুমআর দিনের বক্তৃতায় পর্যন্ত দাউদের কারামাতী উল্লেখ করে বক্তৃতা করতে শুরু করে। তারা দাউদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। হিন্দুদের মন্দিরগুলোতে পণ্ডিতেরা দাউদের কারামতাঁকে সত্য বলে প্রচার করছে। হিন্দু পণ্ডিতরা শিষ্য-পূজারীদের বলছে, আসলে কারামতী ধর্মই আসল ইসলামী ধর্ম। মোল্লারা শুধু শুধু মানুষের মধ্যে নেক ও পাপের প্রাচীর সৃষ্টি করে ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে। এসব আসলে মিথ্যা। মানুষের জৈবিক চাহিদা সৃষ্টিকর্তার দেয়া। সে দুনিয়াতে তার ইচ্ছা ও সাধ্যমতো যা কিছু করার তাই করতে পারে। এতে কোন পাপবোধের কারণ নেই।
