“আমার কার্যক্রম সম্পর্কে আপনি কোন তথ্য জানতে পেরেছেন?” রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করল কাসেম।
“পেশোয়ার থেকে আসার পথে সিন্ধুনদ পার হওয়ার জন্য যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তখন আমি সেনাধ্যক্ষ আবু আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কাসেমের সংবাদ কি? তিনি বললেন, কাসেম দারুণ সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে। আমি তাকে বললাম, আমার আসার খবরটি যেন কাসেম জানতে না পারে। কেননা সে আমার আসার সংবাদ পেলে তার মন এদিকেও ঝুঁকতে পারে, তাতে যুদ্ধের মনোযোগ নষ্ট হবে।”
রাবেয়া আরো জানাল, “যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে রসদসামগ্রী বহরের সাথে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যুদ্ধে কি হচ্ছে এ সংবাদ আমরা পাচ্ছিলাম না। তিন দিন টানা যুদ্ধ চলল, আমাদের কাউকেই এদিকে আসতে দেয়া হলো না। একদিন খবর পেলাম, যুদ্ধের অবস্থা সঙ্গীন। হয়তো আমাদের পশ্চাদপসরণ করতে হতে পারে। একথা শুনে সব মহিলা লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হল। কারো কাছেই তোমার কোন সংবাদ আমি পাচ্ছিলাম না। আমরা সবাই নামায পড়ে বিজয়ের জন্যে দুআরত ছিলাম। এমতাবস্থায় আজ দুপুরে আমাদের সংবাদ জানানো হলো, আমাদের বিজয় হয়েছে। কিন্তু আমাদের ক্ষতি হয়েছে প্রচুর। হতাহতের সংখ্যাই বেশি। সারা ময়দান জুড়ে লাশ আর লাশ। জখমীদের তুলে আনার মতো পর্যাপ্ত লোকেরও অভাব। আমাদেরকে এখানকার চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ডাক্তাররা ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে দিতো, মহিলারা ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধতে, আহতদের ওষুধ খাওয়াতো, পানি পান করাতো।
একের পর এক আহত যোদ্ধাকে সেবাকেন্দ্রে আনা হচ্ছিল আর তাদের গায়ের রক্ত পরিষ্কার করে ক্ষতস্থানে ওষুধ দেয়া হচ্ছিল। অনেকের চেহারা পুরোটাই রক্তে মাখা ছিল, অধিকাংশই ছিল মরণাপন্ন, বেহুশ। কয়েকজন তো সেবাকেন্দ্রে এসে মারা গেছে। আমি আহতদের দেহ থেকে রক্ত পরিষ্কার করছিলাম। কাজের ফাঁকে চেতনাজ্ঞানসম্পন্ন অনেকের কাছে আমি জিজ্ঞেস করেছি তোমার কথা। অনেকেই অজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। মাত্র তিনজন তোমাকে দেখেছিল বলেছে কিন্তু সবাই এ কথাই বলেছে, তার দল যেদিকে গিয়েছিল ওইদিক থেকে খুব কম লোকই ফিরে এসেছে।
বেলা ডুবে যাওয়ার পর তোমার দলের একজন আহতকে আমি পেয়েছি। সে আমাকে বলল, কাসেম বিন ওমর যদি এখনো এখানে না এসে থাকে তবে সে হয়তো মারা গেছে। আমার সামনেই কাসেম আহত হয়েছিল। লোকটি আরো বলল, সম্ভবত আমাদের ইউনিটের মধ্যে আমি একাই বেঁচে এসেছি। কাসেম ছিল আমাদের ইউনিট কমান্ডার। যুদ্ধের পরিস্থিতি এমন ছিল যে, যেন হিন্দুরা আমাদের খতম করেই নিঃশ্বাস নেবে। সুলতানের সরাসরি কমান্ডে যখন শেষ হামলার নির্দেশ হলো– তখন প্রধান সেনাপতি কাসেমকে বললেন, “কাসেম। রাজার পতাকাটিকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তিনি আমাদেরকে রাজার রক্ষণভাগে আক্রমণ করতে নির্দেশ দিলেন। সেনাপ্রধান বলেন, কাসেম! রাজার কাণ্ড গুঁড়িয়ে দিতে পারলে যা পুরস্কার চাইবে তাই দেয়া হবে। বিদায়ের সময় মনে হচ্ছিল, সেনাপ্রধান আমাদের শেষ বিদায় জানাচ্ছিলেন।”
আহত যোদ্ধা আরো বলল, শেষ পর্যায়ে কাসেম এতোই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল যে, হয় সে রাজার ঝাণ্ডা গুঁড়িয়ে দেবে না হয় নিজেই শেষ হয়ে যাবে। আখেরী আক্রমণে আমরা ছিলাম বেপরোয়া। কাসেমের উদ্দীপনা আমাদের সবাইকে পাগল করে তুলেছিল। মৃত্যু আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম। জীবন-পণ আঘাত হানলাম। রাজার ঝাণ্ডাকে আক্রমণ করে তছনছ করে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আমাদের কেউ আর অশ্বপৃষ্ঠে বসে নেই, সবাইকে শত্রুসেনারা আহত করে ফেলেছিল। আমার বিশ্বাস, এখনও পর্যন্ত যদি তাকে এখানে না দেখা যায় তবে সে আর জীবিত নেই।
এরপর আমি সেবাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়লাম। পথে একটি পড়ে থাকা মশাল উঠিয়ে হাতে নিলাম। ময়দানে এসে আমি হতবাক। কখনও রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখিনি। আর এখানকার মৃতদেহ দেখে মনে হলো যেন জঙ্গল কেটে অসংখ্য গাছ ফেলে রাখা হয়েছে। প্রতিটি লাশকেই আমি গভীরভাবে দেখছিলাম। প্রতিটি আহতের কুঁকানী শুনে দৌড়ে যেতাম। প্রত্যেকটি হিন্দু মরদেহ দেখে আমার মধ্যে প্রশান্তি আসতো কিন্তু মুসলমান যোদ্ধার মৃতদেহ দেখামাত্র চোখে পানি এসে পড়তো। এভাবে দেখতে দেখতে অনেক সময় চলে গেল। আহতদেরকে চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোর কাজ চলতে লাগল।
এক পর্যায়ে তোমাকে ডাকতে শুরু করলাম আমি। কেমন যেন হয়ে গেলাম। তোমার মায়ের আত্মা বুঝি আমার বুকে এসে ঢুকেছিল। সজোরে চিৎকার শুরু করে দিলাম তোমার নাম ধরে। উদ্ধারকারীদের অনেকেই বলল, ‘আপনি ফিরে যান, এখানে কাসেমকে পাওয়া যাবে না। কারো কথায় আমি স্বস্তি পেলাম না। সারা ময়দান দেখে দেখে এদিকে চলে এলাম যেখানে মরদেহ চোখে পড়ছে কম। তোমাকে না পেলে সারারাত তোমাকে খুঁজেই ফিরতাম। দিনের আলোতে তোমার লাশ উদ্ধার করে তবেই আমি ঘরে ফিরতাম।
যাকেই পেতাম তোমার কথা জিজ্ঞেস করতাম। এমন সময় দৃষ্টি পড়ল দুটি মশালের দিকে। আমি ছিলাম ওদের পিছনে। আমি এগিয়ে গেলাম ধীরে ধীরে। ইচ্ছা ছিল ওদের কাছে তোমার কথা জিজ্ঞেস করব। কিন্তু কিছুটা দূরে থাকতেই মশালের আলোয় তোমার চেহারা চিনে ফেললাম আমি। তখন তুমি বসেছিলে । আমি তোমাকে দেখলেও তুমি কেন আমাকে দেখতে পেলে না আমি বুঝতে পারছিলাম না।
