দূরের উদ্ধারকারী লোকেরা যখন একটি মানুষকে জ্বলতে দেখল এবং শুনতে পেল আর্তচিৎকার, তখন তাদের একজন এদিকে দৌড়ে এল। তারা এসে দেখতে পেল রাবেয়া ও আহত কাসেমকে। আর অদূরে ছটফট করছে ঝলসে যাওয়া দু’বেঈমান। এরা ছিল গজনীর সেনাসদস্য। কাসেম ও রাবেয়া পূর্বাপর ঘটনা জানাল সৈন্যদের। ইতিবৃত্ত শুনে সৈন্যরা ঘাতকদের পাশে গেল। এদের একজনের অবস্থা করুণ। অপর ঘাতকের চোখ-মুখ ঝলসে গেছে, কথা বলার শক্তি আছে ওর। গজনীর উদ্ধারকারী দলের এক কমান্ডার ওর বুকে তরবারী রেখে ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলল, “তোরা কারা? কোত্থেকে এসেছিস? বল, কেন ওকে হত্যা করতে চাচ্ছিলি? নইলে এই তরবারী তোর পেটে ঢুকিয়ে দেবো।”
বেঈমান ঘাতক মুজাহিদের হুংকারে সবই বলতে শুরু করল। বলল, “আমরা বড় পণ্ডিতের আজ্ঞাবহ। তার নির্দেশে আমরা মুসলমান আহতদের হত্যা করতে ময়দানে এসেছি। দু’জনে এর আগে তেরজনকে হত্যা করেছি, এ লোকটি ছিল আমাদের চৌদ্দতম শিকার।”
ভয়াবহ এই সংবাদ শুনে উদ্ধারকারী গনী বাহিনীর লোকেরা ময়দানের সর্বত্র তল্লাশী শুরু করল। তারা এ ধরনের বহু ঘাতককে গ্রেফতার করল ময়দান থেকে। তৎক্ষণাৎ হিন্দুদের বাধা দেয়া হল ময়দানে প্রবেশ করতে। বিদ্যুৎগতিতে বড় মন্দিরের প্রধান পণ্ডিতকে গ্রেফতার করা হল। কাসেম বিন ওমরকে নিয়ে আসা হল চিকিৎসা কেন্দ্রে।
* * *
গজনীর সেনাবাহিনী যখন পেশোয়ার থেকে মুলতানের পথে রওয়ানা হয় তখন কয়েকজন অধিনায়ক ও কমাণ্ডারের স্ত্রীও কাফেলার সাথে ছিলেন। রসদসামগ্রীর কাফেলার সাথে থাকতো তাদের বহনকারী পালকী। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্ত্রী ছাড়াও আরো কয়েকজন মহিলা ছিলেন সেই কাফেলায়। সেইসব অভিজাত মহিলাদের প্রধান কাজ ছিল সেবা ও অসুস্থ রোগীদের দেখাশোনা করা। অন্যান্য যুদ্ধে আহতদের সেবা যত্ন সৈনিকরাই করতো, কিন্তু এই যুদ্ধের গুরুত্ব ও সার্বিক পরিস্থিতি অনুধাবন করে মহিলাদের সঙ্গে আনা হলো, যাতে সৈনিক স্বল্পতায় আহতদের সেবার কাজে তারা সহযোগিতা করতে পারে।
“তোমার আম্মা শুরুতে আমাকে আসতে দিতে চাচ্ছিলেন না। তার কাছেই আমাকে থাকতে বলেছিলেন।” ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করায় কিছুটা সুস্থানুভব করার পর কাসেমের পাশে বসে বলছিল রাবেয়া। তবে তোমাদের রওয়ানা হওয়ার সময় তোমার আম্মা আমাকে বললেন, “এবারের অভিযানে কিছু সংখ্যক মহিলা সাথে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে। আমি তাকে অনুরোধ করলাম, আপনি আমাকেও কাফেলায় শরীক হওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। জানি না তিনি কার সাথে বলে আমাকে কাফেলায় শরীক হওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।”
“আমি তোমার মাকে বললাম, সুলতানের এক গাদ্দার সেনাধিনায়কের অপকর্ম ফাঁস করে দিয়ে আমি সুলতান ও সুলতানের সেনাবাহিনীকে ভয়ংকর পরাজয় থেকে বাঁচাতে সাহায্য করেছি। আপনি যদি এর পুরস্কার দিতে চান, তবে আমাকে যে করেই হোক যুদ্ধ কাফেলার সাথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। আমার ভেতরে যে কষ্ট ও দুঃখের আগুন জ্বলছে তা সেই দিন নিভাতে পারবো, যেদিন সুলতান সুলতান জয় করবেন, আর আমি আমার বেঈমান বাপকে নিজের হাতে খুন করবো। দাউদ বিন নসরের পাপের প্রাসাদ নিজের হাতে আমি গুঁড়িয়ে দেবো, ওখানে কেয়ামত ঘটিয়ে ছাড়ব।
তোমার মা আমার কথা শুনে বললেন, বোন! আমার ভেতরেও তো আগুন কম নয়। যুদ্ধে যেতে আমারও ইচ্ছে করছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত হয়েছে, স্বামী ছাড়া কোন মহিলাকে কাফেলার সাথে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে না। কথা বলতে বলতে তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল। তিনি বললেন, তুমি যাও, আমার একমাত্র ছেলে অগ্রণীদলের কমান্ডার হয়ে যাচ্ছে। আশা করি আমার ছেলে যুদ্ধক্ষেত্রে কখনও পিছপা হবে না। ওর মাথা থেকে শরীর আলাদা না হওয়া পর্যন্ত ও মৃত্যুবরণ করবে না। আমি ওকে সাহস দিয়ে বলেছি, তুমি জীবিত আমার কাছে ফিরে এলে আমি খুশি হবো। কিন্তু তোমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমি যুদ্ধজয়ের সুসংবাদ চাই। বোন রাবেয়া! মুখে যাই বলি না কেন, আমি তো মা, যখন ভাবি রণাঙ্গনে পানি… পানি… করে আমার পুত্র মারা যাচ্ছে তখন হৃদয়টা ভেঙ্গেচুরে খান খান হয়ে যায়। তখন আর সাহস থাকে না। কিন্তু পুত্র কাসেম নয়, আমি একজন মুজাহিদের মা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেই। মুজাহিদরা মরতেই যুদ্ধ করে, বাঁচতে নয়। বেঈমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মরণেই মুজাহিদের সফলতা। ভাবি, আমার উদর থেকে জন্ম নেয়া এ মুজাহিদ আমার নয়, এ আমার কোলে আল্লাহর আমানত মাত্র। আল্লাহ্ যখন ইচ্ছা করেন তখনই আমানত ফিরিয়ে নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে আমার দুঃখ করা অনুচিত। তখন মনটা শান্ত হয়, দুঃখ কিছুটা লাঘব হয়।”
“তোমার আম্মা আমাকে হাত ধরে বললেন, রাবেয়া! তুমি আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও। আহতদের খুঁজতে গিয়ে সবার আগে তুমি আমার ছেলেকে খুঁজবে। ওর মুখে পানি দেবে। তুমি আমার প্রতিচ্ছবি হয়ে মায়ের ভূমিকা পালন করবে। রাবেয়া! তোমার কোন সন্তান নেই। সন্তানের মমতা দিয়ে ওর প্রতি যত্ন নিও তুমি। উপরে আল্লাহ্ আর নিচে তোমার কাছে আমি পুত্রকে সোপর্দ করলাম…।
কাসেম! তোমার আম্মা আমাকে এও বলেছিলেন- রাবেয়া! তোমার কাছে যদি এমন সংবাদ আসে, আমার ছেলে যুদ্ধক্ষেত্রে পিঠ দেখিয়েছে বা মোকাবেলা করা থেকে পালিয়ে ছিল, তাহলে তরবারী, বর্শা কিংবা খঞ্জর দিয়ে তুমিই ওকে খুন করে ফেলো। মনে করো, আমার স্বামী গাদ্দার ছিল ওর ঔরসজাত সন্তানও গাদ্দারই হয়েছে। গাদ্দারকে শেষ করেছে ওর বীজও শেষ করে দিবে। ও এমন করলে বাকী জীবনটা কোন পীর বুযুর্গের উঠোন ঝাড়ু দিয়ে কাটিয়ে দেবো।”
