পণ্ডিত গম্ভীরকণ্ঠে বলল, “শহরের হিন্দু-মুসলমান নারী-পুরুষ সবাইকে নিজেদের নিহত আত্মীয়-স্বজনকে তুলে এনে সৎকার করতে এবং আহতদের সেবাকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।”
“তোমরা জলদি ময়দানে চলে যাও। সবাই মশাল সাথে নিবে, আর সাথে রাখবে খঞ্জর অথবা একটি ছোট্ট কুড়াল। মুসলমানরা বিজয়ী হলেও অর্ধেকের বেশি সৈন্য আহত হয়েছে। যেসব মুসলিম সৈন্য আহত অবস্থায় ময়দানে পড়ে আছে তারা যদি চিকিৎসা কেন্দ্রে এসে সুস্থ হয়ে ওঠে তবে ওরা আমাদের জন্যে বিপদ আরো বাড়াবে। শত শত মুসলিম যোদ্ধা ময়দানে আহত অবস্থায় পড়ে আছে। তোমরা ওদের দেখেই বুঝতে পারবে। ওদের মধ্যে যারা দাঁড়াতে পারে না তাদেরকে তোমরা কুড়ালের আঘাতে ওখানেই শেষ করে দেবে।”
“শহরের সব হিন্দুকে এ সংবাদ বলার দরকার নেই। বেশি বলাবলি করলে কোন সুবিধাভোগী আমাদের পরিকল্পনা ফাঁস করে দিতে পারে। নারী-পুরুষ সবাই যাও, সকাল পর্যন্ত যতো পারো শক্রদের বধ করে। আমাদের দেশমাতা ও দেবীকে খুশি করতে হলে এ কাজ আমাদের করতেই হবে। যাও, যত জলদি পারো সবাই কাজে লেগে যাও।”
কাসেম যে জায়গায় আহত হয়ে পড়েছিল সেখানটায় হতাহত লোক কম। আহতদের আহাজারীও নেই। তাই এখনো এদিকে উদ্ধারকারীদের কেউ আসেনি। এতোক্ষণ পর্যন্ত কাসেম…কাসেম… যে ডাক শোনা যাচ্ছিল তাও আর শোনা যাচ্ছে না। উদ্ধারকারীর আগমন আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল। নিজের জীবন নিয়ে কাসেমের ভাবনা ছিল না, তার প্রত্যাশা ছিল সে সুলতান ও সেনাপ্রধান আবু আব্দুল্লাহর সামনে হাজির হয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করবে, “আমার পিতার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কি আমি করতে পেরেছি। তার মা’কে জানাবে, মা! তোমার আশা কি এখন পূর্ণ হয়েছে।”
দূরে দূরে অনেক মশাল ঘুরতে দেখছে কাসেম। কিন্তু সবাই ওদিকেই ব্যস্ত। তার এ দিকটায় কেউ আসছে না। হতাশায় কাসেমের শরীর অবশ হয়ে আসছিল। তার পক্ষে এক কদম অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। পা দুটোয় কোন শক্তি নেই। প্রচুর রক্তক্ষরণে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।
এমন সময় বড় দুটো মশালকে এদিকে আসতে দেখে আশ্বস্ত হলো কাসেম। মাথাটা উঁচু করে তাকিয়ে রইল মশাল দুটোর দিকে। খুব কষ্ট করে মাথাটা সোজা করে বসল মশাল দুটোর আসার অপেক্ষায়। আর ভাবল, এরা হয়তো আমাদেরই কেউ হবে। আবারো তার কানে ধ্বনিত হলো সেই ডাক… কাসেম …!কাসেম…! জীবিত থাকলে আমার ডাকে সাড়া দাও!”
হায়! কাসেমের যে সেই দরদী ডাকে সাড়া দেয়ার শক্তি নেই, শত ইচ্ছে থাকার পরও তার কণ্ঠ থেকে কোন আওয়াজ বেরুচ্ছে না। বুকে বুকে, জায়গায় জায়গায় থেমে থেমে মশাল দু’টো এগিয়ে আসছিল কাসেমের দিকে। স্পষ্ট বুঝতে পারছিল কাসেম, লোক দুটো থেমে থেমে মরদেহ দেখছে। ভাবতে ভাবতে মশালধারী লোক দুটো একে অন্যের গা ঘেষে এসে দাঁড়াল কাসেমের সামনে। তাদের হাতে মশাল জ্বলছে।
লোক দু’টোর অনুচ্চ বাক্যালাপ শুনতে পেল কাসেম একজন সাথীকে বলছে, “মুসলমান! সাংঘাতিক ঘাড় ত্যাড়া, আমাদের সহ্যই করতে পারে না…।”
“হ্যাঁ। আমি মুসলমান। খুব ক্ষীণকণ্ঠে জানাল কাসেম। আমাকে বিজয়ের সুসংবাদটি জানাতে পার! মনে হয় তোমরা এখানকার বাসিন্দা। তোমরা আমার ভাষা বলতে পার না জানি। কিন্তু আমি তোমাদের কথা বুঝতে পারি বলতেও পারি।”
এদের একজন অপরজনের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপাত্মক হাসল। কোমর থেকে খঞ্জর বের করল একজন। ক্ষুব্ধকণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ সুসংবাদটি তোমাকে আমি এই খঞ্জরের ফলা দিয়ে শুনিয়ে দিচ্ছি।”
কথা শেষ না করেই খঞ্জর চালাতে উদ্যত হলো লোকটি। কাসেম নিরুপায়। প্রত্যাঘাত তো দূরে থাক আত্মরক্ষার জন্যে একটু নড়ার শক্তিও তার নেই। কাসেমের জীবন ও মৃত্যুর মাঝে মাত্র মুহূর্তের ব্যবধান। কয়েক পলকের মধ্যেই কাসেমের বুকটা এফোড় ওফোড় হয়ে যেতো, যদি না খঞ্জরের আঘাত প্রতিহত হতো। যেই মশালধারীর খঞ্জর কাসেমের বুকে আঘাত হানতে নেমে আসছে কোত্থেকে বিজলীর মতো একটি মশাল এসে আঘাত হানে ঘাতকের মুখে। একটা চিৎকার দিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে ঘাতক। তার চকচকে খঞ্জরটা ছিটকে পড়ে দূরে। মশালটিও পড়ে যায় ওর হাত থেকে।
এরা মৃতপ্রায় কাসেমকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। এর আগে তেরজন আহত মুজাহিদকে এরা হত্যা করে এসেছে। এদের চৌদ্দতম শিকার ছিল কাসেম। সামান্য দূর থেকে রাবেয়ার নিক্ষিপ্ত মশালের আঘাত উদ্যত খঞ্জরের আঘাত থেকে রক্ষা করেছে কাসেমকে। মশালের আলোয় কাসেম দেখতে পেল, মুখ থুবড়ে পতিত ঘাতকের মশালটি হাতে তুলে নিয়েছে রাবেয়া। সংহারী মূর্তি ধারণ করে মোকাবেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে রাবেয়া। এ সেই রাবেয়া। যে রাবেয়া ফেরারী হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসেম বিন ওমরের ফাঁদ ও দাউদ বিন নসরের চক্রান্ত সম্পর্কে আগাম সংবাদ দিয়েছিল সুলতানকে। এই সেই রাবেয়া যার সত্য সাক্ষ্যর কারণে আত্মহত্যা করেছে সেনাপতি আসেম। যার কারণে ধ্বংসের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছেন সুলতান ও তার সেনাবাহিনী। পিতার সেই হন্তা, পুত্র কাসেমের জীবনদাত্রী হয়ে দেখা দিল যুদ্ধের ময়দানে।
এক ঘাতকের আঘাত থেকে রাবেয়ার নিক্ষিপ্ত মশালে বেঁচে গেল কাসেম। কিন্তু ঘাতক রয়ে গেছে আরেকজন। ওর সাথী রাবেয়ার উপস্থিতি দেখে কুড়াল উত্তোলন করল মোকাবেলার জন্যে। ঘাতক দেখল, এক যুবতী রুদ্রমূর্তি ধারণ করে মশাল হতে দাঁড়িয়ে। ওর হাতে কোন অস্ত্র নেই। কাসেম আহত। তার পক্ষে মোকাবেলা করা অসম্ভব। উপরন্তু রাবেয়া জীবনে কোনদিন খঞ্জর ধরেনি। হাতের মশালটি ছিল তার একমাত্র ভরসা। কাসেমের জীবন সংহারে উদ্যত ঘাতকের মুখের দিকে তাই হাতের মশালটিই ছুঁড়ে মেরেছিল। অব্যর্থ লক্ষ্য। মশালটি আঘাত হানে ঘাতকের মুখে। চোখ মুখ ঝলসে যায় ঘাতকের। দূরে ছিটকে কুঁকাতে থাকে। ওর সাথী রাবেয়াকে দেখে ওকেই আগে বধ করতে আঘাত হানতে উদ্যত হলো । মশাল দিয়েই প্রতিরোধে লিপ্ত হলো রাবেয়া। অবস্থার আকস্মিকতায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় মুহূর্তে এক পায়ে দাঁড়িয়ে গেল কাসেম। তবে নড়তে পারল না এক কদমও। রাবেয়া আর ঘাতকের মধ্যে চলছে। সংঘাত। কৌশলী যোদ্ধার মত হাতের মশাল দিয়ে প্রতিরোধ করছে রাবেয়া। মৃতপ্রায় কাসেম এই সঙ্গিন অবস্থা দেখে স্থির থাকতে পারল না। তার মৃতপ্রায় শরীরে জেগে উঠল মুজাহিদের সত্তা। কোমর থেকে সে বের করে নিল খঞ্জর। খ র হাতে নিয়ে সুযোগের অপেক্ষা করছিল। যেই না ঘাতক কাসেমের দিকে ফিরল, মশালের আলোতে দেখে ওর পেট বরাবর নিক্ষেপ করল খঞ্জর। লক্ষ্যভেদী নিশানা। খঞ্জরটি আমূল বিদ্ধ হলো দুশমনের পেটে। খঞ্জর বিদ্ধ হয়ে ঘুরে গেল বেঈমান। যেই ঘাতক পিঠ ফেরাল অমনি রাবেয়া মশাল ঠেকিয়ে দিল ওর কাপড়ে। জ্বলে উঠল ঘাতকের পরিধেয় বস্ত্র। চকিতে আবার এদিকে তাকাল দুশমন, অমনি আবার রাবেয়া ওর মুখে ঠেসে ধরল মশাল। বাঁচার জন্যে দিগ্বিদিক জ্বলন্ত কাপড় নিয়ে দৌড়াতে শুরু করল ঘাতক। কিছুদূর গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।
