লোকটি বলল, তুমি মুসলমান, তোমার হাতে আমি পানি পান করব না।
কাসেম অবাক হলো। এতো ঘৃণা ওদের মনে! মরার সময়ও লোকটি মুসলমানের হাতে পানি পান করতে রাজি হচ্ছে না! মুসলমানদের কত ঘৃণা করে এরা!
তাহলে তোমার ভগবানকে ডাক। ভগবান পানি নিয়ে আসে কিনা দেখ। আমরা আল্লাহর নামে যুদ্ধ করি। এজন্য যুদ্ধের সময় আমাদের কোন ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভূত হয় না। তিনদিন ধরে আমরা ক্ষুধা-পিপাসা ভুলে যুদ্ধ করেছি, আমাদের কোন তৃষ্ণা নেই। আল্লাহ্ আমাদের বুক চির-প্রশান্তিতে ভরে দিয়েছেন।
এবার হিন্দু সৈন্যটি হাত বাড়িয়ে মশকটি ধরতে চেষ্টা করল, কাসেম মশকটি ওর মুখে ধরল, লোকটি এক নিঃশ্বাসে আধা মশক পানি গলাধঃকরণ করল।
যুদ্ধের ফলাফল কি হয়েছে, তুমি কি কিছু জান? লোকটিকে জিজ্ঞেস করল কাসেম।
আমি সাধারণ সৈনিক নই। দু’শ সৈনিকের কমান্ডার আমি। আমাদের রাজার মৃত্যুর পর আহত হয়েছি আমি।
আমাদের সুলতান কোথায়? বলতে পার।
সম্ভবত শহরে …। শোন। মৃত্যুকালে তুমি আমাকে পানি পান করিয়েছে। আমি তো মরেই যাবো, তোমাকে একটা সত্যকথা বলে যাচ্ছি। আমাদের জাতিকে কখনও বিশ্বাস করো না। মুসলমানদের ধ্বংস করা আমাদের ধর্মের শিক্ষা। আমরা বহু মুসলমানকে ধোকা দিয়ে আমাদের অনুগত করে রেখেছি। আমাদের পণ্ডিতেরা সব সময় বলেন, মুসলমানরা আমাদের চিরশত্রু। ওদের শেষ করাই আমাদের ধর্ম। আমরা আমৃত্যু মুসলিম জাতির বিনাশে সব রকম চেষ্টা করে থাকি। এ যুদ্ধে আমাদের পরাজয় হলেও যুদ্ধ থেমে থাকবে না। যতোদিন দুনিয়াতে একটি হিন্দুও বেঁচে থাকবে, সে চেষ্টা করবে মুসলমানকে ধ্বংস করতে। এটা আমাদের ধর্ম, এটা আমাদের ধর্মের নির্দেশ।
হিন্দু সৈনিকের কথা শুনে কাসেমের চেতনা আরো জেগে উঠতে লাগল। কথা বলতে বলতে হিন্দু সৈনিকটির যবান আড়ষ্ট হয়ে গেল, কিছুক্ষণ পর ওর আওয়াজ থেমে গেল। একটা হেচকি দিয়ে অসার ও নীরব হয়ে গেল লোকটি।
সুলতান মাহমূদ যখন বিজয়ী বেশে বেরা শহরে প্রবেশ করেন, শহরের ছোট বড় আবাল-বৃদ্ধ সকল মুসলমান তাকে স্বাগত জানানোর জন্যে শহর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। সকলের মিলিত তকবীর ধ্বনিতে বেরার আকাশ পেয়েছিল নতুন আবহ। কেউ কেউ আনন্দের আতিশয্যে শুয়ে পড়েছিল সুলতানের ঘোড়ার সামনে। মুসলমানদের আনন্দে আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন সুলতান। দীর্ঘদিন পর প্রাণ ফিরে পেয়েছে এখানকার মুসলমান জনসাধারণ। কিন্তু মুসলমানদের পাংশু চেহারা দেখে সুলতানের মন বিজয়ের আনন্দে নেচে উঠার বদলে বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেল। ওদিকে বেরার হিন্দুরা ছেলে-পেলে, স্ত্রী-সন্তান আর ঘাটুরী-পেটারা মাথায় নিয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল।
সুলতানের দৃষ্টি পড়ল ওদের উপর। গম্ভীর হয়ে গেলেন তিনি। বললেন সেনাধিনায়কদের, “ফেরাও ওদের। কোথায় যাচ্ছে এরা। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাতের অন্ধকারে বাড়িঘর ফেলে এরা কোথায় যেতে চাচ্ছে” গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, “ঘোষণা করে দাও, আমরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শহরের কোন অধিবাসীকে তাড়াব না, কারো বাড়িঘর লুট করবো না, আগুন ধরাব না। কারো ইজ্জতের উপর আক্রমণ করবো না। ওদের জলদি ফেরাও…! বল, যারা শহরে আছে তারা যেন তাদের পরিচিতজনদের লাশ এনে সক্কার করে এবং আহতদের চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়। আহত সবাইকে ময়দান থেকে তুলে আনার মতো জনবল নেই আমাদের। তারা ইচ্ছে করলে এ কাজের জন্য মহিলাদেরকেও ময়দানে নিয়ে যেতে পারে।”
সুলতানের নির্দেশে শহরত্যাগী হিন্দুদের ফিরিয়ে আনা হল। যারা গমনদ্যোত ছিল তাদেরকে অভয় দেয়া হল। সুলতানের অভয়বাণী প্রচার করা হলো শহরের সর্বত্র। বলা হলো, শহরের বাসিন্দাদের সাথে সুলতানের কোন বিরোধ নেই, তাদের সাথে তার কোন সংঘাত নেই। বিরোধ-সংঘাত ছিল রাজার সাথে এবং সংঘাত হয়েছে রাজার সেনাবাহিনীর সাথে। সাধারণ নাগরিকরা সম্পূর্ণ দোষমুক্ত।
হিন্দু-মুসলমান সকলকে লাশ তুলে আনতে বলা হলো। মুসলমানরা সুলতানের সহযোদ্ধাদের মৃতদেহ ও আহতদের তুলে আনার জন্য ময়দানের দিকে ধাবিত হলো। তাদের সেবা-শুশ্রূষা এবং চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্যে দলে দলে লোক মশাল হাতে বেড়িয়ে পড়ল।
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর শহরের প্রধান মন্দিরের বড় পণ্ডিত কয়েকজন সেবাদাসকে শহরে পাঠিয়ে বহু বিশ্বস্ত হিন্দুকে মন্দিরে ডাকাল। পণ্ডিতের সংবাদ পেয়ে বহু সংখ্যক হিন্দু মন্দিরে জড়ো হল। আজ মন্দিরে শঙ্খ বাজছে না। ওদের চোখে আজ মূর্তিগুলোর চেহারা যেন স্নান দেখাচ্ছে। সরস্বতীর চেহারায় হাসি থাকলেও তারা মনে করলো, পূজারীদের ব্যর্থতায় সে বিদ্রুপের হাসি হাসছে। সারা মন্দির জুড়ে নীরবতা। শোকের ছায়া।
বড় পণ্ডিত কোন শ্লোক না আওড়িয়ে গল্পীরকণ্ঠে সমবেত পূজারীদের বলল, “আমাদের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়েছে, রাজা মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু আমরা এখনও জীবিত। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার এক সুযোগ এসেছে। সুলতান আমাদেরকে শহরে থাকার অনুমতি দিয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বাহিনী আমাদেরকে হয়রানী করবে না। তারা আশ্বাসও দিয়েছে, কোন ধরনের লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটবে না, কারো উপর অত্যাচার উৎপীড়ন করা হবেনা।
তারা যদি শহর লুটের ইচ্ছা করতো, শহর ধ্বংস করতে চাইতো, তাহলে এতোক্ষণে সারা শহর জ্বলে উঠতো। আমরা এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারি। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পারি। রাতের অন্ধকারে খুব সহজেই কাজটি সমাধা করতে পারি।
