তখনও কাসেমের ক্ষতস্থান দিয়ে অঝোর ধারায় খুন ঝরছে। এই স্মৃতিগুলো কাসেমের অনুভূতিকে জাগিয়ে দিল চরমভাবে। মায়ের প্রতিটি কথা তার কানে অনুরণিত হচ্ছে। আনচান করে উঠল কাসেমের আহত হৃদয়। হায়! কোথায় আছি আমি! মায়ের কাক্ষিত বিজয় কি অর্জিত হয়েছে। আমি কি বাবার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে পেরেছি। সুলতান কোথায় কোথায় আছেন সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ আমার সাথীরা কেমন আছে তারা সবাই গ্রেফতার হয়নি তো সুলতান কি পশ্চাদপসরণ করেছেন। বেরা দুর্গকি দখলে এসেছে। আমার তরবারী মায়ের কাছে কে পৌঁছাবে? কে তাকে বলবে, তোমার ছেলে এই তরবারী দিয়ে শত নয় হাজারো দুশমনকে মৃত্যুর স্বাদ দেখিয়েছে। এতেও কি তোমার আত্মা শান্তি পাবে না। এমন হাজারো প্রশ্ন আহত কাসেমের কষ্ট আরো বাড়িয়ে তুলছে।
কাসেমের জানার উপায় ছিল না, সুলতান বিজয়ী হয়েছেন। এখন তিনি বিজি রায়ের রাজমহলে বসে অধিনায়ক ও কমান্ডারদের কাছ থেকে সর্বশেষ পরিস্থিতির রিপোর্ট নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানে ব্যস্ত রয়েছেন। অপর দিকে বিজি রায় নিজের তরবারী দিয়েই আত্মহত্যা করেছে।
যুদ্ধের পরিণতি চিন্তায় তার মন অস্থির হয়ে উঠল। জখমের যন্ত্রণা ভুলে গেল সে। উঠে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু তার হাত-পায়ের একটিও অক্ষত নেই। তরবারী আর বর্শার আঘাতে কাসেমের সারা শরীর জর্জরিত। সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে ব্যথায় ঝাঁকিয়ে উঠল। উঃ! শব্দ বেরিয়ে এলো মুখ থেকে। বসে পড়ল কাসেম। কিন্তু না, বসে থাকাও সম্ভব হলো না তার। সুলতান, সেনাবাহিনী ও মায়ের আকাক্ষা তার অসার দেহে শক্তির সঞ্চার করল। এবার মাটিতে স্ত্র দিয়ে অনেক কষ্টে কোমর সোজা করে দাঁড়াল কাসেম। চারদিকটায় একবার চোখ বুলাল। দেখছে, অন্ধকারের মধ্যে ঘুরে ফিরছে অনেকগুলো মশাল। বিবর্ণ চাঁদের আলো। চাঁদ একটু পর পর ঢাকা পড়ে যাচ্ছে মেঘের আড়ালে। এরই মধ্যে আবার কানে ভেসে এলো সেই আহ্বান কাসেম…! কাসেম…! তুমি কোথায়। পাশাপাশি শোনা গেল পুরুষের ভারী কণ্ঠ–এই মহিলা হয়তো কাউকে খুঁজছে। ওকে কেউ নিয়ে যাও।”
“সে কাসেমের লাশ তালাশ করছে।” বলল একজন। তাকে বল, আমরা আহত এবং মৃতদের তুলে নিচ্ছি। কে সে, তার পরিচয় নিও।”
লোকগুলো কথা বলছিল গজনীর ভাষায়। কাসেম তাদেরকে হাঁক দিয়ে তার অবস্থান জানান দিতে চাচ্ছিল, কিন্তু তার মুখের আওয়াজ সে নিজেই শুনতে পেল না। কঠিন যন্ত্রণা ও অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণে তার শরীরে সামান্য শক্তিও ছিল না। তাছাড়া ময়দান আহত যোদ্ধা ও সওয়ারীদের শোরগোলে মুখরিত। উচ্চ আওয়াজে কথা বলা ছাড়া আর কাউকে ডাকার উপায় ছিল না। মশালগুলো
কাসেমের কাছ থেকে বেশি দূরে ছিল না। কিন্তু মনে হচ্ছে এগুলো তার কাছে এখন যোজন যোজন দূরত্বের সমান। কাসেমের পক্ষে সব ছিল না এক কদম অগ্রসর হওয়া। পায়ের রগ কেটে যাওয়ার কারণে পা ফেলে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করলে পড়ে গেল কাসেম। অনেক কষ্টে মাথা সোজা করে বসল। এমন সময় কানে ভেসে এলো পানি …. পানি …।
আওয়াজ লক্ষ্য করে দেখল কাসেম, তার সামনেই কাতরাচ্ছে এক জখমী সৈনিক। কিন্তু গজনীর সৈনিক হলে তো সে পানির বদলে আব’ বলতো। নিশ্চয়ই লোকটি মুলতানের। হিন্দু সৈনিক হবে। মায়ের মাতৃভাষা মুলতানী হওয়ার কারণে কাসেমও জানতো ভারতীয় হিন্দুরাই পানি’ বলে। পানির কথা শুনে কাসেমের বুকের মধ্যে তৃষ্ণা হাহাকার করে উঠল। বুকটা যেন শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে গেছে। কখন কোথায় পানি পান করেছিল মনেই নেই। সুলতানের মতো যুদ্ধের ভয়াবহতায় সেও ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে গিয়েছিল। তার স্মৃতিতে শুধুই যুদ্ধ এবং মায়ের কণ্ঠই ধ্বনিত হচ্ছিল। কাসেম ছিল অগ্রণী দলের কমান্ডার। সুলতান যখন যুদ্ধের কমান্ড নিজের দায়িত্বে নিয়ে বিজি রায়ের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানেন তখন কাসেম সুলতানের পাশেই মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তার সাথীদের অধিকাংশই শহীদ হয়েছিল মুখোমুখি যুদ্ধ করে। এক সময় কাসেম আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। এসব তার মনে নেই। তার শুধু মনে আছে, যুদ্ধ ক্রমশই তাদের প্রতিকূলে চলে যাচ্ছে, বিজয় ছিল তাদের কাছে সুদূর পরাহত।
তুমি কে দাদা, ভগবানের নামে আমাকে একটু পানি দাও, বলে তড়পাতে শুরু করল আহত লোকটি। ভগবানের নাম শুনে কাসেমের মৃত দেহেও যেন আগুন জ্বলে উঠল।
সে তার তরবারী বের করতে কোমরে হাত দিল। কিন্তু খাপ শূন্য। কখন তরবারী পড়ে গেছে মনে নেই। তরবারী না পেয়ে কোমর থেকে খঞ্জর বের করল কাসেম। ঠিক এ মুহূর্তে আহত লোকটি বলে উঠল, তুমি হয়তো মুসলমান!
হ্যাঁ, আমি মুসলমান!
কাসেম সামান্য সময় ভাবলো। খঞ্জর কোমরে গুজতে শুজতে বলল, মুসলমান কখনো তৃষ্ণার্ত দুশমনকে হত্যা করে না। তুমি তৃষ্ণার্ত। কিন্তু আমার কাছে পানি নেই। ভগবানের নামে তুমি পানি চেয়েছে। তোমার ভগবান আর পানি নিয়ে আসবে না। আমি তোমাকে পানি পান করাব। একটু অপেক্ষা কর। দেখি তোমার জন্যে পানি পাই কি-না।
কাসেম দাঁড়াতে চেষ্টা করল। কিন্তু পা নড়বড়ে। সে অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে একটি লাশের পাশে গেল। লাশের কোমর থেকে পানির মশক খুলে হামাগুড়ি দিয়ে আহত লোকটির পাশে পৌঁছে বলল, হা কর।
