সেই জমিন আজকের পাকিস্তানের অংশ। বিজয়ী ভূখণ্ডটি বর্তমান পাকিস্তানের হলেও ওখানে শহীদ যোদ্ধাদের কারো ঠিকানা পাকিস্তানে ছিল না। তারা এসেছিল সুদূর গজনী হতে। গজনী থেকে এসে সেই মৃত্যুঞ্জয়ী সুলতানের সহযোদ্ধারা মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজয়ভূমি উদ্ধার করেছিলেন পৌত্তলিক হায়েনাদের দখল থেকে। সেই বিরান মসজিদগুলো মুক্ত করেছিলেন শেরেকী চর্চার নাপাক গ্রাস থেকে। সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা মসজিদগুলোকে পরিণত করেছিল মালয় ও ঘোড়ার আস্তাবলে। মসজিদগুলো তারা আবার উচ্চকিত করেছিল এক আল্লাহর জয়গানে, মসজিদে মসজিদে আবারো চালু করেছিল একত্ববাদের বিজয়ধ্বনি ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।
অসংখ্য আহত মুসলিম যোদ্ধার কাতর আর্তি আর দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যেও ছিল পৌত্তলিকদের পদানত করার শুকরিয়া। মৃত্যুপথযাত্রী মুজাহিদরা কষ্ট ভুলে গিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছিল ভয়ংকর শত্রুদের পরাজয়ে এবং সুলতানের শত্রুদেশে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করার সাফল্যে। অনেকের দেহ থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু তারা বাবারে মারে, মরে গেলাম বলে আহাজারী করেনি, তাদের মুখে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা, বিজয়ের জন্যে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশে ধ্বনিত হলো, আলহামদুলিল্লাহ্।
সেই যোদ্ধারা ছিল অটল অবিচল ঈমানের অধিকারী, ইসলামী আকীদা-আমলে দৃঢ় বিশ্বাসী। তারা মাতৃভূমি ছেড়ে সুদূর মুলতানে এসেছিল, মুসলিম কন্যা জায়াদেরকে মুশরিক পাষণ্ডদের পাঞ্জা থেকে উদ্ধার করতে, যেসব মুশরিক-পশুরা মুসলিম মেয়েদেরকে দাসী বানিয়ে তাদের ইজ্জতের উপর পাশবিক উৎপীড়ন চালাচ্ছিল। তারা এসেছিল আল্লাহর পূজারীদের হৃত ইবাদতখানা আবার আল্লাহ্র দাসদের জন্যে মুক্ত করে দিতে।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে সেদিন পৌত্তলিক হায়েনাদের কবল থেকে গজনীর শার্দুলেরা নির্যাতিত মুসলিম অবলাদের মুক্ত করেছিল। যারা জীবিত ছিল তারা যুদ্ধের ক্লান্তি ভুলে গিয়ে রাতের অন্ধকারে মশাল হাতে সারা প্রান্তর খুঁজে ফিরছিল সাথীদের মৃতদেহ এবং বেঁচে থাকা আহত সহযোদ্ধাদের। শতশত মশাল রাতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে ছড়িয়ে পড়েছিল বেরার মাঠে-প্রান্তরে। শত্রুসৈন্য আর আহত মুজাহিদের আর্তি, গগনবিদারী চিৎকারে সে রাতে যেন কেয়ামত নেমেছিল বেরার জমিনে। আহত উট, ঘোড়া আর হাতিদের বিচিত্র গোঙানী সৃষ্টি করেছিল এক ভয়ংকর পরিস্থিতির।
অগণিত মানুষের করুণ আর্তি আর অশ্ব হস্তির বিকট চিৎকারের মধ্যে মুজাহিদরা শুনতে পেল ক্ষীণ আওয়াজের এক নারীকণ্ঠ- কাসেম…! কাসেম…! জীবিত থাকলে সাড়া দাও। বড় অস্থির, দিগভ্রান্তের মতো দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছিল এক মশালবাহী। কখনো কোন আহতের মুখের কাছে মশালটি নিয়ে দেখছিল লোকটির চেহারা, হতাশ হয়ে আবার দৌড়াচ্ছিল মশাল উঁচু করে। তার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল কাসেম…! কাসেম…! আমার ডাকে সাড়া দাও! আমি তোমাকে খুঁজছি।
এই মৃত্যুপুরীতেই এক জায়গায় মারাত্মক আহতাবস্থায় পড়েছিল কাসেম। সারা শরীরে তার অসংখ্য ক্ষত। অত্যধিক রক্তক্ষরণে সে শক্তিশূন্য। মাথা তুলে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, চোখ মেলে পৃথিবীটা দেবার শক্তিও তার নেই। ইশ জ্ঞান পুরোপুরি লোপ না পেলেও যুদ্ধের ভয়াবহতার কিছুই মনে নেই কাসেমের।
কাসেম…! কাসেম…! নারীকণ্ঠের এই মায়াবী আওয়াজ ইথারে ভাসতে ভাসতে তার কানেও ধ্বনিত হচ্ছিল। কিন্তু তখন এ জগতের চেয়ে পরকালের ভাবনায় তন্ময় ছিল কাসেমের হৃদয়। ভাবছিল, সে হয়তো তার বাবার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে পেরেছে নিজের জীবন এবং শরীরের সবটুকু রক্তের বিনিময়ে। তাই আকাশের হুরপরী ও ফেরেশতারা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাতে মর্তজগতে এগিয়ে আসছে। তার মস্তিষ্কের পরতে পরতে এসব ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে।
এক পর্যায়ে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল কাসেম কাসেম আহ্বান। ধ্যান ভেঙে গেল কাসেমের। স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল তার মায়ের অবয়ব। বাবার অপরাধের কথা মনে পড়ায় সে কুঁকড়ে উঠল। তার মনে পড়ল, মা তাকে বাবার তরবারী হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “আমি তোমাকে আল্লাহর দুশমনদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করলাম, তোমাকে আমি মৃত অথবা দুশমনের তরবারী বিদ্ধ অবস্থায় দেখতে চাই। তবে মৃত্যুর আগে তুমি এ তরবারী দিয়ে কম করে হলেও শত দুশমন সংহার করবে। তবেই আমার হৃদয়ের যন্ত্রণা লাঘব হবে।”
তার স্মরণ হলো… সে তার বাবার তরবারী মাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিল, এ তরবারী আমাকে দিও না মা! এটি নাপাক হয়ে গেছে। এতে লেগে রয়েছে মদ নারীর নাপাক প্রভাব।
তার আরো মনে পড়ল, পেশোয়ার থেকে রওয়ানা হওয়ার পর অনেকখানি পথ এগিয়ে দিয়ে তার ডান হাতের বাহুতে একটি কুরআনের আয়াত সম্বলিত তাবীজ বেঁধে দিয়ে মা বলেছিলেন- “আল বিদা আমার কলিজার টুকরো! তুমি জীবিত ফিরে এলে খুশি হবো, কিন্তু তোমার লাশ যদি বিজয়ের সংবাদ নিয়ে আমার কাছে ফিরে আসে তবে আরো বেশি খুশি হবো।” কানে বাজল প্রধান সেনাধ্যক্ষ আবু আব্দুল্লাহকে মায়ের অনুরোধ– “আমি আমার একমাত্র ছেলেকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দিচ্ছি, তাকে তার বাবার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ দেয়ার বিনীত অনুরোধ করছি।”
