সুলতান যখন আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত, বিজি রায় তখন পণ্ডিতদের নিয়ে দেবীর পূজায় মগ্ন। মুসলমানদের অবিচল শক্তি আর পরাক্রম দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত বিজি রায় দেবীর চরণে পড়ে হাউ মাউ করে সাহায্য প্রার্থনা করছিল। বিজি রায়ের কাছে যখন পুনর্বার মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের খবর দেয়া হলো, তখন সে মূর্তির পা ধরে সাহায্যের জন্যে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে মূর্তির পায়ে চুমু খেয়ে বিজয়ের আশায় অগ্নিমূর্তি ধারণ করে ময়দানে হাজির হলো। এসেই সে শুনতে পেল গগনবিদারী কণ্ঠ- “মুজাহিদ ভাইয়েরা! বিজয় নয়তো শাহাদত। আল্লাহর সিপাহীগণ! এটা মূর্তিপূজক ও তাওহীদে বিশ্বাসীদের সংঘাত। মুজাহিদ ভাইয়েরা! আল্লাহর জমিন থেকে পালিয়ে যাবে কোথায়? বিজয় নয়তো শাহাদাত, সামনে এগিয়ে যাও!”
যুদ্ধের দৃশ্য এ মুহূর্তে বদলে গেল। মুসলমানরা এখন বেপরোয়া। তাদের সামনে একটাই লক্ষ্য, বিজয়। গোটা মুসলিম বাহিনীর মধ্যে একই জোশ, একই চেতনার প্রজ্জ্বলন। তাদের চোখ থেকে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছে, তরবারী লাভা উদগিরণ করছে, যেন আগ্নেয়গিরি তার জ্বালামুখ খুলে দিয়েছে। আগুনের লাভা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ময়দানে। সুলতান নিজেই কমান্ড দিচ্ছেন। তার তরবারীর আঘাতে সারি সারি মানবদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। তিনি যেদিকেই যাচ্ছেন শত্রবাহিনী কচুকাটার মতো সাফ হয়ে যাচ্ছে। প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহ্ দেখছেন, সুলতানের আবেগ অত্যুঙ্গে। তিনি সুলতানের নিরাপত্তার ব্যাপারটি সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিলেন। তার ডান-বামে-পিছনে ছোট তিনটি বিশেষ বাহিনীকে নিযুক্ত করলেন। নির্দেশ দিলেন, যে কোন মূল্যে তোমরা সুলতানের উপর আক্রমণ প্রতিহত করবে। আবু আব্দুল্লাহ্ দেখলেন, শত্রুবাহিনী এখন দিশেহারা। বিজি রায়ের বাহিনী রণক্লান্ত, ময়দানে লাশের স্তূপ জমে গেছে, সম্মুখ ভাগে মুসলিম বাহিনীর তীব্রতার কাছে শত্রু বাহিনী আক্রমণাত্মক নয়, এখন আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে। তাই তিনি মুসলিম বাহিনীর দুই বাহুতে ও পশ্চাদকে নিরাপত্তা বিধানের কঠোর নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে দু’প্রান্তের মুজাহিদদের বললেন, “তোমরা আক্রমণ আরো তীব্র করো।”
দেখতে দেখতে যুদ্ধের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। বিজি রায়ের সম্মুখভাগের সেনাবল কমে এলো। বিজি রায় শহররক্ষীদের নির্দেশ দিল ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে। শহরের নিরাপত্তারক্ষীরা নিমিষে ময়দানে চলে এলো। এই প্রচণ্ড যুদ্ধাবস্থায় দিনমণি শেষ আলোর ঝলকানী দিয়ে আঁধারে হারিয়ে গেল। সুলতান শত্রুবাহিনীকে বিপর্যয়ের মুখোমুখি রেখে আক্রমণের ইতি টানলেন।
শহরের নিরাপত্তারক্ষীদের ময়দানে চলে আসার ব্যাপারটি বুঝতে পেরে আবু আব্দুল্লাহ্ রাতের আঁধারে ঝটিকা আক্রমণে রাজধানী তছনছ করে ফেললেন। শহরের প্রধান ফটক ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন। দুর্গ প্রাচীরের কয়েক জায়গা ধসিয়ে দিলেন বিস্ফোরক ব্যবহার করে। পরদিন প্রত্যূষে আর কোথাও বিজি রায়ের পতাকা উড্ডীন দেখা গেল না। হিন্দু সৈন্যবাহিনী বিক্ষিপ্ত। বিজি রায়ের খোঁজ নেই। বহু খোঁজাখুঁজির পর অনেক দূরের এক মাঠে সৈন্য বেষ্টিত বিজি রায়কে একদল মুসলিম সৈন্য দেখতে পেয়ে ওদের দিকে ধাবিত হল। মোকাবিলা না করে বিজি রায়ের নিরাপত্তারক্ষীরা যে যেদিকে পারে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল। বিজি রায়কে ঘিরে ফেলল সুলতানের সিপাহীরা। তাকে আত্মসমর্পণ করে অস্ত্র ফেলে দেয়ার নির্দেশ দিল দলপতি। কিন্তু বিজি রায় অস্ত্র না ফেলে নিজের তরবারী নিজের পেটে ঢুকিয়ে দিল।
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বিজয়ী বেশে সুলতান বিজি রায়ের রাজধানী বেরায় প্রবেশ করলেন। দু’শর চেয়ে বেশি প্রশিক্ষিত হাতি তাদের দখলে এলো। রাতের আঁধার নেমে এসেছে তখন। চতুর্দিকে বহু দূর পর্যন্ত লাশ আর লাশ। উভয় পক্ষের অধিকাংশ সৈন্য হয় মৃত নয়তো আহত। সারা ময়দান ও শহর জুড়ে আহত সৈন্যের আর্তচিৎকার, করুণ আর্তি আর আহত জন্তুর বিকট চেঁচামেচি। বহু মশাল জ্বালিয়ে মুজাহিদরা আহত সাথীদের খোঁজে বের হলেন। লাশের পর লাশের স্তূপ থেকে উদ্ধার করতে লাগলেন পড়ে থাকা সহযোদ্ধাদেরকে। লাশের স্কুপের মাঝে আহত কাসেম মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে সে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় মাঠে শোনা গেল একটি নারীকণ্ঠ। কাসেম…! কাসেম…! বেঁচে থাকলে আমার ডাকে সাড়া দাও! কাসেম…তুমি কামিয়াব, আমার আশা সফল হয়েছে আজ। আল্লাহ্ আমার দু’আ কবুল করেছেন…। কাসেম বলো, তুমি কি বেঁচে আছো…?
.
চার কুমারী দুর্গ
আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে সেই রাতের চাঁদের আলোও ছিল রক্তিম। আকাশ ছিল ধূসর বিবর্ণ। সুলতান মাহমুদের সেনারা টানা তিন দিন মরণপণ যুদ্ধে যে রক্তনদী প্রবাহিত করেছিল এবং যে ধুলোবালি বেরার আকাশে উড়িয়ে ছিল তাতে সে আকাশ ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ধূলির আস্তরণে। চাঁদনী রাতের ফ্যাকাশে আলোয় যে পর্যন্ত দৃষ্টি যেতো, তাতে মৃতের লাশ, শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ আর আহত জখমী সৈন্য, ঘোড়া, উট আর হাতির মিলিত চিৎকারে পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। রাতের নিস্তবদ্ধতা নয় সেদিনকার বেরা ছিল একটি ধ্বংসযজ্ঞের মূর্তিমান চিত্র। মাইলের পর মাইল জমিন মানুষের রক্তে লাল রং ধারণ করেছিল।
