শত্রু সৈন্যদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কাসেম সুলতানকে যে সংবাদ দিল তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বিজি রায় শহর থেকে চার পাঁচ মাইল দূরে সুলতানের গমন পথে রণ প্রস্তুতিতে রেখেছে গোটা সেনাবাহিনীকে। জায়গাও বেছে নিয়েছে তার সুবিধামত। হস্তিবাহিনীকে সে সবার আগে রেখেছে।
সুলতান হস্তিবাহিনীর দুর্বলতা জানতেন। হাতি আহত হলে স্বপক্ষের জন্যে কতটুকু বিপদ বয়ে আনে এর অভিজ্ঞতা তার যথেষ্ট। তিনি পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তীর ধনুক ও বর্শাসজ্জিত পদাতিক বাহিনীকে হস্তিবাহিনীর মোকাবেলার জন্যে নির্দেশ দিলেন। কয়েকটি হাতি আহত হয়ে বিকট চিৎকারে উল্টোপথে দৌড়াল, কিন্তু ওদের পিছন দিকটা ছিল মুক্ত। আহত হাতি ওদের জন্যে কোন ক্ষতির কারণ হলো না।
সুলতান একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বিজি রায়ের রণকৌশলে বিস্মিত হলেন। এই প্রথম তিনি হাতির সফল ব্যবহার দেখে অবাক হলেন। সুলতান দেখলেন, তার পদাতিক বাহিনী হস্তিবাহিনীর মোকাবেলায় পর্যন্ত হয়ে পড়েছে। তিনি অশ্বারোহী বাহিনীকে ওদের সহযোগিতার জন্যে নির্দেশ দিলেন। এক হাজার অশ্বারোহী ইউনিট ওদের সমর্থনে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিন্তু বিজি রায়ের অশ্বারোহী বাহিনী সুলতানের অশ্বারোহীদেরকে দুদিক থেকে ঘিরে ফেলল। ফলে মুসলমান অশ্বারোহীরা পদাতিক সৈন্যদের সাহায্যে ওদের কাছেই যেতে পারল না।
হিন্দু সৈন্যরা প্রচণ্ড উদ্যম ও সাহসিকতার সাথে মুসলিম সৈনিকদের তাড়া করছিল, ওদের কমান্ডিং নির্দেশনাও ছিল নিপুণ। সুলতান মাহমূদ ওদের পিছন দিকে একটি ইউনিট পাঠালেন ওদিক থেকে আক্রমণ করতে কিন্তু ওরা পিছন দিকটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল আগে থেকেই। যে মুসলিম সৈন্যদল পশ্চাৎ দিক থেকে আক্রমণ করতে গিয়েছিল হিন্দু সৈন্যরা ওদের ঘেরাও করে ফেলল। ওরা আক্রমণ তো করতেই পারেনি, নিজেদের প্রাণ রক্ষা করাই মুশকিল হয়ে পড়ল। এক পর্যায়ে হিন্দুবাহিনী মুসলিম সৈন্যদের বিরুদ্ধে হস্তিদল লেলিয়ে দিল। খুব কষ্টে বহু হতাহতের পর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে মুসলিম বাহিনীর একাংশ ওদের ঘেরাও থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলো। এভাবেই এদিনের বেলা অস্তমিত হলো। সুলতান প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে ভাবছেন, কী করবেন।
আশু পরাজয় নয়তো পশ্চাদপসরণ ছাড়া সুলতান বিজয় লাভের কোন পথ খোলা দেখছেন না। সুলতান বহু দূর পথ ঘুরে বেরা শহরের কাছে গিয়ে দেখে নিলেন, রাজধানীতে আক্রমণ করে বিজি রায়ের মনোনিবেশ ময়দান থেকে ঘুরিয়ে দেয়া যায় কি-না। কিন্তু তারও কোন সুযোগ ছিল না। বিজি রায় শহর রক্ষায়ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করে রেখেছিল। শহরের বাইরে অসংখ্য মোরচাবন্দী সৈনিককে সে নিযুক্ত করে রেখেছিল রাজধানীর নিরাপত্তা রক্ষায়। এদিকে সে রাতে সুলতানের রসদপত্রেও হিন্দুরা আক্রমণ করে বসল। এই প্রথম সুলতান দেখলেন, হিন্দুরা তারই কৌশল অবলম্বন করে তাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
নির্মুম কাটল সারা রাত। সুলতান সবেমাত্র ফজরের নামায শেষ করলেন। তখন পদাতিক বাহিনী দিয়ে আক্রমণ চালানো হলো কিন্তু ফল হলো বিরূপ। মুসলিম সৈন্যরা যেটিকে শত্রুবাহিনীর বাহু মনে করেছিল আসলে সেটি বাহু ছিল না, ছিল ফাঁদ। সেই ফাঁদে পা দিয়েছিল সুলতানের পদাতিক সেনাদল।
পদাতিক বাহিনীর বিপর্যয়ে সেনাপ্রধান কাসেম বিন ওমরের অশ্বারোহী বাহিনীকে ওদের জায়গায় পাঠালেন। কাসেমের দল জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। লাশের পর লাশ পড়লেও কাসেমের সাথীরা শত্রুর মোকাবেলায় পিছপা হলো না। তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠল রণাঙ্গন। ময়দান জুড়ে সারি সারি মৃতদেহ। আহতদের আর্তচিৎকার ও জখমী সওয়ারের ক্রন্দনে পরিবেশ ভয়ংকর রূপ নিল, কিন্তু কোন পক্ষই মোকাবেলায় পিছুটান না দিয়ে হামলা আরো তীব্র করতে লাগল। তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেই বেলা শেষে নেমে এলো সন্ধ্যা।
তৃতীয় দিনের শুরুতে সুলতানের সৈন্যসংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাকী সবাই হয়তো নিহত না হয় আহত হয়ে পড়ল। রসদ সামগ্রীও নিঃশেষ প্রায়। তৃতীয় দিনের প্রাণপণ মুকাবেলায়ও লড়াইয়ের যবনিকাপাত না ঘটায় সুলতান হতোদ্যম হয়ে পড়লেন। তিনি একবার ভাবলেন, এভাবে সৈন্যদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া অর্থহীন। কিন্তু তৃতীয় দিন মুসলিম সৈন্যরা আক্রমণ আরো শাণিত করল, তাদের আবেগ ও আক্রমণের তীব্রতা দেখে সুলতান সিদ্ধান্ত বদলে ফেললেন। তিনি তার দেহরক্ষী বাহিনীর উদ্দেশ্যে বললেন, “মুজাহিদ ভাইয়েরা! বিজয়ের জন্যে আমি আমার জীবনকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করলাম। এখন থেকে যুদ্ধের কমান্ড করব আমি স্বয়ং।” সুলতানের আবেগ ও অগ্নিঝরা বক্তৃতায় রিজার্ভ ও তার দেহরক্ষী সৈন্যদের খুন টগবগ করে উথলে উঠল। সৈন্যদের তাকবীর ধ্বনিতে বেরার আকাশ কেঁপে উঠল। রিজার্ভ বাহিনী নিয়ে সুলতান ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
মুসলিম বাহিনী সিংহের মতো গর্জে উঠল শত্রুর মোকাবিলায়। শত্রু বাহিনীও শেষ শক্তি ঝেড়ে ছিল প্রতিআক্রমণে। কিন্তু তখনও বিজি রায়ের বাহিনী ময়দানে অবিচল। এক পর্যায়ে সুলতান নিজের বাহিনীকে পশ্চাদপসারণ করে নিলেন। ঘোড়া থেকে নেমে দু’রাকাত নামায পড়লেন। নামায শেষ করে সালাম দিয়েই তিনি এক লাফে ঘোড়ায় চড়ে বসলেন। হাঁক দিলেন, “মুজাহিদ ভাইয়েরা! আল্লাহ আমাকে বিজয়ের ইশারা করেছেন। বন্ধুরা! এগিয়ে যাও। বেঈমানদের নিঃশেষ করো!” সুলতানের আহ্বানে স্তিমিত আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে উঠল মুসলিম বাহিনী। প্রচণ্ড আওয়াজে হায়দরী হুংকারে গর্জে উঠল মুসলিম বাহিনী। একই সাথে গগনবিদারী তকবীর তুলে লাফিয়ে পড়ল সকল অশ্বারোহী শত্রু নিধনে।
