সুলতান মাহমূদ সেনাধিনায়ক ও কমান্ডারদের বললেন, “আমরা বিজি রায়ের অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি। এই মুহূর্তে বিজি রায়ের সাথে সংঘর্ষ এড়াতে চেষ্টা করা উচিত। আমাদের সৈন্যরা রণক্লান্ত। এছাড়া আমাদের আসবাব পত্র ও শত্রুবাহিনীর থেকে প্রাপ্ত বিপুল সম্পদও যুদ্ধাবস্থায় আগলে রাখা কষ্টকর হবে। এখন আমাদের লক্ষ্য দাউদ বিন নসর। আগে আস্তিনের কাল সাপটিকে খতম করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
এবার মুলতানের দাউদ বিন নসরের মসনদের দিকে যাত্রা করল সুলতানের বাহিনী। এবারও কাসেম বিন ওমরের ইউনিট অগ্রগামী। মুলতান যাত্রার তৃতীয় দিন। কাসেম বিন ওমর সবার আগে। তার পাশাপাশি দু’জন অশ্বারোহী আঞ্চলিক গাইড। হঠাৎ কাসেম চার পাঁচশ গজ দূরে একজন অশ্বারোহীকে দেখল। লোকটি ঘোড়া থামিয়ে কাসেমের বাহিনীকে পর্যবেক্ষণ করছিল। অগ্র পশ্চাৎ দেখে লোকটি দ্রুত একদিকে অশ্ব হাঁকালো।
অন্যরা ভাবলো, লোকটি হয়ত সৈন্যদলকে দেখে ভয়ে পালিয়েছে। কিন্তু কাসেম মনে করল, লোকটি বিজি রায়ের চর হতে পারে, সে বিজি রায়কে মুসলিম বাহিনী আগমনের আগাম সংবাদ দিতে দৌড়াচ্ছে। কাসেম গাইডকে জিজ্ঞেস করল, “এখান থেকে বেরা কত দূর এবং কোনদিকে?”
গাইড বললো, “বেরা বেশি দূরে নয়, ঐ লোকটি তো বেরার দিকেই ঘোড়া দৌড়াচ্ছে।”
কাসেম বিন ওমর দু’জন অশ্বারোহীকে সাথে নিয়ে পালায়নপর অশ্বারোহীর পশ্চাদ্ধাবন করল। লোকটি অনেক দূর চলে গেছে কিন্তু কাসেম ও সাথীদের ঘোড়াগুলো ছিল দ্রুতগামী। তারা দৌড়াচ্ছে। এক পর্যায়ে তাদের চোখে পড়ল বেরা দুর্গের উঁচু মিনার। পলায়নপর ও পশ্চাদ্ধাবনকারীদের মধ্যে ক্রমশ দূরত্ব কমে এলে কাসেম সাথীদের বলল– “তীর বের কর। ওকে জীবিত যেতে দেয়া যাবে না।” এক সাথী ধাবমান অশ্বপৃষ্ঠে বসেই তীর চালাল। একটি তীর লোকটির পিঠে আর একটি তীর ঘোড়ার পশ্চাদ্দেশে বিদ্ধ হলো। এতে পলায়নকারীর ঘোড়ার গতি আরো বেড়ে গেল। কাসেমের সাথীরা আরো দুটি তীর নিক্ষেপ করল, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হল।
ইতিমধ্যে শহরের সীমানা প্রাচীর তাদের গোচরীভূত হলো। সীমানা প্রাচীর দুর্গের মতোই উঁচু। পলায়নপর অশ্বারোহী শহরের প্রবেশদ্বারে ঢুকে পড়লে কাসেম ও সাথীরা ঘোড়া ফিরিয়ে নিল।
বিজি রায় দরবারে উপবিষ্ট। তার প্রধান সেনাপতি তাকে রিপোর্ট শুনাচ্ছিল। গুপ্ত বাহিনী দেড় মাস হয়ে গেছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত তারা মাহমূদের কোন সৈনিকের দেখা পায়নি। বিজি রায়ের সামনে ছিল ষড়যন্ত্রের সেই নকশা যা দাউদ বিন নসর আসেম ওমরকে দিয়েছিল। বিজি রায় তাদের তৈরি পথে সুলতানের বাহিনীকে গুপ্ত আক্রমণে পর্যুদস্ত করার জন্যে বহু সংখ্যক ঝটিকা বাহিনী নিয়োগ করে রেখেছিল। আর প্রতিদিন আশা করতো, ঘুম থেকে উঠে সে শুনবে, তার গুপ্ত বাহিনীর হাতে মাহমূদের বাহিনী পর্যন্ত হতে শুরু করেছে। এরপর প্রতিদিন তাকে তার সৈন্যদের সাফল্য গাঁথার ফিরিস্তি জানানো হবে। কিন্তু দেড় মাস অতীত হয়ে গেল, সংবাদ তো দূরে থাক তার বাহিনী মুসলিম সৈন্যদের দেখাই পেল না। এটা ছিল বিজি রায়ের জন্যে এক চরম হতাশাজনক বিষয়।
“আচ্ছা, তাহলে মুসলিম বাহিনী গেল কোথায়?” ক্ষুব্ধকণ্ঠে সেনাপতির কাছে জানতে চাইল বিজি রায়। পেশোয়ার থেকে খবর পাওয়া গেল, ওখান থেকে মাহমূদের বাহিনী রওয়ানা হয়ে গেছে; তাহলে ওরা গেল কোথায়? উধাও হয়ে গেল?”
“আমার মনে হয়, দাউদ আপনাকে ধোকা দিয়েছে, নয়তো সুলতান মাহমূদের দূত আপনাদের ধোকা দিয়েছে। মুসলমানকে বিশ্বাস করা আপনার ভুল হয়েছে মহারাজ!” বলল সেনাপতি।
এমন সময় বিজি রায়কে খবর দেয়া হল, এক সৈনিক পিঠে তীরবিদ্ধ হয়ে দুর্গে ফিরে এসেছে। বিজি রায় কিছু বলার আগেই তীরবিদ্ধ সৈনিক দরবারে প্রবেশ করল। তার পিঠে তখনও তীর বিদ্ধ, সারা শরীর রক্তাক্ত।
আহত সৈনিক বলল, “আমি পর্যবেক্ষণের এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ঘোট একটি ইউনিট দেখে ওদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্যে দাঁড়াই। ওরাও এগুতে থাকে। যখন বুঝতে পারি, ওরা সুলতান মাহমূদের সৈনিক, তখন ফিরে আসতে ঘোড়া দৌড়াই। কিন্তু ওদের দুই অশ্বারোহী আমার পিছনে অশ্ব হাঁকায়। ওরা পরপর কয়েকটি তীর ছুঁড়ে। একটি আমার পিঠে বিদ্ধ হয় আরেকটি আমার ঘোড়ার কোমরে আঘাত হানে। আমার বিশ্বাস, এরা মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামী দল।”
“হ্যাঁ, ওরা সেই বাহিনীর অংশ যাদের জন্যে আমরা অপেক্ষা করছি।” বলল বিজি রায়। সেনাপতিকে বিজি রায় বলল, “আমরা মাহমূদকে শহর ঘিরে ফেলার সুযোগ দেব না। ওরা দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত। আমরা ওদেরকে শহর থেকে দূরে আমাদের সুবিধা মতো জায়গায় পড়তে বাধ্য করব। এক্ষুণি তোমরা শহর ছেড়ে বাইরে অবস্থান নাও।”
একটু পরেই বেজে উঠল যুদ্ধ নাকারা! বেরার সৈন্যদের মধ্যে রণপ্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। জঙ্গী হাতির চিৎকার, অশ্বের হ্রেষাধ্বনি আর সৈন্যদের শোরগোলে মুখর হয়ে উঠল বিজি রায়ের রাজধানী। একদল সৈন্যকে আগে পাঠিয়ে দেয়া হলো, মুসলিম বাহিনী কতদূর এসেছে তার খবর নিতে। একটু পরেই সংবাদ এলো, মাহমূদের সেনাবাহিনী শহর থেকে দশ মাইল দূর দিয়ে অতিক্রম করছে। বিজি রায় নির্দেশ দিল, আমাদের সেনাবাহিনীকে ওর পথ রোধ করে রণপ্রস্তুতিতে থাকতে হবে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিজি রায়ের সেনাবাহিনী শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কাসেম বিন ওমর অগ্রগামী বাহিনীর পশ্চাতে প্রধান সেনাপতি আবু আব্দুল্লাহকে জানাল, এক শত্রুসেনা আমাদের দেখে পালাতে ছিল, সে আমাদের তীরে আহতাবস্থায় শহরে ফিরে গেছে।” আবু আব্দুল্লাহ সাথে সাথে সুলতান মাহমুদকে খবরটি অবগত করালেন। সুলতান এ সংবাদ শুনে দারুণ বিমর্ষ হলেন। কিছুক্ষণ ভেবে তিনি রসদসামগ্রী বোঝাই কাফেলাকে ওখানেই “থামিয়ে দিলেন। আসবাব পত্রের পাহারার জন্যে কিছু সৈন্যকে নিযুক্ত করে কাসেমকে বললেন, “বিজি রায়ের সৈন্যদের গতিবিধি দেখে আমাকে জানাও।”
