“আমরা এমন অহংকারী কোন রাজার দরবারে সুলতানকে যেতে দেই না। আত্মহংকারে যে রাজা ঘাড় উঁচু করে রাখে আমাদের সুলতান তার নিকট আসার প্রয়োজনবোধ করেন না। তিনি যদি এখানে আসতেও চান তবুও তাকে আমি আসতে দেবো না।” বলল কাসেম।
“দ্রভাবে কথা বল। তুমি আমাদের রাজদরবারের অপমান করছে।” হুংকার দিয়ে বলল এক আমলা। সে রাজার দিকে প্রতিশোধ আজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাল। রাজা মুচকি হেসে বলল, “তুমি যেতে পার। তুমি তরুণ। এবার তোমার যৌবনের প্রতি দয়া করে ক্ষমা করে দিলাম। আর কখনও পুলে কদম রাখার দুঃসাহস করো না। তোমাদের সুলতান যদি যুদ্ধ করার ইচ্ছায় এসে থাকে, তবে তাকে বলো, আমরা প্রস্তুতই রয়েছি, সাহস থাকলে সে পুল অতিক্রমের চেষ্টা করে দেখুক।’
“আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি।” ক্ষোভ চেপে ফেলল কাসেম। ফিরে যাচ্ছি ।”
কাসেম ফিরে গিয়ে আনন্দ পালের সেনাদের বাধা এবং সাক্ষাতের ঘটনা বিস্তারিত সুলতানকে জানাল।
“তোমার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ কাসেম। তুমি চমৎকার কূটনৈতিক চাল দিয়েছে। ওকে এমনই একটা সংশয়ের মধ্যে ফেলা দরকার ছিল। দেখবে, আজ রাতেই আমি নদী পার হওয়ার ব্যবস্থা করব। তোমার অগ্রগামী ইউনিট পুলের কাছে অপেক্ষা করবে, আরেকটি অশ্বারোহী ইউনিট তোমার পিছনেই থাকবে সহযোগী হিসেবে। অন্য সৈন্যরা ভিন্ন পথে নদী পেরিয়ে আনন্দ পালের শিবিরে আক্রমণ শানাবে। তুমি আমার পয়গামের অপেক্ষা করবে। খবর পৌঁছার সাথে সাথে সহযোগীদের নিয়ে ঝড়ের বেগে পুল পেরিয়ে যাবে।
শত্রুবাহিনী তোমাদের মুখোমুখি থাকবে না –তোমাদেরকে ওরা পিছনে রাখবে তা বলা কঠিন। বুদ্ধি খাঁটিয়ে অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা করে কাজ করবে। এখন পুলের পিছনে চলে যাও। খেয়াল রাখবে, কোন বাহিনী যাতে তোমাদের অবস্থান নির্ণয় করতে না পারে।
আরেকটা বিষয়ের প্রতি গভীরভাবে খেয়াল রাখবে, কোন সাধু-সন্ন্যাসী কিংবা দরবেশ ধরনের মানুষ বা সৈনিক যদি পুল পার হয়ে তোমাদের দিকে আসে তাকে অবশ্যই বন্দী করবে। এ সময়ে অপরিচিত যে কোন ব্যক্তিই শত্রুর হওয়ার আশংকাই বেশি।”
সুলতান মাহমূদ সেনাপ্রধান আবু আব্দুল্লাহকে জানালেন, “রাজা আনন্দপাল নদীর ওপারে সেনাবাহিনী নিয়ে অপেক্ষমাণ। সে আমাদেরকে নদী পার হতে বারণ করে দিয়েছে। মাছ শিকারীর বেশ ধরে এখনই নদী তীরের অবস্থা পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে যান, নয়তো দূরদর্শী কোন কমান্ডারকে পাঠান। আজ রাতেই নদী পার হয়ে আনন্দ পালের শিবিরে আক্রমণ করতে হবে।” সুলতান মাহমুদ কাসেমের কাছ থেকে নদী তীরের পরিবেশ পরিস্থিতি এবং ভৌগোলিক প্রকৃতি জেনে নিয়েছিলেন, যাতে নদী পেরিয়ে ওপারে উঠে নিজেদের গতি নির্ণয় সহজ হয়।
অপর দিকে রাজা আনন্দ পাল সেনাবাহিনীর অর্ধেককে সিন্ধু নদের পুল পাহারায় নিযুক্ত করে, যাতে সুলতানের বাহিনীকে ওরা ওখানেই রুখে দিতে পারে। পুলটি ছিল কাবুল নদী ও সিন্ধুনদের মোহনা থেকে একটু উজানে। সুলতান মাহমূদ নদীর পরিস্থিতি জেনে আরেকটু উজানে অগ্রসর হয়ে সিন্ধু নদ পার হলেন। এখানে নদী ছিল চওড়া কিন্তু অগভীর। বেলা উঠার আগেই সুলতানের সকল সৈন্য নদী পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে গেল। তখন এক হাজার ছয় খৃষ্টাব্দের বসন্তকাল।
রাজা আনন্দ পাল ভাবতেও পারেনি, সুলতানের বিশাল বাহিনী পুল ছাড়াই এতো অল্প সময়ে নদী পার হয়ে যাবে। আনন্দ পাল শংকাহীন ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। সুলতানের সরাসরি কমান্ডে যখন আনন্দ পালের শিবিরে আক্রমণ শুরু হয়ে গেল তখন তাদের পক্ষে প্রতিরোধ করার কোন সুযোগ নেই। আনন্দ পালের যে সৈন্যরা পুলের পাহারায় ছিল ওরা ছিল সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত। রাজার শিবিরে আক্রমণের সংবাদ পেয়ে ওরা প্রতিরোধে অগ্রসর হল। ইত্যবসরে বেলা উপরে উঠে এসেছে। এদিকে কাসেম সাথীদের নিয়ে সুলতানের পয়গামের জন্যে অধীর অপেক্ষায় রয়েছে। সে একটি উঁচু টিলার উপর থেকে ওপারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্যে দুজনকে নিয়োগ করে রাখল। যারা সুলতান ও আনন্দ পালের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখছিল। ওরা যখন দেখল, পুল পাহারায় নিয়োজিত রাজার বাহিনী পাহারা তুলে নিয়ে ময়দানের দিকে দৌড়াচ্ছে, তখন তারা কাসেমকে ইঙ্গিতে ব্যাপারটি বোঝাল। কাসেম সঙ্গীদেরকে ঝড়ের গতিতে পুল পার হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে পুলের ওপারে পৌঁছে গেল। সবাইকে এক সাথে করে কাসেম আনন্দ পালের পুল প্রহরী বাহিনীর পিছন দিক থেকে তীব্র গতিতে আক্রমণ করল।
রাজা আনন্দ পাল প্রতি-আক্রমণের অবকাশই পেল না। পরিস্থিতি এমন হলো যে, রাজার পালানোই একমাত্র বিকল্প পথ। রাজা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেল। তার সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে পড়ল। অধিকাংশকে সুলতানের বাহিনী বন্দী করল, কিছুসংখ্যক পালাতে সক্ষম হলো আর বাকীরা নিহত হলো। সুলতানের বাহিনী আনন্দ পালকে বর্তমান অজীরাবাদ পর্যন্ত তাড়া করেছিল। কিন্তু আনন্দ পাল গরীব মাঝিদের মোটা অংকের বখশিশ দিয়ে পাঞ্জাব নদী পার হয়ে প্রাণে বেঁচে যায়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ সিন্ধু নদ যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত।
পশ্চাদ্ধাবনকারী সুলতানের সৈন্যরাও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সুলতান দ্রুত দূত পাঠিয়ে বিক্ষিপ্ত সৈন্যদেরকে ঝিলাম নদীর পূর্বতীরে একত্রিত করেন। অবশ্য শত্রু বাহিনীর পিছনে পশ্চাদ্ধাবনকারী মুসলিম সৈন্যদের একত্রিত ও সমগ্র বাহিনীকে পুনর্গঠিত করতে এক মাস সময় লেগে যায়।
