সুলতানের আবেগঘন অগ্নিঝরা বক্তৃতায় সৈনিকদের মধ্যে মনোবল দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়ে উঠল। তাদের মধ্যে সৃষ্টি হলো বেঈমানদের বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিশোধ স্পৃহা, আগুনের ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল প্রত্যেক সৈনিকের বুকে। গোটা বাহিনী প্রচণ্ড আক্রোশে বেঈমানদেরকে তুলোর মতো উড়িয়ে দিতে উদ্যত, সবাই তীব্র গতিতে শত্রুর মুখোমুখি হতে অস্থির হয়ে উঠল।
ওদিকে কাসেম বিন ওমরের অগ্রগামী দল বেলা দ্বিপ্রহরের সময় সিন্ধু নদপারের নৌকাগুলোর কাছে পৌঁছে গেল । কাসেমের সেনা ইউনিট যখন পুলের মাঝামাঝি পৌঁছাল তখন এক ঝাক তীর এসে তার ঘোড়ার সামনে নৌকার পাটাতনে বিদ্ধ হলো। কাসেম সকলকে সতর্ক হতে বললো। ইত্যবসরে অপরদিক থেকে আওয়াজ ভেসে এলো- “সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করবে না, তাহলে তোমাদেরকে তীরের আঘাতে চালুনী বানিয়ে ফেলব।”
“তোমরা কে আমাদের পথ রোধ করার?” উচ্চ আওয়াজে বলল কাসেম। “আমরা সুলতান মাহমুদের সৈনিক। রাজা আনন্দ পাল আমাদের রায়ত। এ পুল দিয়ে অতিক্রমে আমাদের কেউ বাধা দিতে চাইলে তার পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ।”
“মহারাজা আনন্দ পালের হুকুম। এ পুল পেরিয়ে কোন যবনকে এদিকে আসতে দেয়া হবে না। তোমরা ফিরে যাও।”
কাসেম খেয়াল করল, ওপারের কোল ঘেঁষে উঁচু টিলা, ঘন বনবীথি। টিলার উপরে মাত্র ক’জন লোককে কাসেম দেখতে পেল। তার আন্দাজ করতে অসুবিধা হলো না, পুলের নিরাপত্তা ও মুসলিম বাহিনীকে রুখে দিতে আড়ালে আরো বহু সৈনিক লুকিয়ে রয়েছে।
মাত্র একজন সাথীকে নিয়ে দ্রুত গতিতে ওপারে পৌঁছে গেল কাসেম। টিলার উপরে দাঁড়ানো হিন্দু সৈনিক কাসেমকে ক্ষুব্ধকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল-”কেন তুমি পুল পেরিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ে এদিকে আসতে চাচ্ছো?”
“আমরা কারো উপর আক্রমণ করতে আসিনি।” জবাব দিল কাসেম। “আক্রমণ ও যুদ্ধের প্রশ্নই এখানে অবান্তর। কেননা এ ভূখণ্ডের রাজা আমাদের করদাতা। আমরা শুভেচ্ছা সফরে এসেছি, আমাদের পুল পার হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত।”
“তোমাদের করদাতা রাজাই তো আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে, মুসলিম ফৌজ আসছে, ওদেরকে পুলের ওপর রুখে দিতে হবে।” বলল হিন্দু সৈনিক।
“তোমাদের রাজা তো এখানে থাকার কথা নয়। তিনি লাহোর বা বাটান্ডায় থাকার কথা।”
“মহারাজা এখনি থেকে মাত্র সাত মাইল দূরে তাবু ফেলেছেন।” বলল হিন্দু সৈনিক। “যদি তার কাছ থেকে পুল পার হওয়ার অনুমতি নিতে চাও, তাহলে তোমার সুলতান নয়তো উজীরকে পাঠাও।”
“আমিই সুলতান আমিই উজীর। আমাকেই তোমার রাজার কাছে নিয়ে চলো।” বলল কাসেম। “আমি কিছুতেই ফিরে যাবো না। তুমি যদি আমাকে আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীরন্দাজদের মাধ্যমে বাধা দিতে চাও, তবুও তোমার বাধা আমি মানবো না। আমরা পুল ছাড়াও নদী পেরিয়ে আসতে পারবো। তবে তোমাদের জন্য রাজার অন্যায় নির্দেশ পালন করতে গিয়ে জীবন বাজী রাখা ঠিক হবে না।”
হিন্দু সেনারা তাকে সাথে করে রওয়ানা হল। কাসেম চতুর্দিক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পেল, টিলার আড়ালে বহু সৈন্য লুকিয়ে রয়েছে। টিলা অতিক্রম করে একটু অগ্রসর হতেই তার নযরে পড়ল রাজা আনন্দ পালের শিবির। কাসেম এলাকাটির ভৌগোলিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কাসেমের বুঝতে অসুবিধা হলো না, রাজা আনন্দ পাল নিজে কেন সেনাবাহিনী নিয়ে শিবিরে অবস্থান করছে।
রাজা আনন্দ পালের শিবিরটি ছিল সবুজ শ্যামল ময়দানে। কাসেমকে একটি চৌকোণা উঁচু তাবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। কয়েকটি কক্ষ পেরিয়ে যাওয়ার পর সে দেখল, বিশাল একটি ঘরের মতো সাজানো গোছানো তাঁবুতে শাহী মসনদে রাজা আনন্দ পাল উপবিষ্ট। তার পিছনে দাঁড়িয়ে অনিন্দ্যসুন্দরী দু’তরুণী বাতাস করছে। রাজাকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল, তার সাথে কে সাক্ষাৎ করতে আসছে। ফলে রাজার চেহারা ছিল ভাবগম্ভীর। তার চারদিকে রাজার শীর্ষ কর্মকর্তারা ও সেনাপতি দণ্ডায়মান।
“তোমাদের সুলতান কি নদী পার হতে চায়? তার এইদিকে আসার উদ্দেশ্য কি? কোথায় যেতে চায় সে?” কাসেমকে জিজ্ঞেস করল রাজা আনন্দ পাল।
“আপনি আমাদের করদাতা। এখনও পর্যন্ত আপনি চুক্তির শর্তানুযায়ী কর পরিশোধ করেননি। চুক্তি মতে আপনি আমাদের অধীন। অতএব সুলতান কেন নদী পেরিয়ে এদিকে আসতে চান একথা জিজ্ঞেস করার অধিকার আপনার আছে কি? তবুও আমি আপনাকে এ নিশ্চয়তা দিচ্ছি, সুলতান আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসছেন না। আমরা নির্বিবাদে এইপথ অতিক্রম করার সুযোগ চাই।”
“তোমার ঔদ্ধত্যপনা ক্ষমা করে দিলাম। জেনে রাখো, আমি কারো করদাতা নই। তোমাদের সাথে চুক্তি করেছিল আমার পিতা, আমি কোন চুক্তি করিনি। তিনি মরে গেছেন। তোমাদের সুলতান আমাকে কখনও পরাজিত করেননি। কাজেই আমি কেন বাবার জরিমানা দিতে যাবো? তোমাদের সুলতানকে বলে দিও, সে কোথায় যেতে চায় তা আমরা জানি। আমরা কিছুতেই সুলতানকে মুলতানে সেনাঘাঁটি স্থাপন করতে দেবো না। পাহাড়ের ওপাশে কি ঘটছে তাও আমি জানি। এ মুহূর্তে তোমাদের সুলতান কোথায় আছে, তার সাথে কতো সৈন্য রয়েছে সবই আমি তোমাকে বলে দিতে পারব। তাকে ফিরে যেতে বলো। আমি তার অধীনতা অস্বীকার করছি। কেন তাকে কর দেবো? সে যদি একান্তই নদী পার হতে চায় তবে অনুমতির জন্যে তাকে আমার দরবারে আসতে বলো।”
